ব্লগ

যে শেষ আমার নিশ্চিত

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গত রাতে আরাশ ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি তার বুকের উঠানামা দেখছিলাম। প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি নিশ্বাস। হঠাৎ একটা ভয়ংকর সত্য আমার মাথায় এল – এই শ্বাসগুলো সংখ্যাযুক্ত। আরাশের জীবনে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্বাস আছে। আমারও আছে। হ্যাপিরও আছে। আর একদিন সেই সংখ্যা শেষ হয়ে যাবে।

এই নিশ্চয়তা কি আমাদের সব কিছুকে অর্থহীন করে তোলে? আমি যে প্রতিদিন কাজ করি, যে স্বপ্ন দেখি, যে ভালোবাসি – এসব কি শুধুই একটা ক্ষণস্থায়ী খেলা?

বাবা মারা যাওয়ার দিন আমি প্রথম বুঝেছিলাম মৃত্যু কী জিনিস। তিনি সকালে আমার সাথে কথা বলেছিলেন, দুপুরে মারা গেলেন। এত সহজ, এত দ্রুত। যেন একটা বাতি নিভে গেল। তার সব কথা, সব স্মৃতি, সব পরিকল্পনা – সব একসাথে বন্ধ। সেই দিন আমি ভেবেছিলাম, বাবার জীবনের অর্থ কী ছিল? তিনি কাজ করেছেন, আমাদের বড় করেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু শেষে তো সব শূন্য।

হ্যাপির সাথে বিয়ের রাতে যখন আমরা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছিলাম, আমি বলেছিলাম, “আমরা একসাথে বুড়ো হব।” কিন্তু এখন ভাবি – এই “একসাথে বুড়ো হওয়া” কি একটা মিথ্যা আশা? আমাদের একজন আগে যাবে, আরেকজন একা থেকে যাবে। আর শেষে দুজনেই চলে যাব। তাহলে এই ভালোবাসার অর্থ কী?

অফিসে যখন আমি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করি, যখন ভাবি আমার ক্যারিয়ার কোথায় যাবে, তখন মনে হয় এসব কি অর্থহীন? একশ বছর পর কেউ মনেও রাখবে না আমি কী কাজ করেছিলাম। আমার সব অফিসিয়াল ইমেইল, রিপোর্ট, প্রেজেন্টেশন – কোথায় থাকবে?

আরাশকে যখন পড়াশোনা করতে বলি, যখন তার ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাই, তখন ভাবি – এই সব পরিকল্পনা কি একটা বিভ্রম? আরাশও একদিন আমার মতো বুঝবে যে সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী। তাহলে কেন আমি তাকে এই দৌড়ে ঢুকাচ্ছি?

জামিউরের সাথে আড্দা দিতে গিয়ে একদিন বলেছিলাম, “ভাই, মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা যা করছি সবই বৃথা।” সে বলেছিল, “কেন ভাই?” আমি বলেছিলাম, “আমরা সবাই তো একদিন মরে যাব।” সে হেসে বলেছিল, “তাই বলে কি আজকে বাঁচা বন্ধ করে দেব?”

জামিউরের কথায় আমি একটু ভাবলাম। হ্যাঁ, আমরা মরব। কিন্তু আজকে আমরা বেঁচে আছি। এই বেঁচে থাকার মুহূর্তটার কি কোনো অর্থ নেই?

সাইফুল কবির একদিন বলেছিল, “ভাই, মৃত্যু আছে বলেই জীবনের মূল্য।” আমি বুঝিনি। সে ব্যাখ্যা করেছিল, “যদি আমরা অমর হতাম, তাহলে প্রতিটা মুহূর্ত সাধারণ মনে হতো। কিন্তু জীবন যেহেতু সীমিত, তাই প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান।”

মৃদুল কানাডা থেকে ফোন করে একদিন বলেছিল, “ভাই, এখানে এসে বুঝেছি জীবন কত ছোট। আমি এত দূরে এসেছি, কিন্তু বাবা-মায়ের সাথে কত কম সময় কাটিয়েছি।” মৃদুল বুঝেছে যে মৃত্যুর নিশ্চয়তা আমাদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে সাহায্য করে।

আমার মনে হয়, মৃত্যুর নিশ্চয়তা হয়তো জীবনকে অর্থহীন করে না – বরং অর্থবহ করে তোলে। কারণ সময় সীমিত, তাই প্রতিটা পছন্দ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ আমরা জানি এক দিন শেষ হবে, তাই আজকের দিনটা মূল্যবান।

হ্যাপির সাথে যখন সকালে চা খাই, জানি যে আমাদের এমন সকাল সংখ্যাসীমিত। হয়তো এক হাজার, হয়তো দশ হাজার। কিন্তু অসীম নয়। এই জানাটা কি আমাদের চা খাওয়াকে আরো মধুর করে তোলে?

আরাশের সাথে যখন খেলি, জানি যে সে একদিন বড় হবে, আমার থেকে দূরে চলে যাবে। আর আমিও একদিন তার কাছ থেকে চিরকালের জন্য বিদায় নেব। এই জানাটা কি আমাদের খেলার প্রতিটা মুহূর্তকে আরো পবিত্র করে তোলে?

নামাজ পড়ার সময় আমি ভাবি – এই নামাজগুলোও সংখ্যাসীমিত। আমার জীবনে হয়তো আরো কয়েক হাজার নামাজ বাকি। এই ভাবনা কি আমার প্রার্থনাকে আরো একাগ্র করে তোলে?

আমার মনে হয়, মৃত্যুর নিশ্চয়তা জীবনের একটা ফ্রেম তৈরি করে। যেমন একটা ছবির ফ্রেম ছবিকে সংজ্ঞায়িত করে, তেমনি মৃত্যু জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে। ফ্রেম ছাড়া ছবি হয় না, মৃত্যু ছাড়া জীবনও হয় না।

যদি আমি জানতাম আমি অমর, তাহলে কি আমি হ্যাপিকে এত ভালোবাসতাম? আরাশের প্রতি কি এত যত্নশীল হতাম? জামিউরের সাথে সময় কাটানোর কি এত আগ্রহ থাকত?

হয়তো মৃত্যুর নিশ্চয়তা আমাদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে শেখায়। আমাদের বলে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা নয়। আমাদের শেখায় ক্ষমা করতে, কারণ সময় কম। আমাদের শেখায় ভালোবাসতে, কারণ সুযোগ সীমিত।

বাবার মৃত্যুর পর আমি যে দায়িত্ব নিয়েছিলাম, সেটা কি অর্থহীন ছিল? নাকি বাবার সীমিত জীবনের অর্থ আমার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে? হয়তো মৃত্যু শেষ নয়, একটা রূপান্তর। আমার ভেতর দিয়ে বাবার মূল্যবোধ, তার ভালোবাসা, তার শিক্ষা চলমান থাকে।

আরাশের মধ্যে আমার যে অংশ প্রবাহিত হবে, সেটাও কি একধরনের অমরত্ব নয়? আমার মৃত্যুর পরও আরাশের মধ্য দিয়ে আমার কিছু অংশ বেঁচে থাকবে। তার সন্তানদের মধ্যে, তাদের সন্তানদের মধ্যে।

হয়তো জীবনের অর্থ “চিরকাল টিকে থাকা” নয়। হয়তো অর্থ হলো “সুন্দরভাবে যাওয়া।” যেমন একটা ভালো গান শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার সুর মনে থেকে যায়।

এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, মৃত্যুর নিশ্চয়তা হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। এটা আমাদের শেখায় বর্তমান মুহূর্তে বাঁচতে। আগামীকাল নিশ্চিত নয়, তাই আজকেটা পূর্ণভাবে বাঁচার চেষ্টা করি।

মৃত্যুর নিশ্চয়তা কি জীবনকে অর্থহীন করে? নাকি এটা জীবনকে অর্থবহ করার একমাত্র উপায়? হয়তো প্রশ্নটাই ভুল। হয়তো মৃত্যু এবং জীবন আলাদা কিছু নয় – একই অস্তিত্বের দুটো দিক।

আর হয়তো এই বোঝাপড়াটাই আমার জীবনের গভীরতম অর্থ।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *