ইউটিউবে “ওয়াজ” লিখে সার্চ দিলাম। ১৫ লক্ষ ভিউ। কমেন্টে লেখা – “মাশাল্লাহ হুজুর”, “জান্নাতের পথ দেখিয়ে দিলেন।” আমি দেখছি হুজুরের পেছনে LED স্ক্রিন, প্রফেশনাল লাইটিং। ক্যামেরা তিনটা এঙ্গেল থেকে রেকর্ড করছে।
হুজুর বলছেন, “গরিবরা আল্লাহর বেশি কাছে। কারণ তাদের দুনিয়ার মায়া কম।” আমি ভাবি – তাহলে হুজুরের এই HD ক্যামেরা, branded মাইক, এয়ার কন্ডিশন হল – এগুলো কী?
তারপরেই বিজ্ঞাপন। “রমজান স্পেশাল তাসবিহ এখনই অর্ডার করুন। ক্যাশ অন ডেলিভারি সুবিধা।” ফোন নম্বর ভাসছে স্ক্রিনে। আমি হাসি – কী আজব! আগে ওয়াজের পরে বইয়ের স্টল হতো, এখন লাইভ কমার্স।
হ্যাপি পাশে বসে আছে। বলে, “তুমি আবার কী দেখছো?” আমি মোবাইলের স্ক্রিন তার দিকে ঘুরিয়ে দিই। “দেখো, এই হুজুর বলছেন সম্পদ দুনিয়ার মায়া। আর নিচে লেখা – ‘একচেটিয়া ইমামের প্রার্থনার তেল, শুধুমাত্র ৯৯৯ টাকা।'”
আরাশ বারান্দা থেকে এসে বলে, “আব্বু, আমাদের পাশের বাড়ির কাকা বলছিলেন, তিনি অনলাইনে ইসলামিক কোর্স করেন। মাসিক ৫০০০ টাকা।” আমার মাথায় হাত। পাঁচ হাজার টাকা! আমার দেড় মাসের সব খরচ।
আমি আরেকটা ভিডিও দেখি। এইবার হুজুর বিদেশে বসে ওয়াজ করছেন। পেছনে সুইস আল্পস। ক্যাপশনে লেখা – “আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে থেকে আত্মার খোঁজ।” কমেন্টে কেউ লিখেছে – “হুজুর সাহেব, আমরা ভাড়া বাড়িতে থেকে আপনার ওয়াজ শুনি, আর আপনি সুইজারল্যান্ড থেকে গরিবদের গুণগান করেন।”
আমার গলায় কী যেন আটকে যায়।
তারপরে শুরু হয় দোয়ার পার্ট। “যারা গরিব, তারা বেশি দুআ করুন। আল্লাহ তাদের দুআ কবুল করেন।” আমি ভাবি – তাহলে আমার অবস্থাই ভালো। বেকার, দুশ্চিন্তায় দিন কাটে। তার মানে আমার দুআ বেশি কবুল হবে।
কিন্তু ইউটিউবের সাইডবারে যে suggestion আসছে – “আমিরদের জীবন পরিবর্তনের গল্প।” আমি ক্লিক করি। দেখি বিলিয়নেয়ার মুসলিমদের সফলতার গল্প। কমেন্টে লেখা – “মাশাল্লাহ, আল্লাহ ওনাদের বরকত দিয়েছেন।”
আমি confused। একদিকে গরিব নেককার, অন্যদিকে ধনী আল্লাহর বরকতপ্রাপ্ত। আমি কোথায়?
ফেসবুকে একটা পোস্ট শেয়ার দিই – “আল্লাহ কি শুধু গরিবদের পরীক্ষা নেন, নাকি ধনীদেরও?” কোনো কমেন্ট আসে না। শুধু তিনটা হাহাকার ইমোজি।
রাতে হ্যাপি বলে, “তুমি কেন এত ভাবো এসব নিয়ে?” আমি জানি না কী বলবো। শুধু মনে হয় – ডিজিটাল যুগে ধর্মও ডিজিটাল হয়ে গেছে। কিন্তু আমার প্রশ্নগুলো এনালগ রয়ে গেছে।
আমি আয়নায় মুখ দেখি। ৩৯ বছরের একজন মানুষ, যে জানে না – সে কোন ক্যাটাগরিতে পড়ে।
একটু ভাবনা রেখে যান