রাত তিনটা। আরাশ ঘুমিয়ে। হ্যাপিও। কিন্তু আমার চোখে ঘুম নেই।
আমি হিসাব করছি।
আরাশের এখন এগারো বছর। আরো সাত বছর পর তার এসএসসি। তারপর দুই বছর পর এইচএসসি। তারপর চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়।
মোট তেরো বছর।
এই তেরো বছরে কত টাকা খরচ হবে?
স্কুলের বেতন, বই-খাতা, প্রাইভেট টিউটর, পরীক্ষার ফি। তারপর কলেজ। সবচেয়ে ব্যয়বহুল হবে বিশ্ববিদ্যালয়।
আমি কলম-কাগজ নিয়ে হিসাব করি।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে লাগবে অন্তত দশ লাখ টাকা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও খরচ কম হবে না।
আমার মাসিক আয় বিশ হাজার টাকা। ভালো মাসে পঁচিশ হাজার। এর মধ্যে সংসারের খরচ, বাড়ি ভাড়া, সব মিলে কিছুই থাকে না।
তাহলে আরাশের পড়াশোনার টাকা আসবে কোথা থেকে?
আমি ভাবি, আমাকে আরো লিখতে হবে। আরো কাজ খুঁজতে হবে। হয়তো টিউশনি করতে হবে।
কিন্তু টিউশনি করতে গেলে লেখালেখির সময় কমে যাবে।
আমি ভাবি, আরাশ যদি মেধাবী হয়, তাহলে হয়তো স্কলারশিপ পাবে। কিন্তু তার জন্য তাকে অনেক ভালো ফলাফল করতে হবে।
আর ভালো ফলাফলের জন্য চাই ভালো প্রস্তুতি। ভালো প্রস্তুতির জন্য চাই ভালো স্কুল, ভালো টিউটর।
সবকিছুর জন্যই চাই টাকা।
আমি আরো হিসাব করি।
আরাশ বড় হলে বিয়ে করবে। সেজন্যও টাকা লাগবে। তারপর যদি সে আমাদের সাথে থাকে, তাহলে আরো দায়িত্ব।
আমার মাথা ঘুরে যায়।
আমি ভাবি, আমার বাবা কি এমনই করে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতেন? রাতের পর রাত জেগে হিসাব করতেন?
হয়তো করতেন।
আমি ভাবি, আরাশ কি জানে তার বাবা রাতে জেগে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় গুলিয়ে যায়?
আমার চোখে পানি আসে।
আমি কি আরাশকে সুখী রাখতে পারব? তাকে ভালো শিক্ষা দিতে পারব? তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব?
নাকি আমার মতো সে-ও সংগ্রাম করে বড় হবে?
আমি চাই না আরাশ আমার মতো রাতে জেগে টাকার চিন্তা করুক। আমি চাই সে নিশ্চিন্তে ঘুমাক।
কিন্তু সেজন্য আমাকে আরো কাজ করতে হবে।
আমি সিদ্ধান্ত নিই। আগামীকাল থেকে আমি দুটো চাকরি করব। একটা নিয়মিত আয়ের জন্য। আরেকটা অতিরিক্ত আয়ের জন্য।
লেখালেখি হয়তো কমাতে হবে। কিন্তু আরাশের জন্য এই ত্যাগ করতে হবে।
সন্তান মানেই বাবার স্বপ্নের মৃত্যু।
কিন্তু আমি রাজি আছি।
আরাশের ভবিষ্যতের চেয়ে আমার স্বপ্ন ছোট।
একটু ভাবনা রেখে যান