প্রশ্ন

পর্যবেক্ষক

অক্টোবর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

রাত তিনটা।

পাশে কেউ ঘুমাচ্ছে। শ্বাস নিচ্ছে। ছাড়ছে।

তুমি গুনছো। এক। দুই। তিন।

হঠাৎ প্রশ্ন — যদি এই শ্বাস আর ফিরে না আসে?

তারপর আরো অদ্ভুত প্রশ্ন — আমি যদি এখন মরে যাই?

এবং সবচেয়ে অদ্ভুত — যে এই প্রশ্ন করছে, সে কে?


চোখ বন্ধ করো।

কল্পনা করো — তোমার শরীর বিছানায় পড়ে আছে। নড়ছে না।

কেউ ডাকছে। তুমি উঠছো না।

কিন্তু যে এই দৃশ্য দেখছে, সে কে?

মৃত মানুষ তো দেখে না।

তাহলে কে দেখছে?


এটাই সবচেয়ে ভয়ানক প্রশ্ন।

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যু দেখা যায় কিনা।

এবং যদি দেখা যায়, তাহলে কে দেখছে?


কেউ মরেছিল। কবরে নামানো হচ্ছে।

তুমি দাঁড়িয়ে ভাবছো — সে কি এখন দেখছে?

তারপর ভাবছো — আমি যখন মরব, তখন কি দেখব?

মাথা ঘোরে। দাঁড়াতে পারো না।

কেউ জিজ্ঞেস করে — কী হয়েছে?

কী বলবে? বলবে — আমি নিজের কবরে নামা দেখার চেষ্টা করছি?


একটা শিশু জিজ্ঞেস করে —

মরে গেলে কি স্বপ্ন দেখা যায়?

জানা নেই।

শিশু বলে — তুমি তো স্বপ্ন দেখো না।

সত্যি। স্বপ্ন দেখো না। কখনো দেখোনি।

শিশু বলে — তাহলে তুমি মরে গেছ হয়তো।


হাসো।

কিন্তু ভেতরে?

ভেতরে ভাবো — হয়তো ঠিকই বলেছে।


একদিন লিখেছিলে: “আমি মরে গেছি।”

তাকিয়ে রইলে।

যে লিখছে, সে তো জীবিত।

তাহলে এই বাক্য মিথ্যা?

নাকি সত্য যা এখনো ঘটেনি?

নাকি তৃতীয় কিছু?


কেউ বলে —

তুমি যেভাবে মৃত্যু নিয়ে ভাবো, মনে হয় মহড়া দিচ্ছ।

কীসের মহড়া?

মরার।


সত্যি তো।

প্রতিদিন কতবার ভাবো?

বারান্দায় দাঁড়িয়ে — যদি পড়ে যাই?

রাস্তায় — যদি গাড়ি ধাক্কা দেয়?

খেতে বসে — যদি গলায় আটকে যায়?


এটা জেনে রাখো।

এই ভাবা স্বাভাবিক না।

বেশিরভাগ মানুষ মৃত্যু নিয়ে ভাবে না।

তুমি ভাবো।

সারাক্ষণ।


কেউ জিজ্ঞেস করে — কখনো কি জীবন নিয়ে ভাবো?

চুপ।

উত্তর জানা নেই।


সত্য হলো —

তুমি মৃত্যু নিয়ে ভাবো।

কিন্তু বাঁচা নিয়ে ভাবো না।

এবং এই দুটো এক জিনিস না।


একটা শিশু জিজ্ঞেস করে —

মানুষ কি মরার পর নিজের দাফন দেখতে পায়?

শিশু বলে — আমার মনে হয়, মৃত্যু মানে সিনেমা হল থেকে বের হওয়া। সিনেমা চলে। কিন্তু তুমি আর দেখো না।


থমকে যাও।

এগারো বছরের শিশু এসব কোথায় থেকে পায়?

উত্তর — তোমার কাছ থেকে।

তুমি তাকে শিখিয়েছ।

অচেতনভাবে।


আয়নার সামনে দাঁড়াও।

তিনজনকে দেখো।

একজন এখন আছে।

একজন থাকবে না।

একজন সবসময় আছে।

তিনজনই তুমি।

কেউই তুমি নও।


কেউ বলে —

তোর সমস্যা কী জানিস? তুই বেঁচে থেকেও মৃত।

সারাক্ষণ মরার কথা ভাবিস। বাঁচার কথা কবে ভাববি?

চুপ।

হয়তো ঠিক। হয়তো না।


রাতে ঘুমানোর আগে ভাবো —

ঘুম কি একরকম মৃত্যু?

প্রতি রাতে মরি। প্রতি সকালে জন্মাই।

তাহলে তোমার বয়স কত?

পঁয়ত্রিশ বছর?

নাকি পঁয়ত্রিশ দিন?


ঘুমে ভয় লাগে।

কেন?

হয়তো উঠব না।


কেউ বলে — তাহলে কী করব আমরা?

তোমরা বাঁচবে। আমি থাকব না।

কেউ বলে — থাকবে।

কীভাবে?

মনে। স্মৃতিতে।


কিন্তু প্রশ্ন —

মনে থাকা মানে কি বেঁচে থাকা?

জানা নেই।


শিশু একদিন বলে —

তুমি যখন আমার দিকে তাকাও, মনে হয় তুমি আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছ।

কার দিকে?

জানি না। যে আমি না। যে তুমি না। তৃতীয় কেউ।


গলা শুকিয়ে যায়।

শিশু বলে — শিখিনি। জানি।


ওষুধের দোকান।

ঘুমের ওষুধ কিনতে।

দোকানদার — কতদিন ধরে ঘুম আসছে না?

বছরখানেক।

ডাক্তার দেখিয়েছেন?

না।


যাও না।

কী বলবে?

বলবে — আমার ভয় হয় ঘুমালে হয়তো আর উঠব না?

বলবে — আমি নিজেকে মৃত অবস্থায় দেখার চেষ্টা করি?

পাগল ভাববে।


কেউ জিজ্ঞেস করে — তুমি কি সুখী?

জানি না।

কীভাবে জানো না?

যে সুখী সে জানে। যে দুঃখী সেও জানে। আমি?

আমি জানি না আমি কী।


বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছো। চার তলা।

ভাবছো — যদি ঝাঁপ দিই?

কয় সেকেন্ড লাগবে মাটিতে? তিন? চার?

সেই সেকেন্ডগুলোতে কী ভাবব?

আফসোস? ভয়? নাকি স্বস্তি?


কেউ ডাকছে — কী দেখছ?

রাস্তা।

আর?

গাড়ি। মানুষ। জীবন।

ভেতরে এসো।


ভেতরে আসো।

আয়নায় তাকাও।

প্রশ্ন করো — যখন সত্যি মরব, তখন কে দেখবে?

কেউ?

নাকি দেখার মতো কেউ থাকবে না?

নাকি যে দেখছে সেই-ই একমাত্র আসল?

উত্তর নেই।


রাতে শুয়ে আছো।

শিশু পাশে এসে শোয়। ঘুম আসছে না?

না।

আমারও না।

কেন?

তুমি জেগে আছ তো। মনে হয় তোমার সাথে পাহারা দিচ্ছি।

কীসের পাহারা?

জানি না। তুমি জানো?

না।


দুজন চুপ।

সিলিং ফ্যান ঘুরছে।

শিশু বলে — তুমি কি মরতে চাও?

না।

তাহলে মৃত্যু নিয়ে এত ভাবো কেন?

জানি না। হয়তো ভয় পাই।

ভয় পেলে তো এড়িয়ে যেতে হয়। তুমি তো কাছে যাও।


ঠিক বলেছে।

তুমি ভয় পাও।

কিন্তু পালাও না।

কাছে যাও।

বারবার।


এটা কেন?

উত্তর —

হয়তো জানতে চাও।

হয়তো প্রস্তুত হতে চাও।

হয়তো নিয়ন্ত্রণ চাও।

কিন্তু মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।


এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য —

মৃত্যু নিয়ে এত ভাবলে,

জীবন নিয়ে ভাবার সময় থাকে না।


শিশু বলে — তুই কোথায় এত বুদ্ধি পাস?

তোমার কাছ থেকে।

আমার কাছ থেকে তো শুধু পাগলামি পাওয়ার কথা।

সেটাও পেয়েছি।

হাসো।


জানালা দিয়ে আকাশ। কালো। তারা নেই।

হয়তো মেঘ।

হয়তো তারারা মরে গেছে কোটি বছর আগে। আলো এখনো আসছে।


তাহলে কি মৃত জিনিসও বেঁচে থাকতে পারে?

আলো হয়ে?

স্মৃতি হয়ে?

হ্যাঁ।


এবং এটাই উত্তর।

তুমি মরবে।

কিন্তু কিছু থাকবে।

আলো। স্মৃতি। প্রভাব।


কিন্তু যে ভয় পাচ্ছে,

যে ভাবছে,

যে পর্যবেক্ষণ করছে —

সে কে?


এটাই আসল প্রশ্ন।

এবং এই প্রশ্নের উত্তর হলো —

সেই পর্যবেক্ষক — সে কখনো মরে না।

কারণ সে কখনো জন্মায়নি।


শরীর জন্মায়। মরে।

মন জন্মায়। মরে।

কিন্তু যে দেখছে —

সেই পর্যবেক্ষক —

সে শাশ্বত।


এবং তুমি সেই পর্যবেক্ষক।

শরীর না।

মন না।

সেই যে দেখছে।


তাই শোনো।

মৃত্যু নিয়ে ভাবা বন্ধ করো না।

কিন্তু গভীরে যাও।


প্রশ্ন করো না — আমি কখন মরব?

প্রশ্ন করো — কে মরবে?


এবং যখন এই প্রশ্নে যথেষ্ট গভীরে যাবে,

দেখবে —

মরার মতো কেউ নেই।

শুধু পর্যবেক্ষক আছে।

এবং সে সবসময় ছিল।

সবসময় থাকবে।


চোখ বন্ধ করো।

শ্বাস শোনো।

তিনজন শ্বাস নিচ্ছে।

তিনজনই বেঁচে আছে।

কতদিন?

জানা নেই।


এবং এই না-জানাটাই জীবন।

এবং এই না-জানার মধ্যে বেঁচে থাকাটাই সাহস।


তাই ভয় পেয়ো না।

মরবে।

সবাই মরে।

কিন্তু যে তুমি সত্যিই —

সেই পর্যবেক্ষক —

সে কখনো মরে না।

আত্মার মুক্তি একাকিত্ব দেহ ও আত্মার সম্পর্ক মনোযোগ

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *