রাতে স্বপ্ন দেখি বাংলায়। মা বলছেন, “খোকা, খেয়ে যাও।” বাবা বলছেন, “পড়াশোনা করো।” স্ত্রী বলছে, “তুমি দেরি করছো।” পুরো স্বপ্ন বাংলা ভাষায়। আমার অবচেতন বাংলায় কথা বলে।
কিন্তু অফিসে বসে চিন্তা করি ইংরেজিতে। “What should I do next? How to handle this project?” চেতন মনে ইংরেজি ভেসে ওঠে।
আমি কি দুই ভাষার দুই মানুষ?
ছোটবেলার সব স্মৃতি বাংলায়। দাদির গল্প, মায়ের ডাক, বন্ধুদের হাসি। কিন্তু পেশাগত জীবনের স্মৃতি ইংরেজিতে। মিটিং, প্রেজেন্টেশন, ইমেইল।
মাতৃভাষা হৃদয়ের ভাষা। দ্বিতীয় ভাষা মাথার ভাষা।
দুঃখ পেলে মনে মনে বলি—”কী কষ্ট!” খুশি হলে বলি—”বাহ!” কিন্তু অফিসে সফল হলে মনে আসে—”Great job!” রাগ হলে—”What the hell!”
আবেগের ভাষা মাতৃভাষা। কাজের ভাষা বিদেশি ভাষা।
আরাশকে ইংরেজি শেখাতে গিয়ে দেখি সে বাংলায় ভাবে, তারপর ইংরেজিতে অনুবাদ করে। আমিও তাই করি। মনের কথা বাংলায়, মুখের কথা ইংরেজিতে।
এই অনুবাদের প্রক্রিয়ায় কিছু হারিয়ে যায়। যেটা বাংলায় সহজ, সেটা ইংরেজিতে কঠিন।
বাংলায় বলি—”মন খারাপ।” ইংরেজিতে বলতে হয়—”I am feeling low” বা “I am depressed.” কিন্তু “মন খারাপ” এর যে সূক্ষ্ম অনুভূতি, সেটা ইংরেজিতে প্রকাশ করা কঠিন।
প্রার্থনা করি বাংলায়। “হে আল্লাহ, আমাকে রক্ষা করো।” ইংরেজিতে প্রার্থনা আসে না। আধ্যাত্মিকতার ভাষা মাতৃভাষা।
কিন্তু গণিত করি ইংরেজিতে। “Two plus two equals four.” বাংলায় “দুই যোগ দুই সমান চার” বলি না। কেন? কারণ গণিত শিখেছি ইংরেজিতে।
প্রতিটি ভাষার নিজস্ব জগৎ আছে।
বাংলা ভাষার জগৎ—পরিবার, আবেগ, ঐতিহ্য, স্মৃতি। ইংরেজি ভাষার জগৎ—কাজ, প্রযুক্তি, বিশ্ব, ভবিষ্যৎ।
দুই ভাষার দুই ব্যক্তিত্ব। বাংলায় আমি আবেগপ্রবণ। ইংরেজিতে যুক্তিবাদী।
মজার ব্যাপার—বাংলায় গালি দিলে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু ইংরেজিতে “Damn it” বললে তেমন অপরাধবোধ নেই। কেন? কারণ ইংরেজি গালির আবেগী প্রভাব কম।
বিদেশি ভাষার একটা নিরাপত্তা আছে। সেখানে আমি নিজেকে দূরত্বে রাখতে পারি। কিন্তু মাতৃভাষায় আমি উন্মুক্ত।
স্বপ্নে মাতৃভাষা কেন আসে? কারণ স্বপ্ন অবচেতনের জগৎ। আর অবচেতন মাতৃভাষায় গঠিত।
কখনো কখনো ভাবি—আমি যদি ইংরেজি দেশে থাকতাম, তাহলে স্বপ্নেও ইংরেজি আসত? নাকি মাতৃভাষার শেকড় এত গভীর যে তা কখনো বদলায় না?
প্রবাসীদের কাছে শুনেছি—২০ বছর বিদেশে থেকেও তারা স্বপ্ন দেখে মাতৃভাষায়। মাতৃভাষা আত্মার ভাষা।
কিন্তু আমাদের যুগের শিশুরা ইংরেজিতেই ভাবতে শুরু করেছে। তাদের কি দুই ভাষার দুই মানুষ সমস্যা নেই?
নাকি তাদের মাতৃভাষার সাথে সংযোগই কম?
আমার ভয় হয়—আরাশ কি বাংলায় স্বপ্ন দেখবে? নাকি ইংরেজিতে ভাবতে ভাবতে বাংলা ভুলে যাবে?
মাতৃভাষা হারানো মানে শেকড় হারানো। আত্মপরিচয় হারানো।
কিন্তু বিদেশি ভাষা না জানলে বিশ্বের সাথে যোগ হয় না।
দুটোর মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে?
হয়তো উত্তর হচ্ছে—দুই ভাষার দুই মানুষ হওয়াই স্বাভাবিক। সমস্যা নয়, সম্পদ।
একটু ভাবনা রেখে যান