আরাশের সামনে আমি একজন শক্তিশালী বাবা। যে সব সমস্যার সমাধান জানে। যার কোনো ভয় নেই। যে সব সময় নিয়ন্ত্রণে আছে।
কিন্তু আরাশ যখন ঘুমায়, আমি সেই মুখোশ খুলে রাখি। তখন আমি শুধু একজন দুর্বল মানুষ।
আজ আমার হাতে টাকা নেই। কিন্তু আরাশ বলেছে নতুন বই কিনতে হবে।
আমি বলেছি, “কাল কিনে দেব।”
কিন্তু আমি জানি না কাল টাকা আসবে কোথা থেকে।
আরাশের সামনে আমি আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু ভিতরে আমি আতঙ্কিত।
আমি কি একটা মিথ্যা বলেছি? না, আমি একটা আশা দিয়েছি। নিজের কাছে নিজেরই।
আরাশ যখন ভবিষ্যতের কথা বলে, আমি বলি, “সব ভালো হবে।”
কিন্তু আমি নিজেই জানি না আমার ভবিষ্যৎ কী।
আরাশ পড়াশোনায় ভালো। ও ডাক্তার হতে চায়। আমি বলি, “অবশ্যই পারবি।”
কিন্তু ডাক্তার হতে অনেক টাকা লাগে। সেই টাকা আমার কাছে নেই।
তবুও আমি আরাশের স্বপ্নে ভাঙন ধরাতে দিই না।
একদিন আমার খুব মন খারাপ ছিল। চাকরি চলে গেছে। নতুন কাজ পাচ্ছি না। কিন্তু আরাশের সামনে হাসি ছিল।
আরাশ জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, আপনার মন খারাপ?”
আমি বলেছিলাম, “না তো। কেন এমন মনে হচ্ছে?”
আরাশ বলেছিল, “তাহলে ভালো।”
কিন্তু ভাবি, আমি কি ঠিক করছি? আমি কি আরাশকে ভুল শেখাচ্ছি?
আমি শেখাচ্ছি যে সমস্যা লুকানো যায়। দুর্বলতা দেখানো যায় না।
কিন্তু এটা কি ঠিক?
আমার বাবাও আমার সামনে কখনো দুর্বলতা দেখাতেন না। আমি মনে করতাম উনি সব পারেন।
এখন আমি বুঝি, উনিও আমার মতো অভিনয় করতেন।
এই অভিনয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসছে। বাবারা তাদের সন্তানদের সামনে শক্তিশালী থাকার ভান করেন।
কিন্তু এতে লাভ কী? ক্ষতি কী?
লাভ হলো, সন্তান নিরাপত্তা বোধ করে। ভাবে বাবা সব সামলাবে।
ক্ষতি হলো, সন্তান জানে না বাবাও মানুষ। বাবারও দুর্বলতা আছে। ভয় আছে।
আমি আরাশকে দেখাই যে আমি নির্ভরযোগ্য। কিন্তু দেখাই না যে আমি মানবিক।
আরাশ যখন বড় হবে, তার নিজের দুর্বলতা থাকবে। সে কি মনে করবে দুর্বলতা লজ্জার?
আমি কি তাকে শেখাচ্ছি যে পুরুষদের কাঁদা উচিত নয়? ভয় পাওয়া উচিত নয়?
মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে করে আরাশকে বলি, “বাবারও কষ্ট হয়।” বলি, “বাবারও ভয় লাগে।”
কিন্তু পারি না। ভাবি, এতে আরাশের বাবার প্রতি শ্রদ্ধা কমে যাবে।
আমি ভুল ভাবি। সন্তানরা তাদের বাবার মানবিক দিক দেখলে শ্রদ্ধা হারায় না। বরং আরো কাছে আসে।
কিন্তু আমি সেই ঝুঁকি নিতে পারি না।
আমি চাই আরাশ আমাকে একজন হিরো মনে করুক। এমনকি যদি সেই হিরো হওয়া আমার জন্য কষ্টকর হয়।
কিন্তু হিরো হওয়া কত ক্লান্তিকর! সব সময় শক্তিশালী থাকা, সব সময় আত্মবিশ্বাসী থাকা, সব সময় সঠিক উত্তর দেওয়া।
আমি কখনো বলতে পারি না, “আমি জানি না।” বলতে পারি না, “আমি ভয় পাচ্ছি।” বলতে পারি না, “আমারও সাহায্য লাগে।”
আরাশের সামনে আমি একটা সুপারম্যান। কিন্তু ভিতরে আমি একটা সাধারণ মানুষ।
এই দ্বৈততা আমাকে ক্লান্ত করে তোলে।
কিন্তু আমি থামি না। কারণ আমি মনে করি এটাই বাবার দায়িত্ব।
সন্তানের সামনে নিজের দুর্বলতা লুকানো। সন্তানকে নিরাপত্তার মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া।
কিন্তু একদিন আরাশ বড় হবে। তখন সে জানবে আমার সব দুর্বলতা। সব ভয়। সব অক্ষমতা।
তখন সে কি আমাকে ক্ষমা করবে এই অভিনয়ের জন্য?
নাকি বুঝবে যে আমি তার ভালোর জন্যই এই অভিনয় করেছি?
আমি জানি না। কিন্তু আমি চালিয়ে যাই।
কারণ একজন বাবার সবচেয়ে বড় অভিনয় হলো নিজের সন্তানের সামনে শক্তিশালী থাকার ভান করা।
এবং এই অভিনয়ে আমি পটু।
একটু ভাবনা রেখে যান