ট্রেনের জানালা দিয়ে শহরের পেছনে পড়ে যাওয়া দেখছি। প্রতিটা বাড়ি, প্রতিটা মানুষ—সবার একটা গল্প আছে। কিন্তু আমার গল্প? আমার গল্প আর আমার না। সেটা এখন অন্যের চোখের গল্প।
আজ সকালে মিরর দেখে টাই পরতে গিয়ে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো। যে মানুষটাকে দেখলাম, সে আমি না। সে আমার বসের পছন্দের একটা ভার্শন। চুল এমনভাবে আঁচড়ানো যেন স্যার বলে—”স্মার্ট লাগছে।” হাসি এমনভাবে সাজানো যেন ম্যানেজার মনে করে—”পজিটিভ অ্যাটিটিউড।”
কবে থেকে আমি আমার নিজের মুখ দেখি না? শুধু দেখি অন্যরা আমার মুখে কী দেখতে চায়।
অফিসে ঢুকতেই রিসেপশনিস্ট রিতার দিকে তাকালাম। সে হাসল। আমিও হাসলাম। কিন্তু সেই হাসিটা আমার ছিল না। সেটা ছিল একটা কর্মী হায়দারের হাসি, যে জানে কীভাবে অন্যদের সাথে ব্যবহার করতে হয়। আসল হায়দার হয়তো আজ মন খারাপ। কিন্তু কর্মী হায়দারের মন খারাপের বিলাসিতা নেই।
লিফটে উঠে প্রতিবিম্ব দেখলাম। সেই একই খেলা। নিজেকে বসের চোখে দেখা। কাঁধ সোজা? চেক। চোখে আত্মবিশ্বাস? চেক। মুখে হাল্কা হাসি? চেক। এই যন্ত্রটা এতদিনে পারফেক্ট হয়ে গেছে।
কিন্তু যন্ত্রের ভিতরে মানুষটা কী করছে? সে কাঁদছে। সে চিৎকার করে বলতে চায়—”আমি এই না! আমি অন্যরকম!” কিন্তু তার কণ্ঠস্বর বের হয় না। যন্ত্রের শব্দে চাপা পড়ে যায়।
একবার ছোটবেলায় বাবা বলেছিলেন, “নিজের মতো থাকিস।” কিন্তু নিজের মতো থাকা মানে কী? যখন নিজেকে চিনিই না, তখন নিজের মতো থাকবো কীভাবে?
দুপুরে ক্যান্টিনে বসে চা খেতে খেতে দেখলাম একটা পিঁপড়া টেবিলের ওপর হাঁটছে। সে জানে সে কোথায় যাচ্ছে। আমি জানি না আমি কোথায় যাচ্ছি। শুধু জানি কোথায় যেতে অন্যরা চায়।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো—এই রোগ ছোঁয়াচে। বাড়িতে গিয়েও ভাবি—প্রতিবেশীরা কী ভাবছে? দোকানদার কী ভাবছে? এমনকি রিকশাওয়ালাও। সবার কাছে আমাকে একটা নিখুঁত ভার্শনে পেশ করতে হয়।
রাতে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাই। চাঁদকে জিজ্ঞেস করি, “তুমি কি অন্যদের চোখে নিজেকে দেখো?” চাঁদ উত্তর দেয় না। কিন্তু তার নীরবতা বলে দেয়—”আমি শুধু আমি।”
“আমি শুধু আমি”—এই কথাটা কত সহজ, কত কঠিন।
মাঝে মাঝে ভাবি, আমার কি কোনো অসুখ হয়েছে? এমন একটা অসুখ যেটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু আত্মাকে শুকিয়ে ফেলে। যে অসুখের নাম “অন্যের চোখের দাসত্ব।”
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ানক সত্য হচ্ছে—আমি এই দাসত্বে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন মুক্ত হতেও ভয় লাগে। কারণ মুক্ত হলে আমি কে? যদি অন্যের চোখে নিজেকে না দেখি, তাহলে কার চোখে দেখবো?
নিজের চোখে?
কিন্তু নিজের চোখ কোথায়? কোন্ তাকে রাখা আছে?
একটু ভাবনা রেখে যান