ব্লগ

জানাজায় দাঁড়িয়ে মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

পাড়ার মোকলেস চাচা মারা গেছেন। আজ তার জানাজা। আমি দাঁড়িয়ে আছি জানাজার নামাজে। সামনে সাদা কাপড়ে মোড়ানো তার লাশ।

এই লাশ দেখে আমার নিজের মৃত্যুর কথা মনে পড়ে।

মোকলেস চাচার বয়স ছিল ৫৮। আমার এখন ৩৯। মানে আরো ১৯ বছর পরে আমিও তার বয়সে পৌঁছাব। কিন্তু কে জানে আমি সেই পর্যন্ত বাঁচব কি না?

মৃত্যু যে কখন আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ইমাম সাহেব দোয়া পড়ছেন। “আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু।” হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন আর রহম করুন।

আমি মনে মনে ভাবি, আমার জানাজার সময় কে এই দোয়া পড়বে? আমার জন্য কে ক্ষমা চাইবে?

আরাশ? সে তখন কত বড় হবে? হ্যাপি? তার কি শক্তি থাকবে?

এই চিন্তা করতে করতে বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে।

মোকলেস চাচাকে কাল পর্যন্ত দেখেছি। তিনি হাঁটছেন, কথা বলছেন, হাসছেন। আজ সব শেষ। একটা নিথর দেহ।

এই যে জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য, এটা কি? আত্মা? রুহ?

যেটা ছিল, সেটা কোথায় গেল? যেটা আছে, সেটা কী?

জানাজার নামাজে কোনো রুকু-সেজদা নেই। শুধু দাঁড়িয়ে দোয়া। মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া।

আমি দোয়া করি মোকলেস চাচার জন্য। কিন্তু মনে মনে ভাবি আমার নিজের অবস্থার কথা।

আমি যদি এই মুহূর্তে মারা যাই, তাহলে আমার কী অবস্থা হবে?

আমার আমলনামায় কী আছে? কত নেকি, কত গুনাহ?

মনকবরে আমাকে প্রশ্ন করা হবে। “মান রাব্বুক? মা দিনুক? মান নাবিয়্যুক?” তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে?

এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব তো?

মুখে বলতে পারব। কিন্তু সেই উত্তর কি আমার জীবনযাত্রার সাথে মিলবে?

আমি বলব আল্লাহ আমার রব। কিন্তু জীবনে আমি কি তার আনুগত্য করেছি?

আমি বলব ইসলাম আমার দ্বীন। কিন্তু আমি কি ইসলাম অনুযায়ী চলেছি?

আমি বলব মুহাম্মাদ (সা.) আমার নবী। কিন্তু আমি কি তার সুন্নত মেনেছি?

এসব প্রশ্নের উত্তর ভেবে গায়ে কাঁটা দেয়।

জানাজা শেষ হলো। লাশ নিয়ে যাওয়া হবে কবরস্থানে। মাটির নিচে দাফন করা হবে।

আমিও একদিন এভাবেই যাব।

বাড়ি ফেরার পথে ভাবি, মৃত্যুর জন্য আমি কতটুকু প্রস্তুত?

আমার কি কোনো ওসিয়ত আছে? আমার মৃত্যুর পর হ্যাপি-আরাশ কিভাবে চলবে?

আমার কোনো সঞ্চয় নেই। কোনো সম্পত্তি নেই। শুধু এই চাকরি। আমার মৃত্যুর সাথে সাথে এটাও শেষ।

তাহলে আমার পরিবার কী খাবে?

এই চিন্তা আমাকে অস্থির করে তোলে।

মৃত্যুর পর পরকালের হিসাব আছে। কিন্তু মৃত্যুর আগে দুনিয়ার হিসাবও আছে।

দুটোর জন্যই আমি অপ্রস্তুত।

বাড়ি ফিরে হ্যাপিকে বলি, “মোকলেস চাচার জানাজা হয়ে গেল।”

হ্যাপি বলে, “আল্লাহ তাকে মাফ করুন।”

আমি বলি, “আমিও যদি এখন মারা যাই?”

হ্যাপি চুপ থাকে। তারপর বলে, “এসব কথা বলো না।”

কিন্তু এসব কথা তো ভাবতেই হয়। মৃত্যু তো সত্য।

আরাশকে দেখি। সে খেলছে। নিশ্চিন্তে। মৃত্যুর কোনো ভাবনা নেই।

আমিও কি একসময় এমন ছিলাম? কখন থেকে এত ভাবি?

বয়সের সাথে সাথে মৃত্যুচিন্তা বাড়ে। এটা স্বাভাবিক।

কিন্তু এই চিন্তা আমাকে কী শেখায়?

শেখায় যে জীবন ক্ষণস্থায়ী। যা করার এখনই করতে হবে।

শেখায় যে দুনিয়ার সম্পদ কোনো কাজে আসবে না। কাজে আসবে শুধু আমল।

শেখায় যে মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। কারণ তারাই আমার জন্য দোয়া করবে।

আজকের জানাজা আমাকে এসব কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন আমার মৃত্যু ইমানের সাথে হয়। যেন আমি প্রস্তুত অবস্থায় দুনিয়া ছাড়তে পারি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *