আজ সকালে বাসে একজন বৃদ্ধ হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। তার মুখ ফ্যাকাশে, শ্বাস দ্রুত। সবাই ভিড় করল, কেউ পানি আনল, কেউ ফ্যান করল। কিন্তু আমি দেখলাম তার চোখে – একটা অদ্ভুত শান্তি, যেন তিনি কোথাও দূরে চলে গেছেন। আমি ভাবলাম – শেষ নিঃশ্বাসের আগে কি এমনই হয়? মৃত্যুর দোরগোড়ায় কী ভাবনা আসে মনে?
হাসপাতালে দেখি একজন মুমূর্ষু রোগী তার স্ত্রীর হাত ধরে আছেন। কথা বলতে পারছেন না, কিন্তু চোখ দিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছেন। হয়তো বলতে চাইছেন – “আমি তোমাকে ভালোবেসেছি।” নাকি বলতে চাইছেন – “আমি ভয় পাচ্ছি।” মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে কি ভালোবাসা বড় হয়ে ওঠে, নাকি ভয়?
আমার মনে হয়, শেষ মুহূর্তে হয়তো সব হিসাব-নিকাশ অর্থহীন হয়ে যায়। কত টাকা ছিল, কী পদ ছিল, কার কাছে কত সম্মান ছিল – এসব হয়তো মনেই থাকে না। থাকে শুধু সেই মুহূর্তগুলো যখন আমরা সত্যিকারের মানুষ ছিলাম।
বাবার মৃত্যুর দিন তিনি শেষ যে কথা বলেছিলেন, “আরাশকে ভালো রেখো।” তার চিন্তা ছিল নাতির জন্য। নিজের মৃত্যু নিয়ে নয়। হয়তো শেষ মুহূর্তে আমাদের ভাবনা নিজেকে নিয়ে থাকে না, থাকে যাদের ভালোবাসি তাদের নিয়ে।
রাস্তায় দেখি একটা দুর্ঘটনার পর একজন আহত মানুষ মুখে রক্ত নিয়ে বলছেন, “আমার মেয়েকে বলো আমি তাকে ভালোবাসি।” তার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে প্রধান চিন্তা তার অপূর্ণ ভালোবাসা।
আমি যদি এখনই মারা যেতাম, আমার কী মনে হতো? আরাশের মুখ? হ্যাপির হাসি? নাকি সেসব কাজের অনুশোচনা যা করিনি? সেসব কথার আফসোস যা বলিনি?
জামিউরের দাদা মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, “আমি অনেক মানুষকে দুঃখ দিয়েছি।” তার শেষ ইচ্ছা ছিল ক্ষমা চাওয়া। হয়তো মৃত্যুর কাছাকাছি এসে আমরা বুঝি কোনটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল – জেতা নাকি ক্ষমা করা।
চায়ের দোকানে শুনি একজন বলছেন, “আমার বাবা মৃত্যুর আগে সারাদিন শৈশবের কথা বলছিলেন।” হয়তো শেষ মুহূর্তে আমাদের মন চলে যায় সেই সময়ে যখন আমরা নির্ভার ছিলাম, নিষ্পাপ ছিলাম।
আমার মনে হয়, মৃত্যুর আগে হয়তো আমাদের সারাজীবনের চলচ্চিত্র দ্রুত চলে যায় মনের পর্দায়। কিন্তু থেমে যায় সেই দৃশ্যগুলোতে যখন আমরা সত্যিকারের আনন্দ পেয়েছি। একটা সন্ধ্যায় হ্যাপির সাথে ছাদে বসে চা খাওয়া। আরাশের প্রথম কথা বলা। বন্ধুদের সাথে নিছক গল্প।
নাকি মনে হয় সেইসব মুহূর্তের কথা যখন আমরা অন্যের উপকার করেছি? একজন অসহায় মানুষকে সাহায্য করেছি। কারো দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছি।
পার্কে দেখি একজন বৃদ্ধ তার নাতির সাথে খেলছেন। তিনি হাঁপাচ্ছেন, কিন্তু থামছেন না। হয়তো জানেন এই খেলা আর কয়দিন। হয়তো শেষ মুহূর্তে মনে পড়বে এই খেলার কথা।
আমি কি ভাবব আমার অসম্পূর্ণ কাজের কথা? যে বই লিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু লিখিনি? যে জায়গায় যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু যাইনি? নাকি মনে হবে – এসব করা না করায় কিছু আসে যায় না?
মৃদুলের নানা কানাডায় মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, “দেশের মাটি স্পর্শ করতে পারলাম না।” হয়তো শেষ মুহূর্তে আমাদের মনে পড়ে আমাদের শিকড়ের কথা। আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় ছিল আমাদের ভালোবাসার শুরু।
নাকি মনে হয় কৃতজ্ঞতার কথা? এই জীবন পেয়েছি, ভালোবাসা পেয়েছি, সুন্দর কিছু মুহূর্ত পেয়েছি। এইটুকুই যথেষ্ট।
ট্রেনে দেখি একজন বৃদ্ধা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে এমন একটা ভাব যেন তিনি সবকিছু শেষবারের মতো দেখছেন। গাছপালা, আকাশ, মানুষ – সবকিছু যেন নতুন করে দেখছেন।
আমার মনে হয়, শেষ নিঃশ্বাসের আগে হয়তো আমরা বুঝি জীবনের আসল অর্থ কী ছিল। আমরা যা ভেবেছিলাম গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো আসলে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আর যা ভেবেছিলাম সাধারণ, সেগুলোই ছিল অসাধারণ।
হয়তো মনে হবে – আমি কেন এত চিন্তা করলাম? কেন এত ভয় পেলাম? কেন এত দৌড়ালাম? জীবন তো এত সহজ ছিল।
নাকি মনে হবে ভয়ের কথা? আমি কি ঠিক পথে চলেছি? আমার পরের জীবন কেমন হবে? আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন?
এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, শেষ নিঃশ্বাসের আগ মুহূর্তে হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই। বা হয়তো বুঝি যে উত্তর খোঁজাটাই ভুল ছিল।
হয়তো সেই মুহূর্তে আমি সবচেয়ে শান্ত হই। কারণ তখন আর কিছু করার থাকে না। শুধু থাকে সমর্পণ। আর এই সমর্পণেই হয়তো লুকিয়ে আছে জীবনের চূড়ান্ত সত্য।
একটু ভাবনা রেখে যান