গতকাল রাতে বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। সবাই ঘুমিয়ে গেছে। শুধু আমি আর আমার প্রতিবিম্ব।
“আমি তোমাকে যেমন আছ তেমনি গ্রহণ করি।”
শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হলো না। জিহ্বা আটকে গেল। কণ্ঠনালী শুকিয়ে গেল।
আয়নার লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে কী? ঘৃণা? নাকি ভয়?
আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম।
আরাশ সকালে দুধ ছড়িয়ে ফেলেছিল। টেবিলে, মেঝেতে, তার জামায়।
“কিছু হয়নি বাবা,” আমি বললাম। “ভুল হয়। মুছে ফেলি।”
আরাশ কাঁদছিল। “আমি খারাপ?”
“না। তুমি ভালো ছেলে। ভুল সবার হয়।”
আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
কিন্তু গত সপ্তাহে অফিসে প্রেজেন্টেশনে আমি একটা স্লাইড ভুল দেখিয়েছিলাম। বসদের সামনে।
সেই রাতে বাসায় ফিরে আমি ঘুমাইনি। শুধু নিজেকে বলেছি, “কেমন বোকা তুই? কেমন অযোগ্য?”
সারারাত বিছানায় করাত হয়েছি। ভোর পাঁচটায় ঘুম এসেছিল।
আরাশের ভুল। আমার ভুল। একই জিনিস। কিন্তু আমি আরাশকে বলি “কিছু হয়নি।” নিজেকে বলি “তুই অযোগ্য।”
হ্যাপি রান্নাঘরে ছিল। আমি ঢুকলাম।
“তুমি কি রাগ আছ?” সে জিজ্ঞেস করল।
“না।”
“তাহলে এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?”
“কীভাবে?”
“এমনভাবে যেন আমি কিছু ভুল করেছি।”
আমি মাথা নাড়লাম। “তুমি কিছু ভুল করনি।”
“তাহলে?”
“আমি নিজের দিকে তাকিয়ে ছিলাম হয়তো।”
হ্যাপি চামচ রেখে দিল। “মানে?”
“মানে… জানি না।”
গত মাসে আরাশকে বকেছিলাম। সে খেলায় মন দিচ্ছিল না। আমি চিৎকার করেছিলাম।
“কেন তুমি মন দিয়ে খেলছ না?”
আরাশ কেঁদে ফেলেছিল। “আমার মন নেই।”
“মন নেই মানে? এত টাকা দিয়ে খেলা শেখাচ্ছি, তুমি মন দিয়ে করবে না?”
আরাশ আর কিছু বলেনি। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
সেদিন রাতে আমি বালিশে মুখ গুঁজেছিলাম। “তুই একটা খারাপ বাবা। তুই তোর ছেলের ক্ষতি করছিস।”
পরদিন সকালে জামিউর ফোন করেছিল। বলেছিল তার ছেলেও এমন। সব বাবার এমন হয়।
“স্বাভাবিক,” সে বলেছিল। “চিন্তা করিস না।”
কিন্তু আমি চিন্তা করেছি। সারাদিন চিন্তা করেছি। সারারাত চিন্তা করেছি।
অন্য বাবারা যখন রেগে যায়, তখন “স্বাভাবিক।” আমি যখন রাগি, তখন “অপরাধ।”
ফজরের নামাজে দাঁড়িয়েছিলাম। “আল্লাহুম্মা ইন্নি…”
কিন্তু মনে এল আজকের অফিসের কাজ। মিটিং। ডেডলাইন। প্রেজেন্টেশন।
সিজদায় গেলাম। “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা।”
কিন্তু মনে এল বাজারের তালিকা। দুধ কিনতে হবে। আরাশের জুতা কিনতে হবে।
নামাজ শেষ করলাম। বসে রইলাম।
“তুই কী ধরনের মুসলমান? আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েও মনোযোগ নেই?”
কিন্তু গত সপ্তাহে জামিউর বলেছিল তারও নামাজে মন উড়ে যায়।
“সবার হয়,” আমি বলেছিলাম। “আল্লাহ তো জানেন। তিনি ক্ষমাশীল।”
জামিউরের জন্য “আল্লাহ ক্ষমাশীল।” নিজের জন্য “তুই অযোগ্য।”
অফিসে সাইফুল এসেছিল।
“তুই ঠিক আছিস?” সে জিজ্ঞেস করল।
“আছি।”
“কিন্তু তোকে দেখে মনে হয় না।”
“কেমন দেখায়?”
“এমন যেন তুই নিজের সাথে যুদ্ধ করছিস।”
আমি হাসলাম। “তুই অনেক বেশি বুঝিস।”
“না। আমি দেখছি। তুই সবসময় নিজের সাথে কঠোর। অন্যদের সাথে নরম। নিজের সাথে নির্দয়।”
আমি জানালার দিকে তাকালাম। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
“আমাকে কঠোর হতে হয়,” আমি বললাম।
“কেন?”
“নাহলে আমি খারাপ হয়ে যাব।”
সাইফুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুই কি মনে করিস তুই খারাপ?”
“জানি না। হয়তো।”
“তাহলে নিজেকে শাস্তি দিলেই কি ভালো হয়ে যাবিস?”
আমার কাছে উত্তর ছিল না।
রাতে হ্যাপির সাথে ঝগড়া হয়েছিল। কোনো ছোট বিষয় নিয়ে। আমি মনে করতে পারছি না কী নিয়ে।
আমি রেগে গিয়েছিলাম। চিৎকার করেছিলাম।
হ্যাপি কেঁদেছিল। “তুমি সবসময় এমন কেন?”
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। অন্ধকার। শুধু রাস্তার আলো।
“তুই একটা খারাপ স্বামী। তুই তোর স্ত্রীকে কষ্ট দিচ্ছিস।”
কিন্তু গত সপ্তাহে হ্যাপি আমার সাথে রেগে গিয়েছিল। সেদিন আমি বলেছিলাম, “তোমার মন খারাপ ছিল। আমি বুঝতে পারছি।”
হ্যাপির রাগ। আমার রাগ। একই জিনিস। কিন্তু হ্যাপির জন্য “মন খারাপ ছিল।” আমার জন্য “তুই খারাপ স্বামী।”
আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি নিজেকে ভালোবাসো?”
আমি থমকে গেলাম। “কী?”
“তুমি কি নিজেকে ভালোবাসো? যেমন তুমি আমাকে ভালোবাসো?”
আমি তার দিকে তাকালাম। তার চোখে কৌতূহল।
“কেন এই প্রশ্ন?”
“মাসিমা বলেছিল নিজেকে ভালোবাসতে হয়। তুমি নিজেকে ভালোবাসো?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর বললাম, “জানি না বাবা।”
“জানো না মানে?”
“মানে… আমি নিজেকে যেভাবে দেখি, সেভাবে ভালোবাসা কঠিন।”
“কেন?”
“কারণ আমি আমার সব ভুল দেখি। সব খারাপ জিনিস দেখি।”
আরাশ মাথা নাড়ল। “তাহলে তুমি আমাকে কেন ভালোবাসো? আমিও তো ভুল করি।”
আমার চোখ ভিজে এল। “তোমার ভুল আলাদা।”
“কেন আলাদা?”
“কারণ… কারণ তুমি শিশু। তোমার ভুল স্বাভাবিক।”
“আর তুমি বড় মানুষ তাই তোমার ভুল খারাপ?”
আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। কিছু বললাম না।
সেই রাতে আবার আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
আয়নার লোকটাকে দেখলাম। চোখের নিচে কালো দাগ। মুখে ক্লান্তির ছাপ। চুলে কিছু সাদা।
“তুই কে?”
আয়না কোনো উত্তর দিল না।
“তুই কেন নিজেকে এত ঘৃণা করিস?”
আয়নার লোকটা চুপ করে আছে।
“তুই যদি তোর সন্তানের মতো নিজেকে দেখতিস? তুই যদি তোর বন্ধুর মতো নিজের সাথে কথা বলতিস?”
কিন্তু শব্দগুলো খালি মনে হলো। অর্থহীন।
আমি হাত বাড়ালাম। আয়না ছুঁলাম। ঠান্ডা।
পরদিন সকালে আরাশ দুধ আবার ছড়িয়ে ফেলল।
“কিছু হয়নি বাবা,” আমি বললাম। “ভুল হয়।”
আরাশ বলল, “তোমারও তো ভুল হয়।”
“হয়।”
“তাহলে তোমার ভুলও কি কিছু হয়নি?”
আমি তার দিকে তাকালাম। “কী বললি?”
“তোমার ভুল হলে কি তুমিও বলো কিছু হয়নি?”
আমি চুপ করে রইলাম।
“বাবা?”
“না বাবা। আমি বলি না।”
“কেন?”
“কারণ… জানি না কেন।”
আরাশ আমার হাত ধরল। “তুমি বলতে পারো বাবা। তোমার ভুলও কিছু হয়নি।”
আমি তার মাথায় হাত দিলাম। কিছু বললাম না। বলতে পারলাম না।
অফিসে ঢুকলাম। কম্পিউটার চালু করলাম।
সাইফুল এসে বলল, “শোন, তুই অনেক ভালো কাজ করছিস। তোর প্রজেক্ট দেখলাম। চমৎকার।”
“ধন্যবাদ।”
“কিন্তু তুই কি এটা নিজেকে বলিস?”
“কী?”
“যে তুই ভালো করছিস। তুই কি নিজেকে বলিস?”
আমি মাথা নাড়লাম। “না।”
“কেন না?”
“কারণ… কারণ আমি দেখি কোথায় ভুল হতে পারত। কী আরো ভালো হতে পারত।”
“কিন্তু ভালো যে করছিস সেটা?”
“সেটা… সেটা আমার চোখে পড়ে না।”
সাইফুল চেয়ার টেনে বসল। “তুই জানিস, তোর সমস্যা কী? তুই নিজের শত্রু।”
“জানি।”
“তাহলে কেন বদলাস না?”
“কীভাবে বদলাব?”
“তুই যেভাবে অন্যদের দেখিস, সেভাবে নিজেকে দেখা শুরু করতে পারিস।”
“এত সহজ?”
“না। সহজ না। কিন্তু শুরু তো করতে পারিস।”
রাতে নামাজ পড়লাম। এইবার মন অন্যদিকে গেল না। মন ছিল।
সিজদায় মাথা রাখলাম।
“আল্লাহ, আমি আমার সাথে শান্তি চাই।”
একটা অদ্ভুত কথা। কিন্তু সত্যি।
“আমি নিজেকে ক্ষমা করতে চাই। যেভাবে আমি অন্যদের ক্ষমা করি।”
কান্না এল। আস্তে আস্তে।
হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি ঠিক আছ?”
“জানি না। হয়তো ঠিক হওয়ার চেষ্টা করছি।”
“কীভাবে?”
“নিজের সাথে… নরম হওয়ার চেষ্টা করছি।”
হ্যাপি আমার হাত ধরল। “এটা ভালো।”
“কিন্তু কঠিন।”
“জানি। কিন্তু চেষ্টা করছ।”
গভীর রাতে আবার আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
আয়নার লোকটা তাকিয়ে আছে।
“আমি তোমাকে যেমন আছ তেমনি গ্রহণ করি।”
শব্দগুলো এইবারও আটকে গেল।
কিন্তু আমি চেষ্টা করলাম। আমি আস্তে বললাম, “আমি… চেষ্টা করছি।”
আয়নার লোকটার চোখে জল।
“আমি চেষ্টা করছি তোমাকে গ্রহণ করতে। তোমার ভুল নিয়ে। তোমার দুর্বলতা নিয়ে।”
আয়নার লোকটা কাঁদছে।
“আমি জানি না পারব কি না। কিন্তু আমি চেষ্টা করছি।”
আমি হাত বাড়ালাম। আয়না ছুঁলাম। এইবার এত ঠান্ডা লাগল না।
হয়তো একদিন আমি বলতে পারব। হয়তো না।
কিন্তু আজ আমি চেষ্টা করলাম।
হয়তো এটাই শুরু।
একটু ভাবনা রেখে যান