জীবন

দাম

ডিসেম্বর ২০২৫ · 10 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সিলিন্ডার কিনতে গেলাম। দোকানদার বলল, বারোশ।

আগে তো আটশ ছিল।

দাম বেড়েছে।

বাড়িতে ফিরলাম। সিলিন্ডার রাখলাম। হালকা লাগল। আগের চেয়ে।

স্ত্রী জিজ্ঞেস করল কত। বারোশ শুনে চুপ।

মাসে দুইটা লাগে তো?

হুম।

আড়াইশ বেড়ে গেল।

চুপ করে বসে রইলাম।

রাতে হিসাব করলাম। কী কী রান্না হয়। কতক্ষণ চুলা জ্বলে।

স্ত্রী জিজ্ঞেস করল কী করছি।

হিসাব। গ্যাসের।

সে পাশে বসল। কিছু বলল না।

সকাল—পরোটা, চা, ডিম। দুপুর—ভাত, ডাল, মাছ। রাত—ভাত, তরকারি।

এগুলো বাদ?

না। কমাতে হবে।

পরদিন সকাল। পরোটা নেই। চা আছে। বিস্কুট আছে।

মেয়ে জিজ্ঞেস করল পরোটা কোথায়।

আজ বিস্কুট। মন চায়।

মিথ্যা।

মেয়ে বিস্কুট খেল। তারপর জিজ্ঞেস করল, বাবা, তুমি চাকরি করো?

না। নিজে কাজ করি। লিখি।

লিখে টাকা হয়?

হয়।

কত?

চুপ।

মেয়ের কণ্ঠে আকুতি। আমার বন্ধুর বাবা ডাক্তার। তাদের বাড়িতে রোজ মাংস।

স্ত্রী মেয়েকে স্কুলে পাঠাল। বেরোনোর সময় মেয়ে পেছন ফিরে তাকাল।

স্ত্রী আমার দিকে তাকাল। কী বলব ওকে?

জানি না।

দুপুরে শুধু ভাত ডাল। সবজি নেই। মাছ নেই।

ডাল ভালো হয়েছে।

স্ত্রী বলল তেল কম দিয়েছে। চুলাও কম জ্বালিয়েছে।

খেতে লাগলাম। স্বাদ আগের মতো না। বললাম না।

সন্ধ্যায় মেয়ে খিদের কথা জানাল।

দুপুরে যা ছিল খাও।

আবার ডাল?

হুম।

চুপ করে খেল।

রাতে তিনজন টেবিলে বসলাম। কেউ কথা বলল না। শুধু চামচের শব্দ।

খাতা খুললাম। হিসাব করলাম।

মাসে দুইটা সিলিন্ডার। আগে ষোলোশ। এখন চব্বিশশ।

আটশ টাকা বেশি।

কলম নামিয়ে রাখলাম। জানালা দিয়ে তাকালাম। রাস্তায় লোক হাঁটছে। থামছে না।

স্ত্রী জিজ্ঞেস করল আমরা কি সুখী।

জানি না। যা আছে তাতেই আছি।

সেটা কি উত্তর?

স্ত্রী হাসল। তুমি কি সুখী?

আমি জানি না সুখ কাকে বলে।

পরদিন সকাল। আবার বিস্কুট। চা।

তুমি আর পরোটা বানাও না?

গ্যাস বাঁচাতে হবে না? স্ত্রীর কণ্ঠে ক্লান্তি।

হবে। কিন্তু তুমি তো পরোটা ভালোবাসো।

ভালোবাসা দিয়ে কী হয়?

চুপ।

মেয়ে জিজ্ঞেস করল, আমরা কি গরিব?

চা-তে চুমুক। না। আমরা গরিব না।

তাহলে কেন কম খাই?

আমরা কম খাই না। সাধারণ খাই।

মেয়ে বলল তার বন্ধুর ফ্রিজ ভরা মাংস।

স্ত্রী মেয়েকে পাঠাল।

তুমি ওকে কী বলবে?

জানি না।

বিকেলে বাজারে গেলাম। মাছ বিক্রেতার সামনে দাঁড়ালাম।

রুই পাঁচশ। ছোট মাছ তিনশ।

চিন্তা করলাম। তিনশ টাকা। একদিনের মাছ।

আজ লাগবে না।

কাল আসবেন?

হয়তো।

হাত খালি ফিরলাম।

স্ত্রী মাছের কথা জিজ্ঞেস করল। আজ পাইনি।

মিথ্যা।

স্ত্রী কিছু বলল না। চুলায় ডাল চাপাল।

রাতে মেয়ে ঘুমাল। আমরা বসে রইলাম।

কতদিন এভাবে?

জানি না।

আমরা কি ঠিক করছি? মানে… এই যে কম খাচ্ছি। মেয়েও কম খাচ্ছে।

আর উপায় নেই।

স্ত্রী জিজ্ঞেস করল আমি কি আবার চাকরি করতে পারি না।

পারি। কিন্তু লিখব কবে?

লেখা কি খাওয়ার চেয়ে বড়?

চুপ।

আমি বলছি না লিখো না। আমি শুধু… জানি না।

পরদিন সকাল। খাতা খুললাম। দেখলাম হিসাব। আঁকিবুঁকি। সংখ্যা।

বন্ধ করলাম।

স্ত্রী জিজ্ঞেস করল ঠিক আছি কিনা।

জানি না।

স্ত্রী পাশে বসল। হাত ধরল। আমরা ঠিক হয়ে যাব।

কীভাবে জানো?

জানি না। কিন্তু হব।

আমি জিজ্ঞেস করলাম সে কি রাগ করে। কারণ আমি চাকরি ছেড়েছি। লিখি। টাকা কম আনি।

না। আমি রাগ করি না। কিন্তু ভয় পাই।

কীসের?

চোখ নামিয়ে নিল। জানি না। শুধু ভয়।

দুপুরে লিখতে বসলাম। লিখতে পারলাম না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম।

রাস্তায় একজন সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে যাচ্ছে। ধীরে। থামছে না।

ভাবলাম, সে কি সুখী?

রাতে মেয়ে খেতে বসল। ডাল দেখে মুখ শুকাল। আবার ডাল?

হুম। মেয়ে বলল মাংস খেতে ইচ্ছা করছে।

পরে খাবে। শীঘ্রই।

শীঘ্রই মানে কবে?

চুপ।

আমি বোঝানোর চেষ্টা করলাম। আমরা কম খাচ্ছি। কিন্তু সাময়িক।

সাময়িক মানে?

মানে… কিছুদিন।

কেন কম খাচ্ছি?

কারণ… আমরা সাধারণ খাবার পছন্দ করি।

আমি মাংস পছন্দ করি। আপনিও তো?

চুপ। মেয়ে খেতে লাগল। চুপচাপ।

জানালা দিয়ে তাকালাম। রাস্তা ফাঁকা।

স্ত্রী জিজ্ঞেস করল আমরা কি ভুল করছি। চাকরি ছেড়ে। লিখছি। কম খাচ্ছি।

জানি না। ভুল কী আর ঠিক কী?

অনুশোচনা করি?

না। কিন্তু ভয় লাগে। মেয়ে মাংস চাইছে। আর দিতে পারছি না।

স্ত্রীর কণ্ঠ নরম। সে বুঝবে।

কবে?

জানি না।

পরদিন সকাল। বললাম আজ মাছ আনব।

স্ত্রী জিজ্ঞেস করল টাকা আছে কিনা। হুম।

মেয়ে জিজ্ঞেস করল মাংসও আনব কিনা।

না। আজ মাছ।

কবে মাংস?

শীঘ্রই। মেয়ে চলে গেল।

স্ত্রীর প্রশ্ন ধারালো। তুমি ওকে কত বছর শীঘ্রই বলবে?

জানি না।

দুপুরে বাজারে গেলাম। মাছের দাম শুনলাম। কিনলাম না। দেখলাম।

ফিরলাম।

স্ত্রী মাছের খোঁজ করল। আজও পাইনি।

মিথ্যা।

দাম বেড়েছে।

জানি।

সন্ধ্যায় তিনজন টেবিলে। ডাল। ভাত।

মেয়ে মনে করিয়ে দিল আমি মাছের কথা বলেছিলাম। পাইনি।

কাল পাবে?

দেখি। মেয়ে খেতে লাগল। চুপ।

রাতে স্ত্রী সরাসরি জিজ্ঞেস করল। তুমি আজ মাছ কেনোনি, তাই না?

হুম। দাম বেশি।

তুমি ওকে মিথ্যা বলেছ?

হুম। মিথ্যা বলা সহজ লাগল।

সে বুঝবে না?

বুঝবে। কিন্তু আজ না। হয়তো পরে।

তারপর?

তারপর সে জানবে তার বাবা মিথ্যাবাদী।

স্ত্রী মাথা নাড়ল। না। সে জানবে তার বাবা একজন মানুষ।

পার্থক্য কী?

জানি না।

চুপ। জানালা দিয়ে হাওয়া। ঠান্ডা।

তুমি কি মনে করো একদিন সব ঠিক হবে?

জানি না।

তুমি কি আশা করো?

করি। কিন্তু আশা দিয়ে কী হয়?

জানি না।

পরদিন সিলিন্ডার ফুরোল।

নতুন আনতে হবে।

দোকানে গেলাম। বারোশ দিলাম। কাঁধে নিয়ে ফিরলাম।

হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, এই সিলিন্ডার কত দিন চলবে? পনেরো? বিশ?

তারপর আবার ফুরোবে। আবার বারোশ।

থামলাম। সিলিন্ডার নামিয়ে রাখলাম। বিশ্রাম নিলাম।

একজন পাশ দিয়ে গেল। তাকাল না।

আবার তুললাম। হাঁটলাম।

বাড়িতে পৌঁছলাম। রান্নাঘরে রাখলাম।

স্ত্রী জিজ্ঞেস করল এবার কত দিন চলবে।

জানি না।

চুলা জ্বালাল। নীল আগুন। সুন্দর।

দেখতে লাগলাম। আগুন জ্বলছে। গ্যাস পুড়ছে। টাকা পুড়ছে।

কী দেখছ?

কিছু না।

রাতে মেয়ে ঘুমাল। আমরা বসে রইলাম।

তুমি কী ভাবছ?

ভাবছি, আমরা কতটা কম খাব? কতটা কম রান্না করব?

আমরা যতটা পারি।

আর যদি না পারি?

তাহলে… জানি না।

আমি কখনো ভাবিনি এমন হবে।

কেউ ভাবে না।

স্ত্রী বলল, আমরা হাঁটছি।

কিন্তু কোথায় যাচ্ছি?

জানি না। কিন্তু একসাথে আছি।

সেটা কি যথেষ্ট?

জানি না। কিন্তু এটাই আছে।

চুপ।

জানালা দিয়ে চাঁদ। পূর্ণিমা না। অর্ধেক। আধাআধি।

চাঁদ সুন্দর, না?

হুম।

মনে হয় চাঁদ দেখলে সব ভুলে যায়।

কিন্তু ভোর হলে?

ভোর হলে আবার মনে পড়ে।

তাহলে লাভ কী?

জানি না। কিন্তু রাতে ভালো লাগে।

কিন্তু এই সব কথার পেছনে সত্যটা কী?

সত্য হলো—দাম বাড়ছে। আয় বাড়ছে না।

সত্য হলো—আমরা কম খাচ্ছি। বলছি “সাধারণ খাচ্ছি”।

মিথ্যা।

সত্য হলো—মেয়েকে মিথ্যা বলছি। বলছি “শীঘ্রই”।

শীঘ্রই কখনো আসবে না। জানি।

সত্য হলো—আমি ভয় পাচ্ছি। কিন্তু স্বীকার করছি না।

বলছি “আশা করি”।

আশা মিথ্যা। আমি জানি।

সত্য হলো—আমরা একটা চক্রে আটকা। দাম বাড়ে। আমরা কমাই। দাম আরও বাড়ে। আমরা আরও কমাই।

কোথায় শেষ?

যখন কমানোর মতো কিছু থাকবে না।

তখন কী হবে?

জানি না। কেউ জানে না।

কিন্তু সবাই করছে।

লাখ লাখ মানুষ। প্রতিদিন একই।

কম খাচ্ছে। মিথ্যা বলছে। হাসছে। বলছে “ঠিক আছি”।

ঠিক নেই। কেউ ঠিক নেই।

কিন্তু বলছে। কারণ বলা ছাড়া উপায় নেই।

এই কি সভ্যতা?

যেখানে দাম বাড়ে কিন্তু আয় না?

যেখানে বাবাকে মেয়েকে মিথ্যা বলতে হয়?

যেখানে “শীঘ্রই” একটা জীবনভর প্রতিশ্রুতি?

এটা কোন ব্যবস্থা?

যে ব্যবস্থায় মানুষ খাবার কমায়? গ্যাস বাঁচায়?

কিন্তু প্রশ্ন করে না—দাম কেন বাড়ছে?

কারণ প্রশ্ন করলে কী হবে?

দাম কমবে না।

শুধু আমি আরও ক্ষুধার্ত হব।

তাই চুপ থাকি।

তাই মিথ্যা বলি।

তাই হাসি।

এই হাসি আসল?

না।

এই হাসি একটা মুখোশ।

পরে থাকি যাতে ভেঙে না পড়ি।

কিন্তু ভিতরে?

ভিতরে ভেঙে পড়েছি। অনেক আগেই।

শুধু দেখাই না।

কারণ দেখালে কী হবে?

কেউ সাহায্য করবে?

না।

সবাই নিজের মুখোশ সামলাতে ব্যস্ত।

তাই আমিও সামলাই।

হাসি। বলি “ঠিক আছি”।

রাতে জানালা দিয়ে চাঁদ দেখি। বলি “সুন্দর”।

কিন্তু জানি—চাঁদ দেখে ক্ষুধা মিটবে না।

চাঁদ দেখে গ্যাসের দাম কমবে না।

চাঁদ শুধু চাঁদ।

আমি শুধু আমি।

আর এই ব্যবস্থা শুধু এই ব্যবস্থা।

যেটা আমাকে চিবিয়ে খাচ্ছে।

ধীরে ধীরে।

আর আমি?

আমি বলছি—আমরা ঠিক হয়ে যাব।

সবচেয়ে বড় মিথ্যা।

গল্প পরিবার বাস্তবতা স্বপ্ন

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

কথা

আয়না

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া

জীবন

নীরবতা

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *