ব্লগ

মৃত্যুর সাথে বন্ধুত্ব

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হাসপাতালের বেডে একটা মানুষ শুয়ে আছে। মাথায় চুল নেই। কেমো দিয়েছে। কিন্তু মুখে হাসি। কেন হাসে? জানি না।

আমি তার পাশে বসি। জিজ্ঞেস করি, “কেমন আছেন?”

সে বলে, “ভালো। আজ সূর্য দেখেছি।”

এই কথায় আমার চোখে পানি।

ক্যান্সার। এই শব্দটা শুনলেই ভয় লাগে। মনে হয় মৃত্যু এসে গেছে।

কিন্তু আমি দেখেছি, ক্যান্সার রোগীরা মৃত্যুকে নিয়ে বাঁচে। ভয় পায় না। মিত্রতা করে।

কেমন করে?

প্রথমে কান্না। “কেন আমার হলো?”

তারপর রাগ। “কী দোষ করেছি?”

তারপর দর কষাকষি। “আল্লাহ, আরেকটু সময় দিন।”

তারপর কষ্ট। গভীর, নীরব কষ্ট।

শেষে গ্রহণ। “এটাই আমার নিয়তি।”

কিন্তু গ্রহণের পর কী হয়? হতাশা? না। শান্তি।

আমি দেখেছি, ক্যান্সার রোগীরা জীবনের আসল অর্থ খুঁজে পায়। প্রতিটা দিন তাদের কাছে উপহার। প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান।

সুস্থ মানুষেরা ভাবে, “কাল করব।” ক্যান্সার রোগীরা ভাবে, “আজ করি।”

দুরারোগ্য ব্যাধির সাথে সহাবস্থান মানে কী?

মানে জীবনকে নতুন চোখে দেখা।

মানে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে আল্লাহকে ধন্যবাদ দেওয়া।

মানে ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ পাওয়া।

মানে ক্ষমা করে দেওয়া। রাগ রাখার সময় নেই।

মানে ভালোবাসা প্রকাশ করা। লুকিয়ে রাখার দরকার নেই।

আমি জানি, ক্যান্সার শুধু একটা রোগ। রোগী নয়। রোগী হলো একটা পূর্ণ মানুষ, যার একটা সমস্যা আছে।

কিন্তু মানুষ তাদের দেখে ভয় পায়। দূরে থাকে। কেন? মনে হয় ছোঁয়াচে।

না, ক্যান্সার ছোঁয়াচে নয়। কিন্তু মানুষের ভয় ছোঁয়াচে।

ক্যান্সার রোগীদের সবচেয়ে বড় শত্রু ক্যান্সার নয়। একাকীত্ব।

তারা চায় স্বাভাবিক আচরণ। দয়া নয়, সাহচর্য।

আমি দেখেছি, একটা মেয়ে ক্যান্সার নিয়ে বিয়ে করেছে। স্বামী জানত। কিন্তু ভালোবেসেছে।

এই ভালোবাসা ওষুধের চেয়ে শক্তিশালী।

দুরারোগ্য ব্যাধির সাথে বাঁচার নিয়ম:

প্রথম: আশা ছাড়া যাবে না। চিকিৎসা আছে।

দ্বিতীয়: প্রতিদিন ছোট্ট একটা লক্ষ্য। আজ বই পড়ব।

তৃতীয়: পরিবারের সাথে সময় কাটানো।

চতুর্থ: যা পারি, তা করা। শুয়ে থাকা নয়।

পঞ্চম: দোয়া। আল্লাহর উপর ভরসা।

কিন্তু সবচেয়ে জরুরি: মৃত্যুকে শত্রু না ভাবা।

মৃত্যু একটা সত্য। সবার জন্য। ক্যান্সার রোগীরা শুধু আগে জানে।

আর এই জানাটাই তাদের সুবিধা। কেন? কারণ তারা প্রস্তুতি নিতে পারে।

কী প্রস্তুতি? মন্দ কাজ ছাড়া। ভালো কাজ করা। ক্ষমা চাওয়া। ক্ষমা করা।

আমি বিশ্বাস করি, ক্যান্সার রোগীরা আমাদের শেখায় বাঁচতে। তারা জানে, জীবন কত মূল্যবান।

হাসপাতালের সেই মানুষটা আমাকে বলেছিল, “ক্যান্সার আমার শত্রু নয়। শিক্ষক।”

কী শেখাল? শেখাল, সময় সীমিত। প্রতিটা দিন গুরুত্বপূর্ণ।

আজ আমি সুস্থ। কিন্তু আগামীকাল জানি না। তাই আজকের দিনটা ভালোভাবে কাটাব।

দুরারোগ্য ব্যাধির সাথে সহাবস্থান মানে হার মানা নয়। মানে নতুন নিয়মে জেতা।

আর সেই জয় মৃত্যুর চেয়েও বড়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *