ব্লগ

কথা বলতে গিয়ে নিজের কণ্ঠস্বর চিনতে না পারা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ফোন করতে গিয়ে হ্যালো বলার সময় হঠাৎ থমকে গেলাম। এই যে কণ্ঠস্বর শুনলাম, এটা কি আমার? এত অচেনা লাগছে কেন? যেন কোনো অপরিচিত মানুষ আমার মুখ দিয়ে কথা বলছে। গলার স্বরে এমন একটা ক্লান্তি, এমন একটা হতাশা শুনতে পেলাম যা আমি আগে কখনো লক্ষ্য করিনি।

আমি ফোন রেখে দিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে বসে রইলাম। এই কণ্ঠস্বর কি সত্যিই আমার? নাকি আমি অন্য কারো গলা ধার নিয়েছি? আমার নিজের স্বর কেমন ছিল মনেই নেই।

হ্যাপির সাথে কথা বলার সময়ও এই সমস্যা। “খাবার দাও” বলতে গিয়ে মনে হয় অন্য কেউ বলছে। যেন আমার মুখে অন্য কারো ভূত ভর করেছে। আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, “এই গলা কার?”

আরাশকে ডাকার সময় “এসো” বলি, কিন্তু সেই “এসো” শব্দটা যেন আমার মুখ থেকে বের হয়নি। অন্য কোনো বাবার মুখ থেকে। অন্য কোনো ক্লান্ত, হতাশ বাবার।

অফিসে কলিগদের সাথে কথা বলার সময় নিজের কণ্ঠস্বর শুনে অবাক হই। এত দুর্বল, এত অনিশ্চিত। কণ্ঠে এমন একটা কম্পন যা আগে ছিল না। এমন একটা ভাঙা স্বর যা আমার বলে মনে হয় না।

আমি কি এমন ছিলাম? আমার গলার স্বর কি এত দুর্বল ছিল? নাকি বছরের পর বছর পরাজয়ের ভার আমার কণ্ঠস্বরকেও পরিবর্তন করে দিয়েছে?

আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময়ও সেই একই সমস্যা। “হে আল্লাহ” বলতে গিয়ে মনে হয় অন্য কেউ প্রার্থনা করছে। আমার গলার স্বরে এমন একটা অসহায়তা যা আমি স্বীকার করতে চাই না।

আমার স্মৃতিতে আমার গলার স্বর অন্যরকম ছিল। আরও শক্তিশালী। আরও আত্মবিশ্বাসী। সেই স্বর কোথায় গেল?

রেকর্ড করা কোনো কথা শুনলে আরও সমস্যা। নিজের গলা শুনে চিনতেই পারি না। “এটা কি আমার গলা?” মনে হয় সম্পূর্ণ অপরিচিত কেউ কথা বলছে।

কখন থেকে আমার কণ্ঠস্বর আমার অচেনা হয়ে গেল? কখন থেকে আমি নিজের গলা হারিয়ে ফেলেছি? হয়তো সেদিন থেকে যেদিন প্রথম চাকরি হারিয়েছিলাম। সেদিন থেকে আমার কণ্ঠে একটা ভাঙন এসেছে।

অথবা যেদিন বুঝেছিলাম আমি আমার পরিবারকে সুখী করতে পারছি না। সেদিন থেকে আমার গলার স্বরে একটা অপরাধবোধ মিশেছে।

অথবা যেদিন থেকে বুঝেছি আমার স্বপ্নগুলো কখনো বাস্তব হবে না। সেদিন থেকে আমার কণ্ঠে একটা হতাশা বসে গেছে।

হ্যাপি মাঝে মাঝে বলে, “তুমি এত ছোট গলায় কথা বলো কেন?” আমি বলি, “কবে থেকে?” কিন্তু সত্যি তো। আমার গলার স্বর কখন এত ছোট হয়ে গেল?

আরাশ বলে, “আব্বু, আপনার গলা কেন এত ভারী লাগে?” আমি জানি না কেন। হয়তো সব দুঃখ, সব চিন্তা গলায় জমে গেছে।

আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জোরে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু সেই আওয়াজও অচেনা লাগে। যেন আমি অভিনয় করছি।

রাতে ঘুমানোর আগে নিজে নিজে কথা বলে দেখি। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরও অচেনা লাগে। যেন আমি নিজের সাথে কথা বলছি না, অন্য কারো সাথে।

কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলা মানে কি নিজেকে হারিয়ে ফেলা? কণ্ঠস্বর তো একজন মানুষের সবচেয়ে ব্যক্তিগত পরিচয়। সেটাই যদি অচেনা হয়ে যায়?

আমার কণ্ঠস্বরে এখন যে দুর্বলতা, যে অনিশ্চয়তা, সেটা কি আমার চরিত্রেরও অংশ হয়ে গেছে? নাকি চরিত্রের পরিবর্তনই কণ্ঠস্বর বদলে দিয়েছে?

মাঝে মাঝে চেষ্টা করি আগের মতো শক্তিশালী গলায় কথা বলতে। কিন্তু পারি না। যেন আমার কণ্ঠনালী ভুলে গেছে কীভাবে জোরে কথা বলতে হয়।

আমার ভয় হয় একদিন হয়তো একেবারে কথাই বলতে পারব না। কণ্ঠস্বর চলে যাবে। তখন আমি সম্পূর্ণভাবে নিঃশব্দ হয়ে যাব।

আর এই নিঃশব্দতার মধ্যেই হয়তো আমার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে আছে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *