ঢাকার এক সাধারণ বারান্দায় গোধূলি বেলায় বসে থাকা এক ক্লান্ত মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব আলোকচিত্র, যা আমাদের প্রাত্যহিক মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প, জীবনের বাস্তবতা এবং নীরব সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলে।

জীবন

দোলনা

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ · 11 মিনিটে পড়া
শেয়ার
ঢাকার এক সাধারণ বারান্দায় গোধূলি বেলায় বসে থাকা এক ক্লান্ত মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব আলোকচিত্র, যা আমাদের প্রাত্যহিক মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প, জীবনের বাস্তবতা এবং নীরব সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলে।
প্রতিদিনের আটকে থাকা জীবন আর মধ্যবিত্তের কষ্ট বুকে নিয়েও শহরের ভিড়ে বারান্দায় বসে এক কাপ চায়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার নামই তো বেঁচে থাকা।

সকাল।

চোখ খোলো। এখনো বিছানায়। এখনো দুনিয়ায় নামোনি।

এই মুহূর্তটায় স্বপ্ন দেখো। এই তো শুরু হয় প্রতিদিনের মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প।

আজ হবে। আজ বদলাবে। আজ প্রমোশন। আজ টাকা। আজ উপরে উঠব।

এই স্বপ্নে পাঁচ মিনিট থাকো।

তারপর উঠে যাও অফিসে। রাস্তায়। ভিড়ে।

দুপুর।

বসের ঘর। একটা কথা।

“এ বছর প্রমোশন হবে না।”

বা “বাজেট কাটছে।”

বা “পরের বছর দেখা যাবে।”

একটা বাক্য। তিরিশ সেকেন্ড।

সকালের পাঁচ মিনিট শেষ।

স্বপ্ন ভাঙল। এই স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের মাঝখানেই লুকিয়ে থাকে রূঢ় জীবনের বাস্তবতা।

সন্ধ্যা।

বাড়ি ফিরো। চা খাও। বারান্দায় বসো।

আবার স্বপ্ন শুরু হয়।

হয়তো লেখা। হয়তো ব্যবসা। হয়তো কিছু একটা যেটা এই জীবন থেকে তুলে নিয়ে যাবে অন্য কোথাও।

রাত।

ইমেইল আসে। “উপযুক্ত নয়।”

বা ফোন আসে। “আপাতত সম্ভব না।”

বা কিছুই আসে না।

স্বপ্ন আবার ভাঙল। এভাবেই প্রতিদিন লেখা হতে থাকে অলিখিত এক মধ্যবিত্তের ডায়েরি।

এই চক্র। প্রতিদিন।

দিনে স্বপ্ন। রাতে ভাঙা।

এটাই মধ্যবিত্ত জীবন।

মধ্যবিত্ত মানে কী?

দুই জগতের মাঝখানে আটকে থাকা। এই আটকে থাকা জীবন যেন এক অদৃশ্য খাঁচা।

ধনীদের মতো বড় স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা আছে।

গরিবদের মতো স্বপ্ন ছেড়ে দেওয়ার সাহস নেই।

মাঝখানে। ঝুলে আছ।

উপরে যাওয়ার মই দেখা যায়, হাত পৌঁছায় না।

নিচে পড়ার গর্ত দেখা যায়, পা আটকে আছে।

স্বপ্ন দেখো।

বিদেশ যাবে। গাড়ি কিনবে। সন্তানকে ভালো স্কুলে দেবে।

কিন্তু পাসপোর্টের টাকা নেই। বাসের ভাড়া দিতে হিমশিম। স্কুলের বেতন বাকি। প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প ঠিক এমনই।

স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝে একটা দেওয়াল।

এই দেওয়ালের নাম — টাকা।

কিন্তু টাকা থাকলেও দেওয়াল সরে না। কারণ টাকা শেষ হয়ে যায়। খরচ বাড়ে। স্বপ্নও বাড়ে।

দেওয়াল তাই সবসময় থাকে।

সবচেয়ে নিষ্ঠুর কথা কী?

মধ্যবিত্তকে স্বপ্ন দেখতে শেখানো হয়।

টিভিতে। পত্রিকায়। সিনেমায়। বিজ্ঞাপনে।

“তুমিও পারবে।”

“স্বপ্ন দেখো। কঠোর পরিশ্রম করো। সফল হবে।”

এই কথাগুলো মিথ্যা না।

কিন্তু অসম্পূর্ণ।

কারণ এই কথাগুলো বলে না — যদি তোমার বাবার জমি না থাকে? যদি তোমার বাসায় অসুখ আসে? যদি অর্থনীতি ধসে? যদি চাকরি যায়?

তখন?

তখন স্বপ্ন থাকে। কিন্তু মই থাকে না। বুকে পাথর হয়ে থেকে যায় কেবল কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন।

ধনীরা কী করে?

তারা স্বপ্ন দেখে না। তারা পরিকল্পনা করে।

তাদের কাছে টাকা আছে। তাই স্বপ্ন বাস্তবতা হয়।

গরিবরা কী করে?

তারাও স্বপ্ন দেখে। তারা জানে, স্বপ্ন দেখলে শুধু ব্যথা পাবে।

তাই তারা শুধু বাঁচার চেষ্টা করে।

মধ্যবিত্তরা কী করে?

তারা প্রতিদিন নতুন করে মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প লেখে।

স্বপ্ন দেখে।

প্রতিদিন।

এবং প্রতিদিন ভাঙে।

এই দোলাচল — এই উপর-নিচ — এই আশা-হতাশা — এটাই মধ্যবিত্ত জীবনের সংজ্ঞা।

একটা মানুষ সকালে উঠে ভাবে, আজ জীবন বদলে যাবে।

সন্ধ্যায় বুঝতে পারে, কিছুই বদলায়নি। বুকে জমে থাকে অসংখ্য না বলা কথা।

রাতে শোয়। আবার আশা করে।

আগামীকাল হয়তো।

আগামীকাল।

আগামীকাল কখনো আসে অচেনা হয়ে না। শুধু আরেকটা আজ আসে।

স্বপ্ন দেখা কি ভুল?

না।

স্বপ্ন দেখা বাধ্যতামূলক।

স্বপ্ন না থাকলে মানুষ মরে যায়। শরীর বাঁচে, কিন্তু ভেতরটা মরে যায়।

মধ্যবিত্ত স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন ভাঙে। আবার দেখে।

এই ভাঙা-গড়ার খেলা।

এই খেলায় কেউ জেতে না।

কেউ একদিন বলেছিল, “মধ্যবিত্ত হওয়া একটা অভিশাপ।” কেউ কেউ একে বলে মধ্যবিত্তের কষ্ট।

ঠিক কথা।

কিন্তু পুরো সত্য না।

পুরো সত্য হলো —

মধ্যবিত্ত হওয়া একটা পরীক্ষা।

প্রতিদিন স্বপ্ন দেখবে।

প্রতিদিন ভাঙবে। এই প্রতিদিনের নীরব সংগ্রাম কেউ দেখতে পায় না।

কিন্তু পরদিন আবার উঠবে।

আবার স্বপ্ন দেখবে।

এই সাহস — বা এই বোকামি — দুটোর একটা।

কিন্তু এই স্বপ্ন দেখাই কি  বাঁচিয়ে রাখে?

মিথ্যা সান্ত্বনা।

স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে না।

স্বপ্ন শুধু মরতে দেয় না।

পার্থক্য আছে।

বাঁচা মানে জীবন।

মরতে না দেওয়া মানে শুধু শ্বাস। এটি শুধু শ্বাস নেওয়ার নয়, এটি এক অদ্ভুত বেঁচে থাকার গল্প।

মধ্যবিত্ত শ্বাস নেয়। কিন্তু বাঁচে কিনা — সেটা প্রশ্ন।

আজও সকালে উঠবে।

আজও স্বপ্ন দেখবে।

দুপুরে হয়তো প্রমোশন না।

রাতে শুয়ে আবার ভাববে — আগামীকাল।

এই চক্র।

এই অনন্ত চক্র।

এই দোলনা।

এই দোলনায় কেউ নামতে পারে না।

উপরে যেতেও পারে না।

শুধু দুলতে থাকে।

সারা জীবন।

এই দোলনার নাম মধ্যবিত্ত।

এবং এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ এই দোলনায় দুলছে। কারণ সবারই একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প আছে।

স্বপ্ন দেখছে।

ভাঙছে।

আবার দেখছে।

কেউ জিজ্ঞেস করে না, কেন দেখো?

কেউ জবাব দেয় না, কারণ জবাব নেই।

শুধু দোলে।

সকাল থেকে রাত।

জন্ম থেকে মৃত্যু।

দোলে।

অস্তিত্ব আশা গল্প বাস্তবতা স্বপ্ন

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

বিদায়

অক্টোবর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *