ব্লগ

মুখোশের আড়ালে মুখ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে অফিসের এক সহকর্মী আমাকে তার ফেসবুক প্রোফাইল দেখাল। সেখানে সে একজন কবি, চিন্তাবিদ, প্রকৃতিপ্রেমী। গভীর কোটস, সূর্যাস্তের ছবি, দর্শনের লাইন। আমি অবাক। অফিসে তো সে শুধু ফাইল নিয়ে দৌড়ায়, বসের সামনে হ্যাঁ-হুঁ করে।

“তুমি কবিতা লেখো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“হ্যাঁ। কিন্তু অফিসে কেউ জানে না। এখানে কবিতার কদর নেই।”

তার কথায় আমার ভিতরে একটা অ্যাপ খুলে গেল যার নাম ‘বিস্ময় প্লাস’। যে মানুষটাকে আমি দুবছর ধরে চিনি, সে আসলে সম্পূর্ণ আলাদা একজন।

বাড়ি ফিরে আরাশের ইউটিউব চ্যানেল খুলে দেখলাম। সেখানে সে একজন শিল্পী, দার্শনিক। তার ভিডিওর কমেন্টে লেখা – “তোমার কাজ দেখে মুগ্ধ”, “তুমি একজন প্রকৃত শিল্পী।” অথচ স্কুলে তাকে কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় না।

“আরাশ, তুই কি মনে করিস অনলাইনে তুই যেমন, আসলেও তুই তেমন?”

সে একটু ভেবে বলল, “বাবা, স্কুলে আমাকে ‘আর্ট করে ভালো ছেলে’ বলে ভাবে। কিন্তু অনলাইনে মানুষ আমার আর্ট দেখে আমাকে চেনে। তারা বোঝে আমি কী বোঝাতে চাই। তো কোনটা বেশি আসল?”

প্রশ্নটা আমার মাথায় ঢুকে গেল। রাতে হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই তো তোর বোনের সাথে প্রায়ই চ্যাট করিস। তার সাথে অনলাইনে যেমন কথা বলিস, সামনাসামনি কি তেমনি বলতিস?”

“না। অনলাইনে আমি আরও খোলামেলা। কান্নার কথা, দুঃখের কথা – যেগুলো সামনাসামনি বলতে লজ্জা লাগে। কিবোর্ডে টাইপ করতে সহজ লাগে।”

“তাহলে অনলাইনে তুই কে? আসল হ্যাপি নাকি নকল?”

“আমার মনে হয় অনলাইনের হ্যাপি আরও সত্য। কারণ সেখানে আমি ভয় পাই না।”

আমি আমার নিজের কথা ভাবলাম। আমার কোনো সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট নেই। কেন? কারণ আমি জানি না আমি কে। আমি কি সেই মানুষ যে সবসময় চাকরি হারায়? নাকি সেই মানুষ যে সততার জন্য চাকরি ছাড়ে? আমি কি একজন ব্যর্থ বাবা নাকি আদর্শবাদী বাবা?

অনলাইনে আমি কী লিখব? “আজ আবার চাকরি হারালাম কারণ দুর্নীতি করতে পারলাম না”? নাকি “আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সংগ্রাম চলছে”? কোনটা আসল আমি?

পরদিন জামিউরের সাথে চায়ের দোকানে বসে এই বিষয়ে কথা বলছিলাম। সে বলল, “হায়দার ভাই, আমার মনে হয় অনলাইন পরিচয়টাই বেশি আসল। কারণ সেখানে আমরা সেই মানুষটা হই যেটা আমরা আসলে হতে চাই।”

“কিন্তু সেটা কি মিথ্যা না?”

“না ভাই। সেটা আমাদের সম্ভাবনা। আমি হয়তো এখনো সেই মানুষ হতে পারিনি, কিন্তু আমার ভিতরে সেই মানুষ আছে।”

বাড়ি ফিরে আরাশকে দেখি সে একটা নতুন ড্রয়িং করছে। একটা মানুষের মুখ। কিন্তু সেই মুখে দুটো প্রতিফলন – একটা বাইরের, একটা ভিতরের।

“এটা কী বোঝাচ্ছে?”

“বাবা, এটা আমাদের সবার গল্প। বাইরের মুখটা হলো আমরা যেমন দেখাই। ভিতরের মুখটা হলো আমরা যেমন আসলে। অনলাইনে কখনো কখনো ভিতরের মুখটা বেরিয়ে আসে।”

আমার মনে পড়ল মৃদুলের কথা। সে যখন কানাডা থেকে ফোন করেছিল, তার গলায় যে ভাঙন ছিল, সেটা সে হয়তো অফিসের সহকর্মীদের সামনে দেখায় না। কিন্তু আমার কাছে দেখিয়েছে। সেটা কি বেশি আসল না?

রাতে নামাজ পড়ে দোয়া করছিলাম। মনে হলো আল্লাহর সামনে আমি সবচেয়ে সত্য। এখানে আমি লুকাতে পারি না। আমার ভয়, আমার দুর্বলতা, আমার স্বপ্ন – সবই তিনি জানেন। আল্লাহর কাছে আমার কোনো “অনলাইন পরিচয়” নেই। শুধু আসল পরিচয়।

তাহলে হয়তো অনলাইন পরিচয় সত্য হতে পারে, যদি সেটা আল্লাহর কাছে আমরা যেমন, তেমন হয়। যদি সেখানে আমাদের ভিতরের সেই মানুষটা কথা বলে যে মিথ্যা বলতে জানে না, যে স্বপ্ন দেখে, যে ভালোবাসে।

কিন্তু যদি অনলাইনেও আমরা মুখোশ পরি, তাহলে সেটা আসল নয়, নকল।

আসল প্রশ্ন হলো: আমরা কি অনলাইনে মুখোশ পরি নাকি মুখোশ খুলি? উত্তরটা নির্ভর করে আমাদের উপর।

আমি এখনো অনলাইনে নেই। হয়তো কখনো আসব। কিন্তু যেদিন আসব, সেদিন আমি সেই মানুষটা হয়ে আসব যে আল্লাহর কাছে নামাজে দাঁড়ায়। কোনো মুখোশ ছাড়া।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

ব্লগ

মাপ

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *