গত সপ্তাহে চাকরিটা চলে গেছে। আবার। হ্যাপি কিছু বলেনি এবার। আরাশ জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, তুমি কেন বাসায় আছো?” আমি বলেছিলাম, “ছুটি নিয়েছি।” সে মেনে নিয়েছে।
আজ সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছি। কোথায় যাবো জানতাম না। বাসে উঠে বললাম, “শেষ স্টপ।” কন্ডাক্টর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?” “যেখানে শেষ, সেখানে।”
বাস থামল একটা গ্রামের মুখে। এখানে এর আগে আসিনি। চারিদিকে খোলা মাঠ। দূরে একটা পুকুর। তার পাড়ে একটা বড় বট গাছ। আমি হাঁটতে শুরু করলাম সেদিকে।
বট গাছের ছায়ায় পৌঁছে বসে পড়লাম। পুকুরের পানি স্থির। আকাশের প্রতিবিম্ব পানিতে। কিন্তু কোনটা আসল? আকাশ, নাকি পানির মধ্যের আকাশ? আমি কি বাস্তবে বসে আছি, নাকি কোনো প্রতিবিম্বে?
বাতাসে ধানের গন্ধ। এখনো সবুজ। কয়েক মাস পর হলুদ হবে। তারপর কাটা হবে। ধান হবে ভাত। ভাত হবে শক্তি। শক্তি হবে জীবন। এই চক্রে আমি কোথায়?
একটা পাখি এসে বসল পুকুরের ধারে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে। আমার মতোই। সেও কি কিছু ভাবছে? নাকি শুধু আছে? থাকা আর ভাবা কি আলাদা? আমি যখন ভাবি না, তখন কি আমি বেশি আছি?
আমি চোখ বন্ধ করলাম। শব্দ এলো। পাখির ডাক। গাছের পাতার মর্মর। দূরে কোথাও একটা গরুর ঘণ্টির আওয়াজ। কিন্তু এই শব্দগুলো আমার মধ্যে আসছে, নাকি আমি এদের মধ্যে মিশে যাচ্ছি?
মনে পড়ল বাবার কথা। বাবা বলতেন, “আল্লাহ্ র সবচেয়ে কাছে যেতে হলে নিজেকে ভুলে যেতে হয়।” তখন বুঝতাম না। এখন মনে হয়—এই বট গাছের নিচে বসে আমি নিজেকে ভুলে যাচ্ছি। আমি “হায়দার” নই। আমি শুধু একটা চেতনা। একটা অনুভূতি।
চোখ খুলে তাকালাম পুকুরের দিকে। একটা মাছ লাফিয়ে উঠল। পানিতে ঢেউ তৈরি হলো। আকাশের প্রতিবিম্ব ভেঙে গেল। তারপর আবার স্থির হলো। ঠিক যেমন ছিল।
আমার জীবনও কি এরকম? চাকরি হারানো, টেনশন, দুশ্চিন্তা—এগুলো মাছের লাফানোর মতো। ঢেউ তোলে। কিন্তু পানি আবার স্থির হয়ে যায়। আমিও কি ঠিক হয়ে যাবো?
একটা প্রজাপতি এসে আমার পাশে বসল। সুন্দর রঙিন ডানা। এত সুন্দর করে কে বানিয়েছে? এই যে সৌন্দর্য—এটা কার জন্য? প্রজাপতি কি জানে যে সে সুন্দর? নাকি সৌন্দর্য শুধু আমার চোখে?
আমি হাত বাড়ালাম প্রজাপতির দিকে। সে উড়ে গেল। কিন্তু একটু পরেই আবার এসে বসল। যেন বুঝতে পারছে—আমি ক্ষতি করবো না। আমি শুধু দেখতে চাই।
এই “দেখা”টা কী? আমি প্রজাপতি দেখছি, নাকি প্রজাপতি আমাকে দেখছে? নাকি আমরা দুজনেই একসাথে কোনো বড় চোখের অংশ?
বাতাসে হঠাৎ আজানের আওয়াজ ভেসে এলো। দূরের কোনো মসজিদ থেকে। “আল্লাহু আকবার।” আল্লাহ্ সবচেয়ে বড়। কিন্তু কতটা বড়? এই আকাশের চেয়ে বড়? এই পুকুরের চেয়ে বড়? আমার হৃদয়ের চেয়ে বড়?
আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। পশ্চিমে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। আকাশ লাল হয়ে গেছে। পুকুরের পানিও লাল। সবকিছু লাল। আমিও কি লাল হয়ে গেছি?
আমি অজু করলাম পুকুরের পানি দিয়ে। ঠাণ্ডা পানি। কিন্তু আমার মনে হল—এই পানি আমাকে পরিষ্কার করছে না, আমি এই পানির সাথে মিশে যাচ্ছি। আমি পানি, পানি আমি।
নামাজ পড়লাম সেখানেই। সিজদায় গেলে মাটির গন্ধ পেলাম। এই মাটি—কত বছরের পুরনো? কত মানুষ এই মাটিতে সিজদা করেছে? আমার সিজদা কি আলাদা, নাকি সেই একই সিজদার অংশ?
“আল্লাহুম্মা আনতাস সালামু ওয়া মিনকাস সালাম।” “হে আল্লাহ্, আপনি শান্তি, আপনার কাছ থেকেই শান্তি।” এই শান্তি—এটা কি আমার ভেতরে, নাকি বাইরে? নাকি ভেতর-বাইরের কোনো পার্থক্য নেই?
নামাজ শেষ করে আবার বসলাম। এখন প্রায় অন্ধকার। তারা উঠেছে। আমি গুনতে শুরু করলাম। এক, দুই, তিন… পঞ্চাশ পর্যন্ত গুনে থেমে গেলাম। এত তারা। এর মধ্যে আমি কত ছোট। কিন্তু এই ছোট আমি এই বিশাল মহাকাশ দেখতে পাচ্ছি। তাহলে আমি ছোট, নাকি বড়?
একটা পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। পুকুরের পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব। আমি হাত দিয়ে পানি নাড়ালাম। চাঁদ ভেঙে গেল। কিন্তু আকাশের চাঁদ অটুট। তাহলে কোনটা আসল চাঁদ? নাকি দুটোই আসল? নাকি কোনোটাই আসল নয়?
আমার মনে পড়ল আরাশের কথা। গত সপ্তাহে জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, চাঁদ কেন আমাদের পিছু নেয়?” আমি বলেছিলাম, “চাঁদ পিছু নেয় না, আমরা চাঁদের সাথে চলি।” “তাহলে আমরা আর চাঁদ এক?” “হয়তো।”
আজ এই বট গাছের নিচে বসে মনে হচ্ছে—আরাশ ঠিক বলেছিল। আমরা আর চাঁদ এক। আমি আর এই গাছ এক। এই পুকুর, এই মাটি, এই আকাশ—সবই এক।
তাহলে আমার চাকরি চলে যাওয়ার দুঃখ কেন? আমি তো এই বিশাল প্রকৃতির অংশ। পাখি কি চাকরির চিন্তা করে? গাছ কি বেতনের চিন্তা করে? তাহলে আমি কেন?
হয়তো কারণ আমি ভুলে গেছি যে আমি প্রকৃতির অংশ। আমি ভেবেছি আমি আলাদা। আমার আলাদা জীবন, আলাদা সমস্যা। কিন্তু আসলে আমি এই সবের অংশ।
একটা প্যাঁচা ডাকল কোথাও। গভীর আওয়াজ। রহস্যময়। আমার মনে হল—এই প্যাঁচা আমাকে কিছু বলতে চাইছে। হয়তো বলছে, “তুমি একা নও। আমরা সবাই এক।”
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ফেরার সময় হয়েছে। কিন্তু আমি কি আসলেই ফিরছি? নাকি আমি এখানেই থেকে যাচ্ছি? এই শান্তি, এই প্রশান্তি—এটা কি এই জায়গায়, নাকি আমার ভেতরে?
হাঁটতে শুরু করলাম রাস্তার দিকে। কিন্তু প্রতি পদক্ষেপে মনে হচ্ছে—আমি কিছু রেখে যাচ্ছি। কিন্তু সাথে নিয়ে যাচ্ছিও কিছু।
রাস্তায় পৌঁছে পেছনে তাকালাম। বট গাছটা দেখা যাচ্ছে চাঁদের আলোয়। আমার মনে হল—আমি ওখানে একটা অংশ রেখে এসেছি। কিন্তু একটা অংশ নিয়েও এসেছি।
বাসে উঠে বসলাম। অন্য যাত্রীরা কথা বলছে টাকা-পয়সা, রাজনীতি, সমস্যার কথা। আমি চুপ করে বসে রইলাম। আমার মনে হচ্ছে—আমি তাদের থেকে আলাদা জগতে আছি।
কিন্তু আসলে কি আলাদা? এই যাত্রীরাও তো একই আকাশের নিচে। একই পৃথিবীতে। তাদের মধ্যেও তো সেই একই চেতনা। শুধু তারা ভুলে গেছে।
বাসা পৌঁছে দেখলাম হ্যাপি অপেক্ষা করছে। “কোথায় ছিলে?” “প্রকৃতির কাছে।” “মানে?” “নিজের কাছে।”
আরাশ দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। “বাবা, তুমি আলাদা লাগছো।” “কেন?” “চোখে কিছু আলাদা।” আমি আয়নায় দেখলাম। সত্যিই। চোখে একটা শান্তি।
রাতে খাওয়ার সময় হ্যাপি বলল, “চাকরির কী করবে?” আমি বললাম, “যা হওয়ার হবে।” “এই মনোভাব কোথা থেকে?” “বট গাছ থেকে।”
হ্যাপি হেসে বলল, “তুমি আবার পাগল হয়ে গেছো।” আমি বললাম, “হয়তো। কিন্তু এই পাগলামিতে একটা শান্তি আছে।”
রাতে শুয়ে ভাবলাম—আজ যা পেয়েছি, তা কি হারিয়ে যাবে? কাল সকালে যখন আবার চাকরির খোঁজে বের হবো, তখনও কি এই শান্তি থাকবে?
হয়তো থাকবে না। হয়তো আবার সেই দুশ্চিন্তা ফিরে আসবে। কিন্তু আজ যা অনুভব করেছি—যে আমি এই বিশাল প্রকৃতির অংশ, যে আমি একা নই, যে এই শান্তি আমার ভেতরেই আছে—এটা আমার সাথে থাকবে।
যখনই খুব একা লাগবে, খুব হতাশ লাগবে, তখন মনে করবো সেই বট গাছের কথা। সেই পুকুরের কথা। সেই চাঁদের কথা। আর বুঝবো—আমি একা নই। আমি এই বিশাল সৃষ্টির অংশ।
আর এটাই হয়তো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি—নিজেকে এই বিশ্বের সাথে এক করে অনুভব করা।
একটু ভাবনা রেখে যান