ব্লগ

দুই মুখের সংলাপ

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ইমেইল লিখছি বসকে। “আশা করি আপনি সুস্বাস্থ্যে আছেন। বিনীতভাবে জানাচ্ছি যে…” কিন্তু মনে মনে ভাবছি—”এই বুড়ো আবার কী বিপদ আনলো।”

আনুষ্ঠানিক ভাষা একটা নাটক। অনানুষ্ঠানিক মন আসল মানুষ।

অফিসের মিটিংয়ে বলি, “আপনার প্রস্তাবটি অত্যন্ত চিন্তাভাবনার দাবি রাখে।” কিন্তু আসলে মনে করি—”এটা একদম বেকার আইডিয়া।”

ভদ্রতার ভাষায় সত্য লুকিয়ে রাখি।

ক্লায়েন্টের কাছে বলি, “আপনার চাহিদা পূরণে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করব।” কিন্তু কলিগদের কাছে বলি, “কাস্টমার একদম পাগল।”

একই সিচুয়েশন, দুই ভাষা।

কেন এই ভণ্ডামি?

হয়তো সভ্যতার দাবি। হয়তো চাকরি বাঁচানোর জন্য। হয়তো সামাজিক সুবিধার জন্য।

কিন্তু এই দ্বৈত ভাষার মূল্য কী?

আনুষ্ঠানিক ভাষায় বলি, “দুঃখিত, আজ সময় নেই।” অনানুষ্ঠানিক মনে ভাবি, “বিরক্ত করিস না।”

আনুষ্ঠানিক ভাষা নরম। অনানুষ্ঠানিক মন কঠোর।

বন্ধুদের কাছে বলি, “বস একদম গাধা।” কিন্তু বসের কাছে বলি, “আপনার নেতৃত্বে কাজ করতে পেরে আমি গর্বিত।”

সত্যের দুটো মুখ।

সবচেয়ে ভয়ানক যখন এই দ্বৈত ভাষা অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন আমি নিজেই বুঝতে পারি না কোন ভাষাটা আসল।

স্ত্রীকে বলি, “তোমার রান্না চমৎকার।” কিন্তু মনে মনে ভাবি, “আজও তেমন হয়নি।” এটা কি ভদ্রতা না ভণ্ডামি?

প্রেমেও দুই ভাষা।

আরাশের স্কুলের অভিভাবক মিটিংয়ে বলি, “আমার ছেলে বেশ মেধাবী।” কিন্তু বাড়িতে বলি, “পড়াশোনায় একদম মন নেই।”

পারিবারিক গর্বও একটা আনুষ্ঠানিক ভাষা।

প্রশ্ন হচ্ছে—আনুষ্ঠানিক ভাষা কি মিথ্যা? নাকি সামাজিক প্রয়োজন?

হয়তো দুটোই। মিথ্যা, কিন্তু প্রয়োজনীয় মিথ্যা।

কারণ সবাই যদি অনানুষ্ঠানিক ভাষায় কথা বলি, তাহলে সমাজ চলবে না। সম্পর্ক ভাঙবে। কাজ হবে না।

আনুষ্ঠানিক ভাষা সমাজের তেল। যেটা ছাড়া মেশিন চলে না।

কিন্তু এই তেলে কি আমাদের আসল চেহারা ঢেকে যাচ্ছে?

মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় একদিন সবার সাথে অনানুষ্ঠানিক ভাষায় কথা বলি। সত্যি কথা বলি। কিন্তু সেই সাহস নেই।

কারণ সেই দিনই হয়তো চাকরি চলে যাবে। সম্পর্ক নষ্ট হবে।

আনুষ্ঠানিক ভাষা একটা চুক্তি। সবাই মিলে ঠিক করেছি—আমরা নরম কথা বলব, কঠোর চিন্তা করব।

কিন্তু এই চুক্তিতে আমরা কী হারিয়েছি? সততা? স্বতঃস্ফূর্ততা? আবেগের তাৎক্ষণিকতা?

হয়তো আনুষ্ঠানিক ভাষাই সভ্যতা। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক মনই মানবিকতা।

দুটোর ব্যালেন্স কী?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *