ব্লগ

নিজের মৃত্যুর খবর পড়ে বেঁচে থাকার সন্দেহ

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

খবরের কাগজের দ্বিতীয় পাতায় একটা ছোট খবর দেখে হৃদপিন্ড থেমে যাওয়ার উপক্রম হলো। “সড়ক দুর্ঘটনায় হায়দার নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু।” আমার নাম। আমার পিতার নাম। আমার ঠিকানা। সবকিছু হুবহু মিলে যাচ্ছে। কিন্তু আমি তো এখানে বসে এই খবর পড়ছি। আমার হাত কাঁপছে। কাগজটা মেঝেতে পড়ে গেল।

প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো ভুল হয়েছে। একই নামের অন্য কেউ হবে। কিন্তু বিবরণ আবার পড়ে দেখি প্রতিটি তথ্য মিলে যাচ্ছে। বয়স ৩৯। পেশা সরকারি কর্মচারী। পিতার নাম আব্দুর রহমান। স্ত্রী ও এক পুত্র রেখে গেছেন। এটা তো সম্পূর্ণভাবে আমারই বিবরণ।

এমনকি দুর্ঘটনার স্থানটাও আমার চেনা। যে রাস্তা দিয়ে আমি প্রতিদিন অফিসে যাই। সেই একই জায়গায় নাকি আমার মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায়। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যায় আমি তো বাড়িতে ছিলাম। হ্যাপির সাথে চা খেয়েছি। আরাশের পড়া দেখেছি।

আমি নিজের শরীরে হাত দিয়ে দেখলাম। স্পর্শ অনুভব করছি। নিঃশ্বাস নিচ্ছি। হৃদপিন্ড দুমদাম করে চলছে। আমার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। কোনো ব্যথা নেই। তাহলে এই খবরটা কীভাবে সম্ভব?

হ্যাপিকে উত্তেজিত কণ্ঠে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি মরে গেছি?” সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে অবাক হয়ে বলল, “কী বলছ তুমি? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?” আমি কাঁপতে কাঁপতে খবরের কাগজ দেখালাম। সে মনোযোগ দিয়ে পড়ল। তারপর বলল, “এটা তো ভুল খবর হবে। তুমি যে এখানে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ।”

কিন্তু আমার সন্দেহ যায় না। আমার মনে একটা ভয়ানক প্রশ্ন জেগেছে – আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি? নাকি মরে গিয়েছি কিন্তু এখনো বুঝতে পারিনি? মৃত্যুর পর কি মানুষ এভাবে বেঁচে থাকার ভ্রম পায়?

আমি আয়নার সামনে দৌড়ে গিয়ে নিজেকে দেখলাম। প্রতিবিম্ব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। চোখ, নাক, মুখ সব ঠিক আছে। তাহলে আমি ভূত নই। ভূতের তো আয়নায় প্রতিবিম্ব হয় না।

আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কি আমাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিস?” ও পড়া ছেড়ে উঠে এসে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “হ্যাঁ আব্বু। আপনার কী হয়েছে? আপনাকে খুব চিন্তিত লাগছে।” আমি ওর কাঁধে হাত রাখলাম। ও আমার স্পর্শ অনুভব করছে। আমিও ওর উষ্ণতা অনুভব করছি।

কিন্তু তবুও মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি। একটা অনিশ্চয়তা। আমি কি সত্যিই এখানে আছি? নাকি এসবই কোনো মরণোত্তর ভ্রম?

অফিসে গিয়ে সহকর্মীদের প্রতিক্রিয় দেখার চেষ্টা করলাম। করিম ভাই আমাকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই সালাম দিলেন। “কেমন আছেন হায়দার ভাই?” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কেমন লাগছি?” তিনি একটু অবাক হয়ে বললেন, “ভালো তো। একটু ফ্যাকাশে মনে হচ্ছে। রাতে ভালো ঘুম হয়নি নাকি?”

আমি বসের কেবিনে গেলাম। তিনিও আমাকে দেখে স্বাভাবিক ব্যবহার করলেন। কাজের কথা বললেন। কিন্তু আমার মনে হতে থাকল এরা সবাই কি আমার মৃত্যুর কথা জানে না? নাকি আমার সাথে ভদ্রতা করছে?

দুপুরে ক্যান্টিনে গিয়ে খাবার অর্ডার করলাম। খাবার মুখে দিয়ে স্বাদ পেলাম। গিলতে পারলাম। মৃত মানুষ কি খেতে পারে? আমার না জানা কোনো নিয়ম আছে নাকি?

আমি মোবাইল থেকে গুগলে সার্চ করলাম “মৃত্যুর পর কি মানুষ বেঁচে থাকার ভ্রম পায়।” অনেক আর্টিকেল এলো। কিছুতে লেখা আছে “আফটার লাইফ এক্সপেরিয়েন্স” এর কথা। কিছুতে লেখা আছে “নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স” এর কথা।

আমার মনে পড়ল একবার হার্ট অ্যাটাক হওয়া রোগীর কথা শুনেছিলাম। তিনি বলেছিলেন মৃত্যুর পর তিনি নিজেকে উপর থেকে দেখেছেন। দেখেছেন ডাক্তাররা তার বুকে চাপ দিচ্ছে। তারপর তিনি আবার ফিরে এসেছেন।

আমার কি সেরকম কিছু হয়েছে? আমি কি সত্যিই মরে গিয়ে আবার ফিরে এসেছি? নাকি এখনো সেই মৃত্যু-জগতেই আছি?

আল্লাহর কাছে দীর্ঘ প্রার্থনা করলাম। “হে আল্লাহ, আমি কোথায় আছি? আমি কি জীবিত নাকি মৃত? এই বিভ্রান্তি থেকে আমাকে মুক্তি দাও। আমাকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দাও আমার অবস্থা কী।” কিন্তু স্পষ্ট কোনো ইশারা পেলাম না।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আবার সেই খবরের কাগজ দেখলাম। প্রতিটি শব্দ আবার পড়লাম। আমার নাম, আমার পিতার নাম, আমার বয়স – সবকিছু হুবহু। এমনকি যে হাসপাতালে নাকি আমার মৃতদেহ নেওয়া হয়েছে, সেই হাসপাতালের নামও চিনি।

আমি সেই হাসপাতালে ফোন করলাম। রিসেপশনিস্ট বলল, “হ্যাঁ, গতকাল একটা দুর্ঘটনার ভিকটিম এনেছিল। হায়দার নামে।” আমার রক্ত হিমিয়ে গেল। “তার কি হয়েছে?” জিজ্ঞেস করলাম। “মারা গেছে। পোস্টমর্টেমের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

আমি ফোন রেখে দিলাম। আমার হাত-পা কাঁপছে। তাহলে সত্যিই কোনো হায়দার মারা গেছে। যার পরিচয় আমার সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে।

হ্যাপিকে বললাম, “চল, আমরা ওই হাসপাতালে যাই।” সে বলল, “কেন?” আমি বললাম, “দেখতে হবে।”

হাসপাতালে গিয়ে মর্গে জানতে চাইলাম। কিন্তু লাশ তো পরিবার নিয়ে গেছে। আমি মর্গের কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করলাম, “যে মানুষটা মারা গেছে, তাকে কেমন দেখতে ছিল?” সে বলল, “আপনার মতোই। প্রায় একই রকম।”

আমার মাথা ঘুরছে। আমার মতোই দেখতে একজন মানুষ মারা গেছে। তার নাম আমার মতো। তার পরিবার আমার মতো। তাহলে আমি কে?

বাড়ি ফিরে আমি আয়নার সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। এই মুখটা কি আমার? এই শরীরটা কি আমার? আমি কি সত্যিই হায়দার? নাকি আমি সেই মৃত হায়দারের আত্মা?

রাতে ঘুমাতে গিয়ে ভাবলাম, আমি যদি সত্যিই মরে গিয়ে থাকি, তাহলে হ্যাপি আর আরাশ কি আমার অনুপস্থিতি টের পাচ্ছে না? নাকি তারাও কোনো বিশেষ জগতে আছে যেখানে তারা আমাকে দেখতে পাচ্ছে?

এই চিন্তাগুলো আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। আমি জীবিত নাকি মৃত? আমি আসল নাকি নকল? আমার এই অস্তিত্ব সত্যি নাকি ভ্রম?

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি অবাক হলাম। আমি এখনো আছি। স্বপ্ন দেখিনি। এখনো সবকিছু আগের মতোই লাগছে। কিন্তু সন্দেহ রয়ে গেছে।

আমি পত্রিকা অফিসে গেলাম। সাংবাদিকের সাথে দেখা করলাম। তাকে বললাম, “এই খবরটা কোথা থেকে পেয়েছেন?” সে বলল, “পুলিশ থেকে।” আমি বললাম, “আমিই সেই হায়দার। আমি তো বেঁচে আছি।” সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে তো বড় ভুল হয়েছে। আমরা সংশোধনী ছাপাব।”

কিন্তু এই সংশোধনী কি আমার অস্তিত্বের সংকট দূর করবে? আমি জানি না।

হয়তো আমি একটা সমান্তরাল জগতে আছি। যেখানে আমি মরেছি কিন্তু বেঁচে আছি। যেখানে মৃত্যু এবং জীবনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

অথবা আমি সত্যিই মরে গেছি। আর এখন যা অনুভব করছি সবই মৃত্যু-পরবর্তী চেতনা। যেখানে আমি ভাবছি আমি বেঁচে আছি, কিন্তু আসলে নেই।

অথবা এই পুরো ঘটনাটাই একটা পরীক্ষা। আল্লাহর পক্ষ থেকে। দেখার জন্য যে আমি মৃত্যুর মুখোমুখি হলে কী করি।

এই সব সম্ভাবনা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি জানি না কোনটা সত্য। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত – এই ঘটনার পর আমার জীবন আর আগের মতো নেই।

আমি প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ে সন্দেহ করি। প্রতিটি শ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করি। এই শ্বাস কি সত্যিই আমি নিচ্ছি? এই হৃদস্পন্দন কি সত্যিই আমার?

আমার অস্তিত্বের ভিত্তিমূল নড়ে গেছে। আমি আর নিশ্চিত নই যে আমি আছি।

আর এই অনিশ্চয়তা নিয়েই আমি বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। জানি না আমি জীবিত নাকি মৃত। শুধু জানি আমি আছি। কোনো না কোনোভাবে আছি।

হয়তো এটাই জীবনের সত্য। আমরা কেউই নিশ্চিত নই আমরা বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি। আমরা শুধু ভেবে থাকি যে আমরা বেঁচে আছি।

আর এই ভাবনার জোরেই আমরা চলতে থাকি। জানি না কোথায়, কেন, কীভাবে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *