নামহীন আমি
“আপনার নাম কী?”
সাধারণ একটা প্রশ্ন। মানুষ প্রতিদিন এই প্রশ্নের উত্তর দেয়। কিন্তু গতকাল অফিসে যখন নতুন সহকর্মী নাজিফ এই প্রশ্নটা করল, আমার মুখ থেকে শব্দ বের হলো না।
মাথার ভেতর একটা শূন্যতা। যেন কেউ আমার স্মৃতির ফাইলটা ডিলিট করে দিয়েছে। আমার নাম কী? এই সহজ প্রশ্নের উত্তর জানি না আমি?
পাঁচ সেকেন্ড। দশ সেকেন্ড। নাজিফের চোখে অবাক হওয়ার ভাব। “কী হলো? ঠিক আছেন?”
তারপর হঠাৎ মনে পড়ল। একটা শব্দ ভেসে এলো অন্ধকার থেকে। “হায়দার। আমার নাম হায়দার।”
কিন্তু শব্দটা মুখ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। যেন আমি মিথ্যা বলছি। যেন “হায়দার” অন্য কারো নাম, আমার নয়।
নাজিফ হাসল। “ও, হায়দার ভাই। আমি নাজিফ। খুশি হলাম।”
আমিও হাসলাম। করমর্দন করলাম। স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু ভেতরে একটা ফাটল তৈরি হয়ে গেল। “হায়দার” শুনে যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা—সেই চেনা অনুভূতি, সেই পরিচয়ের স্বীকৃতি—সেটা হলো না।
পুরো দিন এই অস্বস্তি নিয়ে কাজ করলাম। মিটিংয়ে বসে ভাবলাম, এই টেবিলে যে মানুষটা বসে আছে তার নাম হায়দার। কিন্তু আমি কি সেই মানুষ?
একবার নিজেকে পরীক্ষা করতে চাইলাম। মনে মনে বললাম, “আমার নাম হায়দার।” কিন্তু বাক্যটা মিথ্যা মনে হলো। ঠিক যেমন কেউ যদি বলে, “আমি এভারেস্ট জয় করেছি” কিন্তু আসলে করেনি।
দুপুরে ক্যান্টিনে রিফাত বলল, “হায়দার ভাই, চা খাবেন?”
“হায়দার ভাই” শুনে চমকে উঠলাম। সে কাকে ডাকছে? তারপর বুঝলাম আমাকে। কিন্তু সেই “আমি” যেন আমার চেনা “আমি” নয়।
বিকেলে টয়লেটে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। প্রতিফলনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাম কী?”
আয়নার মানুষটা চুপ। তার চোখে একটা প্রশ্ন। একটা সন্দেহ। সে যেন বলছে, “জানি না। তুমি বলো।”
ছোটবেলায় আম্মু শেখাতেন, “তোমার নাম হায়দার। বলো, হায়দার।” আমি আনন্দে চিৎকার করে বলতাম, “হায়দার! আমার নাম হায়দার!” নামটা ছিল আমার প্রথম পরিচয়, প্রথম অহংকার। যখন কেউ “হায়দার” ডাকত, আমি দৌড়ে যেতাম। সেই ডাক আমার জন্য, আমার কাছে।
কিন্তু আজ “হায়দার” শুনে মনে হয় অন্য কেউ আছে যার জন্য এই ডাক। আমি শুধু তার জায়গা দখল করে আছি।
বাড়ি ফিরে হ্যাপি রান্নাঘর থেকে বলল, “হায়দার, হাত-মুখ ধুয়ে নাও। খাবার দিচ্ছি।”
দাঁড়িয়ে থাকলাম। “হায়দার”—সে কাকে ডাকছে? আমাকে? কিন্তু আমি তো হায়দার নই। অন্তত এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে না।
হ্যাপি এসে জিজ্ঞেস করল, “শুনতে পাওনি? হায়দার?”
“হ্যাঁ, শুনেছি।” কণ্ঠস্বর নিজেরই মনে হলো না। যেন অন্য কেউ আমার কণ্ঠস্বর ব্যবহার করছে।
খাবার টেবিলে আরাশ বলল, “বাবা, আজকে স্কুলে আমার নাম নিয়ে সবাই মজা করছিল। বলছিল আরাশ মানে সিংহাসন। তোমার নাম নিয়ে কেউ কখনো মজা করেছে?”
প্রশ্নটা আমাকে থামিয়ে দিল। “হায়দার” নাম নিয়ে কেউ মজা করেছে কি? মনে নেই। কারণ “হায়দার” যেন আমার নাম ছিলই না কখনো। এটা একটা পরিচয়পত্রের নাম, একটা সার্টিফিকেটের নাম। কিন্তু আমার আসল নাম কী?
রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবলাম, নাম আসলে কী? একটা শব্দ যেটা মানুষ আমাদের ডাকার জন্য ব্যবহার করে। কিন্তু এই শব্দ কি আমাদের সংজ্ঞায়িত করে? “হায়দার” শব্দটা কি আমাকে বলে দেয় আমি কে?
যদি আগামীকাল আমার নাম বদলে “রাহাত” হয়ে যায়, আমি কি অন্য মানুষ হয়ে যাব? আমার চিন্তা কি বদলে যাবে? আমার অনুভূতি কি ভিন্ন হবে?
হয়তো আসলে “হায়দার” হলো একটা মুখোশ। সমাজ আমাকে এই মুখোশ পরিয়ে দিয়েছে যাতে মানুষ আমাকে চিনতে পারে, ডাকতে পারে, শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু মুখোশের ভেতরে যে মানুষ, তার নাম কী?
মনে পড়ে আব্বু মারা যাওয়ার সময় বলেছিলেন, “মানুষ যখন মরে যায়, তখন শুধু তার নাম থেকে যায়।” তার মানে কি মৃত্যুর পর আমি শুধু “হায়দার” হয়ে থাকব? একটা শব্দ, একটা স্মৃতি?
কিন্তু জীবিত থাকতে আমি কি শুধু “হায়দার”? নাকি আমি এর চেয়ে বেশি কিছু? এর চেয়ে কম কিছু?
পাশে হ্যাপি ঘুমিয়ে আছে। তার একটা নাম আছে—হ্যাপি। কিন্তু আমি যখন তাকে দেখি, আমি কি “হ্যাপি” দেখি নাকি একজন মানুষ দেখি? তার নাম কি তাকে সংজ্ঞায়িত করে?
আরাশ পাশের ঘরে ঘুমিয়ে আছে। সে “আরাশ”। কিন্তু সে কি শুধু একটা নাম? নাকি সে একটা অনুভূতি যা আমি তার বাবা হিসেবে অনুভব করি?
হয়তো সমস্যা হলো আমরা নামকে খুব গুরুত্ব দিই। আমরা ভাবি নাম হলো আমাদের পরিচয়। কিন্তু আসলে নাম শুধু একটা সুবিধা। একটা ট্যাগ। যাতে এই জটিল পৃথিবীতে মানুষ একে অপরকে আলাদা করতে পারে।
আমার প্রকৃত পরিচয় হয়তো “হায়দার” নয়। আমার প্রকৃত পরিচয় হলো সেই অনুভূতিগুলো যা আমি অনুভব করি। সেই চিন্তাগুলো যা আমি ভাবি। সেই কষ্টগুলো যা আমি বহন করি। সেই আনন্দগুলো যা আমি খুঁজি।
কিন্তু এই অনুভূতি, এই চিন্তা, এই কষ্ট, এই আনন্দ—এগুলোর নাম কী? এগুলোর কোনো নাম আছে কি?
হয়তো আমার কোনো নাম নেই। হয়তো আমি নামহীন। একজন অস্তিত্ব যে “হায়দার” নামে বেঁচে থাকে কিন্তু আসলে নিজে অন্য কেউ।
মধ্যরাতে উঠে আবার আয়নার সামনে গেলাম। নিজের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমার নাম হায়দার।”
কিন্তু বাক্যটা শূন্যে মিলিয়ে গেল। কোনো প্রতিধ্বনি নেই, কোনো স্বীকৃতি নেই।
তারপর বললাম, “আমার নাম…” কিন্তু থেমে গেলাম। কী বলব? আমার নাম কী?
হয়তো আমার নাম হলো সেই প্রশ্ন যা আমি প্রতিদিন করি। হয়তো আমার নাম হলো সেই সন্দেহ যা আমাকে জাগিয়ে রাখে। হয়তো আমার নাম হলো সেই খোঁজ যা আমি অব্যাহত রাখি।
আয়নায় আমার প্রতিফলন তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁট নড়ছে, আমার সাথে। আমরা একসাথে বলছি, “আমি…”
কিন্তু “আমি” কে? “আমি” কী?
অফিসে প্রতিদিন আইডি কার্ড ঝুলিয়ে ঢুকি। কার্ডে লেখা “হায়দার – মার্কেটিং ম্যানেজার”। এই পরিচয়টা প্রতিষ্ঠানের। ব্যাংকে আমার অ্যাকাউন্ট আছে “হায়দার” নামে। পাসপোর্টে লেখা “হায়দার”। জন্মসনদে লেখা “হায়দার”।
সব জায়গায় “হায়দার”। কিন্তু “আমি” কোথায়?
হয়তো এটাই সত্য—আমরা আসলে নামহীন। আমাদের দেওয়া হয় একটা লেবেল, আর আমরা সারাজীবন সেই লেবেলটা বহন করি। কিন্তু লেবেলের নিচে যে অস্তিত্ব, সেটার কোনো নাম নেই।
একদিন যখন আমি মরে যাব, মানুষ বলবে “হায়দার মারা গেছে”। কবরের পাথরে লেখা হবে “হায়দার”। কিন্তু যে মানুষটা সত্যিই মারা যাবে, তার নাম কী ছিল?
ফজরের আজান হলো। উযু করে নামাজে দাঁড়ালাম। সিজদায় মাথা রাখলাম। ফিসফিস করে বললাম, “ইয়া আল্লাহ, আমার নাম তুমি জানো। আমি জানি না। কিন্তু তুমি জানো।”
হয়তো এটাই যথেষ্ট। হয়তো আল্লাহর কাছে আমার একটা নাম আছে যা আমি জানি না। যা কেউ জানে না। একটা গোপন পরিচয়। একটা প্রকৃত নাম।
এই পৃথিবীতে আমি “হায়দার”। কিন্তু অন্য কোথাও, অন্য কোনো মাত্রায়, আমি হয়তো অন্য কিছু। অন্য কেউ।
সকাল হলো। হ্যাপি ডাকল, “হায়দার, ঘুম থেকে ওঠো।”
আমি উত্তর দিলাম। সাড়া দিলাম সেই নামে। কারণ এই জীবনে এটাই আমার পরিচয়।
কিন্তু ভেতরে জানি, আমি নামহীন। আমি একটা অনুভূতি, একটা সত্তা, একটা প্রশ্ন—যার কোনো নাম নেই।
আর হয়তো এভাবেই বেঁচে থাকতে হয়। একটা নাম নিয়ে যা আমার নয়, একটা পরিচয় নিয়ে যা আমার নয়।
কারণ আসল আমার কোনো নাম নেই। আসল আমি ভাষার বাইরে। শব্দের বাইরে। নামের বাইরে।
আমি শুধু… আমি।
একটু ভাবনা রেখে যান