ব্লগ

ওই দাড়িতে আমার মৃত্যুর গন্ধ

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার থুতনি স্পর্শ করছে। সেখানে কিছু পাতলা রোম দেখা যাচ্ছে। প্রথম দাড়ি।

আমার বুকের ভিতরটা হঠাৎ খালি হয়ে গেল।

“বাবা, আমার দাড়ি গজিয়েছে!” আরাশের গলায় গর্ব।

আমি হাসার চেষ্টা করলাম। “হ্যাঁ, তুই বড় হয়ে যাচ্ছিস।”

কিন্তু আমার মনে হল—আমি ছোট হয়ে যাচ্ছি।

আরাশের প্রথম দাড়ি মানে আমার প্রথম বার্ধক্যের চিহ্ন। মানে আমি আর যুবক নই। আমি এখন একটা বুড়ো লোক যার ছেলে যুবক হচ্ছে।

মনে পড়ল আমার প্রথম দাড়ির কথা। আমিও এমনি গর্ব করেছিলাম। আমার বাবা তখন কী ভেবেছিলেন? তিনিও কি এই একই শূন্যতা অনুভব করেছিলেন?

প্রকৃতির কী নিষ্ঠুর খেলা। একজনের যৌবন শুরু হওয়ার সাথে সাথে আরেকজনের যৌবন শেষ হয়ে যায়।

আরাশ এখন আমার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা। আর কিছুদিন পরে আমার চেয়ে লম্বা হবে। তখন আমি তার দিকে তাকাতে গিয়ে মাথা তুলতে হবে। যেমন আমি আমার বাবার দিকে তাকাতাম।

কিন্তু আরাশ আমাকে তেমন সম্মান করবে যেমন আমি বাবাকে করতাম?

আরাশের মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি নতুন একটা আত্মবিশ্বাস। সে এখন আর আমার ছোট্ট শিশুটি নয়। সে একটা কিশোর। আর কিছুদিন পরে যুবক। তারপর একদিন সেও বাবা হবে।

আর আমি? আমি তখন দাদু হব। সাদা দাড়িঅলা একটা বুড়ো মানুষ।

এই চিন্তাটা আমার গলায় কাঁটার মতো বিঁধল।

আমি কি আরাশের দাড়ি গজানোর জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম? নাকি আমি চেয়েছিলাম সে চিরকাল আমার ছোট্ট ছেলে হয়ে থাকুক?

মনে পড়ল যখন আরাশের বয়স তিন বছর ছিল। সে আমার কোলে বসে গল্প শুনত। আমি ছিলাম তার সবচেয়ে বড় হিরো। এখন? এখন সে আমাকে একটা বুড়ো মানুষ মনে করে যার কাছে কম্পিউটার ভালো বোঝে না।

আরাশের দাড়ি গজানোর সাথে সাথে আমার মধ্যেও কিছু একটা গজিয়েছে—মৃত্যুভয়।

আমি বুঝতে পারছি যে জীবনটা একটা রিলে রেস। আমি আরাশের হাতে লাঠিটা তুলে দিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জীবনের দায়িত্ব হস্তান্তর হচ্ছে।

আমার বাবাও একদিন আমাকে দেখে এমনি অনুভব করেছিলেন। তিনিও বুঝেছিলেন যে তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে।

কিন্তু এই উপলব্ধিটা কেন এত কষ্টকর?

আমি তো চাই আরাশ বড় হোক। আমি চাই সে পুরুষ হোক। তাহলে কেন তার দাড়ি দেখে আমার বুকে ব্যথা?

হয়তো কারণ এই দাড়ি আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে আমার দিন ফুরিয়ে আসছে।

আরাশ আবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার মুখে সেই গর্বিত হাসি। সে জানে না তার এই দাড়ি তার বাবার মনে কী তুফান তুলেছে।

আমি আরাশকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করল। বলতে ইচ্ছা করল, “তুই আমার ছোট্ট ছেলে থেকে যা।”

কিন্তু বলিনি। কারণ এটা প্রকৃতির নিয়ম।

সন্তান বড় হবেই। বাবা বুড়ো হবেই।

এটাই জীবনের সত্য।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *