গতকাল স্কুলে গিয়েছিলাম। অভিভাবক সভা।
একজন বললেন, “আমার ছেলে পিয়ানো বাজায়। আর ইংরেজি বলে।”
আরেকজন বললেন, “আমার মেয়ে ছবি আঁকে। নাচও শেখে।”
আমি কিছু বলিনি। চা খেয়েছি। ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
বাড়ি ফিরে আরাশকে বললাম, “তোকে পিয়ানো শেখাতে হবে।”
আরাশ বলল, “কেন?”
“সবাই শেখে।”
“আমার তো ভাল লাগে না।”
আমি কিছু বলতে পারলাম না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। কারা যেন হাঁটছে। চেনা লাগল না।
রাতে ঘুম আসেনি। পাশে হ্যাপি ঘুমাচ্ছিল। নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। আমার নিঃশ্বাস আলাদা মনে হল।
উঠে বাথরুমে গেলাম। আয়নায় তাকালাম। চোখদুটো অচেনা। কে এই লোক?
মনে পড়ল ক্লাস নাইনের কথা। সবাই জিনস পরত। আমি ম্যাম বাবাকে বলেছিলাম জিনস কিনে দিতে।
মা বলেছিলেন, “তোর তো প্যান্ট আছে।”
আমি বলেছিলাম, “সবার জিনস আছে।”
মা আর কিছু বলেননি। জিনস কিনে দিয়েছিলেন।
কলেজে সবাই ইংরেজি বই পড়ত। আমিও পড়তাম। বুঝতাম না। কিন্তু সবার সামনে বই খুলে রাখতাম।
একদিন সাইফুল বলল, “তুই এসব পড় কেন?”
আমি বললাম, “ভালো লাগে।”
সাইফুল হাসল। আমি বুঝলাম সে জানে।
চাকরিতে দেখি সবাই একভাবে কথা বলে। হাসে। মাথা নাড়ে। আমিও নাড়াই।
একবার মিটিং-এ বসে ছিলাম। বস বলছিলেন কী একটা। সবাই মাথা নাড়ছিল। আমিও নাড়ছিলাম।
হঠাৎ খেয়াল হল—আমি কি একমত? জানি না।
গত বছর বন্ধুরা মিলে কক্সবাজার গেলাম। সবাই ছবি তুলছিল। একই জায়গায়। একই পোজ।
আমিও দাঁড়ালাম। ছবি তুললাম।
কিন্তু আমার অন্য একটা জায়গায় ছবি তুলতে ইচ্ছে করছিল। একটা ভাঙা নৌকা ছিল। কেউ দেখছিল না।
আমি গেলাম না। ভাবলাম বন্ধুরা কী ভাববে।
রাতে হোটেলে শুয়ে ছিলাম। জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্ছিল। নাকি দেখা যাচ্ছিল না? অন্ধকার ছিল।
বাবু বলল, “কী ভাবছিস?”
আমি বললাম, “কিছু না।”
“কিছু তো ভাবছিস।”
আমি বললাম, “সবাই কি একই জিনিস দেখে?”
বাবু চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ঘুমা।”
আজ সকালে অফিসে বস বললেন, “এই প্রোজেক্ট নিয়ে তোমার মতামত কী?”
আমি বললাম, “যেটা ঠিক মনে হয় সেটা করা উচিত।”
বস বললেন, “তোমার কাছে কোনটা ঠিক মনে হয়?”
আমি চুপ করে রইলাম। জানি না। আসলে জানি না।
দুপুরে হ্যাপি ফোন করল। বলল, “আজ কী খাবে?”
আমি বললাম, “যা সবাই খায়।”
হ্যাপি বলল, “তুমি কখনো তোমার পছন্দের কথা বল না।”
আমি বললাম, “আমার পছন্দ তো তুমিই জান।”
হ্যাপি বলল, “আমি জানি না। তুমি কখনো বল না।”
ফোন রেখে দিল।
আমি জানালা দিয়ে তাকালাম। মানুষ হাঁটছে। সবাই একইভাবে হাঁটছে মনে হল। নাকি আমার মনে হচ্ছে?
বিকেলে বাড়ি ফিরলাম। আরাশ খেলছিল।
আরাশ বলল, “বাবা, তুমি কখন ছোট ছিলে?”
আমি বললাম, “অনেক আগে।”
“তখন তুমি কেমন ছিলে?”
আমি বললাম, “জানি না। মনে নেই।”
আরাশ বলল, “আমার মনে আছে। তুমি অন্যরকম গল্প বলতে। এখন বল না।”
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
আরাশ বলল, “বাবা, তুমি আমার মতো হতে চাও?”
আমি বললাম, “কী বলছিস?”
“তুমি আমাকে পিয়ানো শেখাতে চাও। কিন্তু তুমি নিজে পিয়ানো বাজাও?”
আমি বললাম, “না।”
“তাহলে?”
আমি বললাম, “অন্যদের…”
আরাশ বলল, “তুমি অন্যদের মতো না, বাবা। তুমি আলাদা। কিন্তু লুকাও কেন?”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কীভাবে জানিস?”
আরাশ বলল, “দেখি তো। তুমি ভাব একরকম। কিন্তু চোখে দেখি অন্যরকম।”
রাতে আবার বাথরুমে গেলাম। আয়নায় তাকালাম। এবার একটু চেনা লাগল।
হয়তো লাগেনি।
বিছানায় শুয়ে ভাবলাম ছোটবেলার কথা। আমি অন্যরকম গল্প বলতাম। মা শুনতেন। হাসতেন।
একবার স্কুলে একটা গল্প বলেছিলাম। কেউ হাসেনি। সবাই অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে ছিল।
তারপর আর অন্যরকম গল্প বলিনি। সবার মতো গল্প বলতে শুরু করেছি।
কবে থেকে?
হ্যাপি নড়ল। বলল, “ঘুমাওনি এখনো?”
আমি বললাম, “তুমি আমাকে কেমন দেখ?”
হ্যাপি বলল, “কী?”
“আমি কেমন মানুষ?”
হ্যাপি উঠে বসল। আমার দিকে তাকাল। অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছিল না।
বলল, “তুমি ভালো মানুষ।”
আমি বললাম, “আমি জানতে চাই আমি কে।”
হ্যাপি বলল, “জান না?”
আমি বললাম, “না।”
হ্যাপি শুয়ে পড়ল। বলল, “আমিও জানি না আমি কে।”
আমি অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “সত্যি?”
হ্যাপি বলল, “হুম। কখনো চিন্তাও করিনি। এখন করছি।”
আমরা দুজনে চুপ করে রইলাম।
আজ সকালে আরাশকে ডেকে বললাম, “তুই যেটা ভালো লাগে সেটা করবি।”
আরাশ বলল, “পিয়ানো শিখব না?”
আমি বললাম, “না।”
আরাশ খুশি হল। বলল, “তুমিও বাবা। তোমার যা ভালো লাগে করো।”
আমি বললাম, “আমার কিছু ভালো লাগে কিনা জানি না।”
আরাশ বলল, “খুঁজবে না?”
আমি বললাম, “হয়তো।”
বিকেলে অফিস থেকে ফিরছিলাম। একটা পুরনো বইয়ের দোকান দেখলাম। আগে দেখিনি। নাকি দেখেছি?
ভিতরে ঢুকলাম। বই দেখছিলাম। একটা বই হাতে নিলাম। কবিতার বই।
মনে পড়ল ক্লাস এইটে কবিতা লিখতাম। কাউকে দেখাইনি। খাতায় লিখে রাখতাম।
একদিন বাবু দেখে ফেলেছিল। বলেছিল, “কী এসব?”
আমি বলেছিলাম, “কিছু না।”
তারপর খাতাটা ছিঁড়ে ফেলেছিলাম।
দোকানদার বললেন, “নেবেন?”
আমি বললাম, “না।”
বাইরে এলাম। রাস্তায় মানুষ হাঁটছে। আমিও হাঁটছি।
হঠাৎ দেখলাম একজন থেমে দাঁড়িয়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
আমিও থেমে দাঁড়ালাম। আকাশের দিকে তাকালাম। মেঘ।
লোকটা হাঁটতে শুরু করল। আমিও হাঁটলাম।
বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
আরাশ এসে বলল, “কী দেখছ?”
আমি বললাম, “জানি না।”
আরাশ বলল, “নিজেকে?”
আমি বললাম, “হয়তো।”
আরাশ আয়নার সামনে দাঁড়াল। বলল, “আমি আমাকে চিনি।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কীভাবে?”
আরাশ বলল, “জানি না। চিনি আর কী।”
আরাশ চলে গেল। আমি তাকিয়ে রইলাম আয়নায়।
চোখের ভিতরে আরেকজন দেখা যাচ্ছে। নাকি আমিই দেখছি?
হ্যাপি ডাকল, “খাবে?”
আমি বললাম, “আসছি।”
কিন্তু দাঁড়িয়ে রইলাম। আয়নার লোকটাও দাঁড়িয়ে আছে।
কে তুমি?
একটু ভাবনা রেখে যান