রবিবার সন্ধ্যা ৬টা। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর আবার সেই সোমবার। “সোমবার আবার।” এই কথাটা মনে আসতেই একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায়। যেন আমি একটা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত আর কাল আবার জেলখানায় ফিরে যেতে হবে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় যে উল্লাসে ছুটি শুরু হয়েছিল, রবিবার সন্ধ্যায় সেই উল্লাস পরিণত হয় বিষণ্ণতায়। মনে হয় যেন দুই দিনের ছুটি ছিল মাত্র দুই ঘণ্টার মতো।
এই সপ্তাহান্তে কী করেছি? শনিবার সকালে দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছি। একটু বাজারসদাই করেছি। দুপুরে ঘুমিয়েছি। সন্ধ্যায় টিভি দেখেছি। রবিবারেও প্রায় একই রুটিন। তাহলে এই ছুটির দিনগুলো এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল কেন?
হ্যাপি বলে, “তুমি সপ্তাহান্তে কিছুই করো না। তাই বোরিং লাগে।” কিন্তু সমস্যা হল, কিছু না করার জন্যই তো সপ্তাহান্তের অপেক্ষা করি। সারা সপ্তাহ কাজের পর একটু নিশ্চিন্তে থাকতে চাই।
আরাশ বলল, “আব্বু, আপনি সোমবারের জন্য এত চিন্তা করেন কেন? এতো খারাপ কিছু তো হয় না।” তার এই নিষ্পাপ প্রশ্নে আমি নিরুত্তর। সত্যিই তো, সোমবার মানেই কোনো ভয়ানক দিন নয়।
কিন্তু তবুও এই অনুভূতি কেন? কেন মনে হয় যেন আবার সেই একই চক্রে ফিরে যেতে হবে? সোমবার থেকে শুক্রবার – একই রুটিন, একই কাজ, একই মানুষ।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমি কাজকে এত বোঝা মনে করি? কেন সোমবার মনে হয় শত্রুর মতো?”
হয়তো সমস্যা আমার মানসিকতায়। আমি কাজকে দেখি একটা বাধ্যবাধকতা হিসেবে, আনন্দের কিছু হিসেবে নয়। ছুটির দিনকে দেখি মুক্তি হিসেবে, আর কর্মদিনকে দেখি কারাগার হিসেবে।
রবিবার রাতে যখন কালকের জন্য কাপড় রেডি করি, তখন মনে হয় যেন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। যখন অফিসের ব্যাগ গোছাই, তখন মনে হয় যেন নির্বাসনে যাওয়ার মালপত্র গুছাচ্ছি।
এই অনুভূতি কি আমার একার? নাকি সবার? অফিসের সহকর্মীদের দেখলে মনে হয় তারাও একই অনুভূতিতে ভোগে। সোমবার সকালে সবার মুখেই একটা ক্লান্তির ছাপ।
কিন্তু জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তো কাটে এই কর্মদিনগুলোতে। তাহলে এই সময়গুলোকে শত্রু মনে করে কী লাভ?
একবার চেষ্টা করেছিলাম সোমবারকে ভালোভাবে দেখতে। “নতুন সপ্তাহ, নতুন সম্ভাবনা।” কিন্তু এই পজিটিভ থিংকিং বেশিদিন টিকেনি।
হয়তো সমস্যা এই সাইকেলের মধ্যে। পাঁচদিন কাজ, দুদিন ছুটি। এই নিয়মিত ছন্দ আমাদের মনে একটা প্যাটার্ন তৈরি করে। সোমবার মানে ছুটি শেষ, কাজ শুরু।
রবিবার রাত ১০টায় ফোনে কালকের অ্যালার্ম সেট করি। এই কাজটা করতে গিয়েই মন খারাপ হয়ে যায়। যেন আমি নিজের হাতেই নিজের কারাদণ্ডের তারিখ নির্ধারণ করছি।
হ্যাপি ঘুমিয়ে পড়েছে। আরাশও। তারা দুজনেই কালকের জন্য চিন্তিত নয়। হ্যাপি বাড়িতে থাকে, তার রুটিন প্রতিদিন একই। আরাশের স্কুল, সেটা তার কাছে আনন্দের।
আমি একা জেগে থাকি এই সোমবারের চিন্তা নিয়ে। মনে হয় যেন আমি একটা গভীর দর্শনের সমস্যায় পড়েছি। কাজ ও আরামের মধ্যে ভারসাম্য।
আগামীকাল সকালে আবার সেই একই অ্যালার্ম, একই তাড়াহুড়ো, একই অফিস। কিন্তু একটা সান্ত্বনা আছে – আগামী শুক্রবার আবার আসবে। আবার সপ্তাহান্ত।
এভাবেই হয়তো জীবনটা কেটে যাবে। সোমবারের জন্য আক্ষেপ, শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা। কিন্তু এর মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে জীবনের আসল অর্থ।
একটু ভাবনা রেখে যান