ব্লগ

নাক ডাকার নরক

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হ্যাপির নাক ডাকার শব্দ শুনে মনে হয় ঘরে একটা ছোট ট্রেন চলছে। খুব হালকা, কিন্তু নিয়মিত। “খোররর… খোররর…” এই শব্দটা আমার কানে এমনভাবে বাজে যেন কেউ আমার কানের ভিতর একটা মোটরসাইকেল চালু করে রেখেছে।

রাত ১১টায় শুয়েছি। ক্লান্ত। মনে করেছি আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাব। কিন্তু হ্যাপি যেই ঘুমিয়ে পড়েছে, অমনি শুরু হয়েছে সেই আওয়াজ। প্রথমে মনে হয়েছিল হয়তো একটু পরে বন্ধ হবে। কিন্তু না। সেটা আরো জোরে হচ্ছে।

আমি পাশ ফিরি। কানে হাত দিয়ে ঢেকে রাখি। কিছুই কাজ করে না। সেই আওয়াজ যেন আমার মাথার ভিতর ঢুকে গেছে। বালিশ দিয়ে কান চাপাই। তবুও শুনতে পাই।

হ্যাপিকে একটু নাড়া দিই। সে একটু নড়েচড়ে আবার শান্ত হয়ে যায়। দু’মিনিট নিরবতা। মনে হয় এবার হয়তো ঠিক হয়েছে। কিন্তু না। আবার শুরু। আরো জোরে।

রাত ১২টা, ১টা, ২টা। আমি জেগে আছি। হ্যাপি গভীর ঘুমে। তার কাছে হয়তো কোনো সমস্যাই নেই। কিন্তু আমার কাছে এটা একটা অত্যাচার।

মনে পড়ে যায় বিয়ের আগের রাতগুলোর কথা। একা ঘুমাতাম। কোনো আওয়াজ ছিল না। যখন ইচ্ছা ঘুমিয়ে পড়তাম। এখন মনে হয় সেই স্বাধীনতা হারিয়ে গেছে।

কিন্তু হ্যাপিকে দোষ দিতেও পারি না। এটা তো তার ইচ্ছাকৃত নয়। সে ঘুমিয়ে আছে। তার কোনো দোষ নেই। দোষ আমার যে আমি এত সহজে ঘুমাতে পারি না।

একবার ভাবি অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমাব। কিন্তু তাহলে হ্যাপি কষ্ট পাবে। ভাববে আমি তাকে এড়িয়ে চলেছি। এটাও করতে পারি না।

রাত ৩টায় যখন একটু ঘুম আসে, তখন হঠাত হ্যাপির আরো জোরে নাক ডাকার শব্দে আবার জেগে যাই। মনে হয় কান্না করে ফেলি।

কেন আমি এত সেনসিটিভ? অন্য মানুষেরা কি এমন সমস্যায় ভোগে? নাকি আমারই কোনো অসুখ আছে যে ছোট আওয়াজেও ঘুম ভেঙে যায়?

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “আমাকে একটু গভীর ঘুম দাও। এমন ঘুম যাতে এই আওয়াজ আমার কানে না যায়।” কিন্তু সেই ঘুম আর আসে না।

সকালে হ্যাপি উঠে বলে, “খুব ভালো ঘুম হয়েছে।” আমি কিছু বলতে পারি না। বলব কী? যে তুমি সারারাত নাক ডেকে আমার ঘুম হারাম করে রেখেছ?

অফিসে গিয়ে সারাদিন ঝিমিয়ে থাকি। কাজে মনোযোগ নেই। সহকর্মীরা জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে?” বলতে পারি না যে আমার স্ত্রীর নাক ডাকার জন্য ঘুম হয়নি।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে হ্যাপিকে বলার চেষ্টা করি। “তুমি রাতে নাক ডাক।” সে অবাক হয়ে বলে, “সত্যি? আমি তো জানিই না।” তার নিষ্পাপ মুখ দেখে আর কিছু বলতে পারি না।

ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ভাবি। কিন্তু এই সমস্যার জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়া কি যৌক্তিক? নাকি এটা নিয়েই থাকতে হবে?

কানের প্লাগ কেনার কথা ভাবি। কিন্তু সেটা পরে ঘুমানো অস্বস্তিকর। আর আরাশ যদি রাতে কিছু হয়, তাহলে শুনতে পাব না।

এই সমস্যার কি কোনো সমাধান আছে? নাকি বিবাহিত জীবনের এটাও একটা অংশ যেটা মেনে নিতে হবে?

রাতে আবার সেই একই সংগ্রাম। হ্যাপির নাক ডাকা, আমার জেগে থাকা। কিন্তু আশার কথা হল, ভালোবাসার মানুষের পাশে থাকার যে সুখ, সেটা হয়তো এই ছোট কষ্টের চেয়ে বেশি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *