রাত একটার দিকে ফোনটা বেজে উঠল। হ্যাপি আর আরাশ দুজনেই গভীর ঘুমে। আমি উঠে ফোন ধরলাম।
“হ্যালো?”
অপর পাশ থেকে একটা কণ্ঠস্বর এলো। “হ্যালো?”
আমি আবার বললাম, “কে বলছেন?”
উত্তর এলো, “কে বলছেন?”
একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। কণ্ঠটা যেন আমার নিজের। কিন্তু তা কি সম্ভব?
আমি বললাম, “আপনি কে?”
অপর প্রান্ত থেকে একই প্রশ্ন ফিরে এলো, “আপনি কে?”
এবার নিশ্চিত হলাম। ওটা আমার নিজের কণ্ঠস্বর।
হৃদযন্ত্র দ্রুত কাজ করতে লাগল। কোনো প্র্যাংক কল? নাকি কেউ আমার কণ্ঠ নকল করছে? কিন্তু এত নিখুঁত নকল কীভাবে সম্ভব?
আমি বললাম, “আমি হায়দার।”
উত্তর এলো, “আমি হায়দার।”
শরীরে কাঁপুনি শুরু হলো। এ কি আমি নিজের সাথে কথা বলছি?
“আপনি কোথা থেকে ফোন করছেন?” জিজ্ঞেস করলাম।
“আপনি কোথা থেকে ফোন করছেন?” একই প্রশ্ন ফিরে এলো।
আমি ফোনটা কান থেকে সরিয়ে দেখলাম। নম্বরটা আমার নিজের। আমি নিজেকেই ফোন করেছি?
কিন্তু আমি তো কোনো নম্বর ডায়াল করিনি। ফোন এমনিই বেজেছিল।
“আপনি কি আমি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“আপনি কি আমি?” উত্তর এলো।
এবার ভেঙে পড়লাম। চেয়ারে বসে পড়লাম। এ কি হচ্ছে আমার সাথে?
অপর প্রান্তের আমি বলল, “ভয় পাবেন না।”
কিন্তু আমি তো এই কথা বলিনি। তাহলে ও আমি নই?
“আপনি কে তাহলে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“আমি সেই হায়দার যে কথা বলতে পারে।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল। “মানে?”
“আমি সেই আপনি যে সব সময় বলতে চেয়েছেন কিন্তু বলতে পারেননি। যে কথাগুলো আপনার গলায় আটকে থাকে, সেগুলো আমি বলি।”
আমি অবাক হয়ে শুনতে লাগলাম।
“আপনি হ্যাপিকে বলতে চান যে তাকে কত ভালোবাসেন। কিন্তু বলেন, ‘ভাতটা ভালো হয়েছে।'”
“আপনি আরাশকে বলতে চান যে তার জন্য আপনার স্বপ্নগুলো কী। কিন্তু বলেন, ‘পড়া করেছ?'”
“আপনি সাহেবকে বলতে চান যে আপনার কত কষ্ট। কিন্তু বলেন, ‘জি স্যার।'”
প্রতিটি কথা আমার হৃদয়ে গেঁথে যাচ্ছিল।
“আপনি নিজেকে বলতে চান যে আপনি একা নন। কিন্তু বলেন কিছুই না।”
আমার চোখে পানি এসে গেল।
“আমি সেই হায়দার যে আপনার ভেতরে লুকিয়ে আছে। যে সত্যিকারের কথা বলতে জানে।”
“তাহলে… তাহলে আমি কে?” আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম।
“আপনি সেই হায়দার যে ভয় পায়। যে মনে করে সত্যি কথা বললে মানুষ চলে যাবে। যে ভাবে যোগাযোগ মানে লেনদেন।”
“কিন্তু আমি তো যোগাযোগ করতে চাই…”
“চান। কিন্তু সাহস পান না। তাই আমাকে পাঠান। আমি আপনার হয়ে কথা বলি।”
হঠাৎ বুঝতে পারলাম। এতদিন যে কণ্ঠস্বর আমার ভেতরে কথা বলত, যে আমাকে বলত সত্যিকারের কথা বলতে, সেই আমিই ফোনের অপর প্রান্তে।
“আপনি কি সব সময় আমার সাথে থাকেন?” জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ। কিন্তু আপনি আমার কথা শোনেন না।”
“এখন শুনছি।”
“তাহলে আগামীকাল থেকে আমার কথা বলুন।”
“কিন্তু সাহস পাবো কীভাবে?”
“আমি তো আপনার সাথেই আছি। আমাকে বিশ্বাস করুন।”
ফোন কেটে গেল।
আমি বসে রইলাম। এই কি আমার সাথে সত্যিই ঘটেছে? নাকি আমি স্বপ্ন দেখছি?
কিন্তু একটা ব্যাপার নিশ্চিত। আমার ভেতরে সত্যিই একটা কণ্ঠস্বর আছে। যেটা সত্যিকারের কথা বলতে জানে।
আজ থেকে সেই কণ্ঠের কথা শুনব।
একটু ভাবনা রেখে যান