“শেষবার দেখছি।” ফোনটা হাতে নিয়ে নিজেকে এই কথা বলি। রাত ১১টা। ঘুমানোর সময় হয়ে গেছে। কিন্তু শুধু একবার দেখব – কোনো জরুরি মেসেজ এসেছে কিনা। কিন্তু এই “শেষবার” কখনো শেষবার হয় না।
ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখি। তারপর আরেকটা। “শুধু এই পোস্টটা পড়ে ফোন রেখে দেব।” কিন্তু সেই পোস্টের নিচে একটা কমেন্ট। সেই কমেন্ট পড়তে গিয়ে আরেকটা পোস্টে চলে যাই। এভাবে ১১টার “শেষবার” হয়ে যায় ১২টা।
পাশে হ্যাপি ঘুমিয়ে পড়েছে। তার শ্বাসের নিয়মিত শব্দ। আমি এখনো জেগে আছি, ফোনের নীল আলোর দিকে তাকিয়ে। মনে হয় এই আলোটা যেন আমার চোখকে সম্মোহিত করে রেখেছে।
“এইবার সত্যিই শেষ।” আবার নিজেকে বলি। কিন্তু ইউটিউবে একটা ভিডিওর টাইটেল দেখে মনে হল, “এটা দেখা জরুরি।” ১০ মিনিটের ভিডিও। মনে মনে হিসেব করি, ১০ মিনিট তো কিছুই না। দেখে নেই।
১০ মিনিট শেষ হতেই ইউটিউব পরের ভিডিওর সাজেশন দেয়। “আরো ভালো ভিডিও আছে।” ক্লিক করে ফেলি। এভাবে ১২টা হয়ে যায় ১টা।
আরাশ কাল সকালে স্কুল যাবে। হ্যাপিও অফিসে যাবে। আমার অফিসও আছে। কিন্তু তবুও ফোন রাখতে পারছি না। এটা কি আসক্তি? নাকি অভ্যাস? নাকি কোনো মানসিক সমস্যা?
মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা যখন ফোন ছিল না। রাত ১১টায় ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালে ফ্রেশ হয়ে উঠতাম। এখন? রাত ২টায় ঘুম, সকালে ভাঙা ভাঙা ঘুম।
“আজকেই শেষ। আগামীকাল থেকে রাত ১১টার পর ফোন ছোঁব না।” নিজেকে প্রতিজ্ঞা করি। কিন্তু জানি যে এই প্রতিজ্ঞা আগামীকাল ভেঙে যাবে।
ফোনের মধ্যে এমন কী আছে যে আমি ছাড়তে পারি না? সব কিছুই তো একই রকম। একই ধরনের পোস্ট, একই ধরনের ভিডিও। তবুও মনে হয় কিছু একটা নতুন পাব।
হ্যাপি একদিন বলেছিল, “তুমি ফোনের সাথে বিয়ে করেছ, আমার সাথে না।” তার এই কথায় কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু সত্যিও তো। ফোনের সাথে আমি বেশি সময় কাটাই।
আল্লাহর কাছে মনে মনে বলি, “এই যন্ত্রটা কি আমার জীবন নষ্ট করে দিচ্ছে? আমি কি এর গোলাম হয়ে গেছি?” কিন্তু উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে আবার স্ক্রিন করতে থাকি।
রাত ২টায় যখন চোখ জ্বালাপোড়া করতে থাকে, তখন বুঝি যে এইবার সত্যিই ঘুমাতে হবে। ফোনটা পাশে রেখে চোখ বন্ধ করি। কিন্তু মাথার ভিতর সেই নীল আলো জ্বলতে থাকে।
সকালে উঠে অনুশোচনা হয়। মনে হয় কাল রাতে কত সময় নষ্ট করলাম। এই সময়ে কত ভালো কিছু করা যেত। একটা বই পড়া যেত। হ্যাপির সাথে গল্প করা যেত। আরাশকে নিয়ে সময় কাটানো যেত।
কিন্তু আজ রাতেও আবার সেই একই অবস্থা হবে। আবার “শেষবার” বলে ফোন হাতে নেব। আবার ঘন্টার পর ঘন্টা স্ক্রিন করব।
এই চক্র কবে ভাঙবে? কবে আমি ফোনের বদলে ঘুমকে বেছে নেব? কবে “শেষবার” সত্যিকারের শেষবার হবে?
হয়তো একদিন ভাঙবে। হয়তো একদিন বুঝব যে রাতের এই নীরবতা, এই শান্তি ফোনের যেকোনো কনটেন্টের চেয়ে বেশি মূল্যবান। সেদিন পর্যন্ত এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
একটু ভাবনা রেখে যান