ব্লগ

অফিসের করিডোরে ঘুরতে ঘুরতে নিজেকে হারানো

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

টিফিনের সময়ে একা বসে ভাবছিলাম, এই অফিসের লম্বা করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে আমি কখন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। প্রতিদিন একই পথ, একই দেয়াল, একই টিউবলাইটের আলো। আর এই হাঁটতে হাঁটতে আমি আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেছি এই বিল্ডিংয়ের সাথে।

সকালে ঢুকি গেটে। দারোয়ান আমাকে চিনে, কিন্তু আমার নাম ভুলে যায়। বলে, “আসুন স্যার।” কোন স্যার? আমি কে? মনে হয় আমি একটা পরিচিত অপরিচিত।

লিফটে উঠি। অন্যদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকি। কেউ কারো সাথে কথা বলে না। সবাই চুপচাপ। আমিও চুপচাপ। যেন আমরা সবাই একসাথে কোথাও যাচ্ছি, কিন্তু কেউ জানে না কোথায়।

তৃতীয় তলায় নেমে করিডোর ধরে হাঁটি। এই করিডোরে আমি গত পাঁচ বছর ধরে হাঁটছি। কিন্তু আজ মনে হল এই পথ আমাকে চেনে, আমি এই পথকে চিনি না।

আমার টেবিলে বসি। চারপাশে আরও অনেক টেবিল। আরও অনেক মানুষ। সবাই কাজ করে। আমিও কাজ করি। কিন্তু এই কাজের মধ্যে আমি কোথায়?

দুপুরে খেতে যাই ক্যান্টিনে। সেই একই করিডোর দিয়ে। এবার উল্টো দিকে। কিন্তু দিক পাল্টালেও পথ একই। আর আমিও একই।

ক্যান্টিনে বসে খাই। একা। চারপাশে আরও মানুষ একা একা খাচ্ছে। আমরা একসাথে একা।

খাওয়ার পর আবার সেই করিডোর। আবার সেই টেবিল। আবার সেই কাজ। মনে হয় আমি একটা যন্ত্রের অংশ হয়ে গেছি।

বিকেলে একবার বাথরুম যাই। আবার সেই করিডোর। এবার দেখি একজন পরিষ্কারকর্মী মেঝে মুছছে। সে আমাকে দেখে একপাশে সরে দাঁড়ায়। আমিও কিছু না বলে এগিয়ে যাই। দুজনেই নীরব। দুজনেই অদৃশ্য।

আল্লাহর কাছে মনে মনে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, আমি কোথায়?” কিন্তু উত্তর আসে না। হয়তো এই করিডোরের আওয়াজ আমার প্রার্থনা গিলে ফেলে।

সন্ধ্যায় অফিস ছুটি। আবার সেই করিডোর। এবার বাড়ি যাওয়ার জন্য। কিন্তু মনে হয় আমি কখনো এই করিডোর থেকে বের হতে পারি না।

লিফটে নেমে গেট দিয়ে বের হই। দারোয়ান বলে, “যান স্যার।” আমি বের হয়ে যাই। কিন্তু আমার মনে হয় আমার একটা অংশ সেই করিডোরেই থেকে যায়।

বাড়ি গিয়ে হ্যাপিকে বলি, “আজ অফিসে কী করেছি মনে নেই।” হ্যাপি বলে, “ক্লান্ত লাগছে?” আমি বলি, “হ্যাঁ।” কিন্তু এটা ক্লান্তি না। এটা হারিয়ে যাওয়া।

আরাশ বলে, “আব্বু, আপনার অফিস কেমন?” আমি বলি, “ভালো।” কিন্তু আসলে আমি জানি না অফিস কেমন। আমি শুধু জানি সেই করিডোর।

রাতে ঘুমানোর আগে চোখ বন্ধ করলেও সেই করিডোর দেখি। সেই একই দেয়াল, সেই একই মেঝে। আমি যেন সেখানেই আটকে আছি।

স্বপ্নেও দেখি আমি সেই করিডোরে হাঁটছি। কিন্তু এখন করিডোর আরও লম্বা। শেষ নেই। আমি হাঁটছি, কিন্তু কোথাও পৌঁছাচ্ছি না।

সকালে ঘুম ভেঙে বুঝি, আমি আসলেই সেই করিডোরে আটকে আছি। শুধু স্বপ্নে না, বাস্তবেও।

আজ আবার যেতে হবে সেই অফিসে। আবার হাঁটতে হবে সেই করিডোরে। আর আরেকটু হারিয়ে যেতে হবে।

একদিন হয়তো পুরোপুরি হারিয়ে যাব। তখন শুধু থাকবে সেই করিডোরে হাঁটা একটা ছায়া।

আর সেই ছায়াও হয়তো একদিন মিলিয়ে যাবে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *