ব্লগ

স্মৃতিভ্রংশের ভয়ে নিজের নাম বারবার বলা

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার

নাম

একটি কাল্পনিক গল্প


সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শামীম আহমেদ নিজেকে বললেন, “আমি শামীম আহমেদ।”

কেন বললেন জানেন না। শুধু মনে হলো বলা দরকার।


ঘটনাটা শুরু হয়েছিল গত মঙ্গলবার।

অফিসে নতুন একজন কেরানি এসেছে। সে ফাইল নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, “স্যার, আপনার নাম?”

সাধারণ প্রশ্ন। প্রতিদিন হাজার মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর দেয়।

কিন্তু শামীম আহমেদের মুখ থেকে কথা বের হলো না।

তিন সেকেন্ড। পাঁচ সেকেন্ড। সাত সেকেন্ড।

মাথার ভেতর একটা শূন্যতা। যেন কেউ সব মুছে দিয়েছে।

তারপর হঠাৎ মনে পড়লো। “শামীম আহমেদ।”

কেরানি চলে গেল। কিন্তু শামীম আহমেদ স্থির হয়ে বসে রইলেন।

এই সাত সেকেন্ড তাঁকে বদলে দিয়েছে।


সেই রাতে ঘুম হলো না।

শুয়ে শুয়ে ভাবলেন — কেন মনে পড়েনি? চল্লিশ বছর ধরে এই নাম বহন করছেন। মা ডাকতেন এই নামে। বাবা বকা দিতেন এই নামে। স্কুলে রোল কল হতো এই নামে।

তাহলে সেই সাত সেকেন্ড কোথায় গিয়েছিল নামটা?

ভোর চারটায় উঠে বাথরুমে গেলেন। আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। নিজের চোখে চোখ রাখলেন।

“আমি শামীম আহমেদ।”

বললেন। জোরে বললেন।

একটু শান্তি পেলেন।


পরের দিন থেকে একটা অভ্যাস শুরু হলো।

সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ — আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাম বলা।

“আমি শামীম আহমেদ।”

দাঁত ব্রাশ করতে করতে।

“আমি শামীম আহমেদ।”

নাস্তা খেতে খেতে মনে মনে।

“আমি শামীম আহমেদ।”

অফিসে যাওয়ার পথে রিকশায় বসে।

“আমি শামীম আহমেদ।”

প্রতিদিন। প্রতিটা মুহূর্তে। যেন একটা মন্ত্র জপ করছেন।


স্ত্রী নাসরিন একদিন জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে তোমার? বিড়বিড় করো কেন?”

“কিছু না।”

“আমি দেখেছি। বাথরুমে কী বলো?”

শামীম আহমেদ চুপ করে রইলেন। কীভাবে বোঝাবেন? স্ত্রীকে বলবেন যে তিনি নিজের নাম ভুলে যাওয়ার ভয়ে আছেন?

পাগল ভাববে।

“কিছু না। এমনি।”

কিন্তু নাসরিন ছাড়লেন না। “তুমি কি ঠিক আছো? ডাক্তার দেখাবে?”

“না না, আমি ভালো আছি।”

সেই রাতে নাসরিন ঘুমিয়ে যাওয়ার পর শামীম আহমেদ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। আকাশে তারা নেই। মেঘলা রাত।

মনে মনে বললেন, “আমি শামীম আহমেদ।”

কিন্তু এবার একটা প্রশ্ন এলো — শামীম আহমেদ কে?


প্রশ্নটা সহজ নয়।

শামীম আহমেদ একজন মানুষ। বয়স চল্লিশ। চাকরি করেন একটা বীমা কোম্পানিতে। স্ত্রী আছে, দুই সন্তান আছে।

কিন্তু এগুলো তো তথ্য। শামীম আহমেদ কে — এর উত্তর কি এটা?

নাম কি শুধু একটা শব্দ? নাকি এর বেশি কিছু?

মা যখন “শামীম” বলে ডাকতেন, সেই ডাকের মধ্যে কী ছিল? শুধু শব্দ? নাকি ভালোবাসা? নাকি পুরো একটা মানুষের অস্তিত্ব?

শামীম আহমেদ বুঝতে পারলেন না।


অফিসে একটা সমস্যা হলো।

মিটিংয়ে বসে সবাই নিজের নাম বলছে। নতুন ক্লায়েন্ট এসেছে, তাই পরিচয় পর্ব।

“আমি রহমান।” “আমি করিম।” “আমি জামাল।”

শামীম আহমেদের পালা এলো।

আবার সেই শূন্যতা। আবার সেই ভয়।

মুখ খুললেন। কিন্তু শব্দ এলো না।

পাশে বসা সহকর্মী ফারুক ফিসফিস করে বললো, “শামীম ভাই, আপনার পালা।”

“শামীম” শব্দটা কানে যেতেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, “আমি শামীম আহমেদ।”

মিটিং চলে গেল। কেউ কিছু বুঝলো না।

কিন্তু শামীম আহমেদ বুঝলেন — অন্য কেউ না বললে তিনি নিজের নাম বলতে পারছেন না।


সেই রাতে একটা পরীক্ষা করলেন।

বাথরুমে গেলেন। দরজা বন্ধ করলেন। আয়নার সামনে দাঁড়ালেন।

চোখ বন্ধ করলেন।

নিজেকে প্রশ্ন করলেন — “তোমার নাম কী?”

মাথায় কিছু এলো না।

চেষ্টা করলেন। জোর করলেন।

একটা অন্ধকার। একটা শূন্যতা।

তারপর ধীরে ধীরে, যেন দূর থেকে ভেসে আসছে, শুনলেন — “শামীম।”

চোখ খুললেন। ঘামে ভিজে গেছেন।


ছেলে তানভীর সেভেনে পড়ে। একদিন তাকে ডাকলেন।

“তানভীর, আমার নাম কী?”

ছেলে অবাক হলো। “আব্বু?”

“না, নাম। আমার নাম কী?”

“শামীম আহমেদ। কেন?”

“এমনি। যাও পড়তে যাও।”

তানভীর চলে গেল। কিন্তু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার ফিরে তাকালো। তার চোখে চিন্তা।

শামীম আহমেদ বুঝলেন — ছেলে সন্দেহ করছে। ভাবছে বাবার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

হয়তো সত্যিই হয়ে গেছে।


একদিন লাইব্রেরিতে গেলেন।

খুঁজলেন — নাম ভুলে যাওয়া কি কোনো রোগ?

পেলেন। অ্যামনেশিয়া। স্মৃতিভ্রংশ। মস্তিষ্কের সমস্যা।

কিন্তু তাঁর তো অন্য কিছু ভুলে যাচ্ছে না। অফিসের কাজ মনে আছে। বাড়ির ঠিকানা মনে আছে। স্ত্রী-সন্তানের নাম মনে আছে।

শুধু নিজের নামটা…

ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। কিন্তু কী বলবেন? “ডাক্তার সাহেব, আমি নিজের নাম ভুলে যাচ্ছি”?

পাগল ভাববে।


একরাতে স্বপ্ন দেখলেন।

একটা বিশাল মাঠ। অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সবার গলায় একটা করে কার্ড ঝুলছে। কার্ডে নাম লেখা।

শামীম আহমেদ নিজের গলায় হাত দিলেন। কার্ড আছে।

কিন্তু কার্ডে কিছু লেখা নেই। সাদা।

তিনি চিৎকার করলেন, “আমার নাম! আমার নাম কোথায়?”

কেউ শুনলো না। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত।

ঘুম ভাঙলো। বুক ধড়ফড় করছে।

সাথে সাথে বললেন, “আমি শামীম আহমেদ। আমি শামীম আহমেদ। আমি শামীম আহমেদ।”

দশবার বললেন। বিশবার।

তারপর একটু শান্ত হলেন।


নাসরিন একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন।

“তুমি কি আমাকে লুকাচ্ছো কিছু?”

“না।”

“মিথ্যা বলো না। তুমি রাতে ঘুমের মধ্যে বলো ‘আমি শামীম আহমেদ।’ কেন?”

শামীম আহমেদ চুপ করে রইলেন।

“তুমি কি অসুস্থ? প্লিজ বলো।”

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর সব বললেন। সেই সাত সেকেন্ডের কথা। ভয়ের কথা। প্রতিদিন নাম বলার কথা।

নাসরিন শুনলেন। তারপর তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন।

“তুমি পাগল হওনি। তুমি শামীম। আমার শামীম।”

“কিন্তু যদি ভুলে যাই?”

“আমি মনে করিয়ে দেব। সারাজীবন মনে করিয়ে দেব।”

শামীম আহমেদের চোখ ভিজে গেল।


কিন্তু ভয় গেল না।

কারণ একটা প্রশ্ন রয়ে গেল — নাসরিন যদি মনে করিয়ে না দেয়? যদি একদিন নাসরিনও ভুলে যায়?

তখন কে বলবে তিনি শামীম আহমেদ?

তিনি বুঝলেন — নাম আসলে অন্যের স্মৃতিতে বাঁচে। যারা ডাকে, তাদের মুখে বাঁচে। নিজের মুখে বললে সেটা মন্ত্র হয়ে যায়, নাম থাকে না।

মা মারা গেছেন দশ বছর আগে। মা যেভাবে “শামীম” বলতেন, সেই উচ্চারণ পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে।

বাবাও নেই। বাবার “শামীম”ও চলে গেছে।

প্রতিটা মানুষ যখন চলে যায়, তাঁর নামের একটা সংস্করণও মারা যায়।

একদিন সবাই চলে যাবে। তখন তাঁর নাম কে বলবে?


আজকাল শামীম আহমেদ একটা কাজ করেন।

প্রতিদিন ডায়েরিতে লেখেন — “আমি শামীম আহমেদ। আজ [তারিখ]। আমি বেঁচে আছি।”

ভাবেন — যদি একদিন সত্যিই ভুলে যান, এই ডায়েরি পড়লে মনে পড়বে।

কিন্তু তারপর ভাবেন — যদি ভুলে যান যে এই ডায়েরি তাঁর?


মেয়ে নুসরাত একদিন জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, মানুষ মরে গেলে কী হয়?”

“জান্নাতে যায়।”

“জান্নাতে কি নাম থাকে?”

শামীম আহমেদ থমকে গেলেন।

“মানে?”

“মানে, আল্লাহ কি আমাদের নাম ধরে ডাকবেন? নাকি অন্য কিছু?”

তিনি উত্তর দিতে পারলেন না।

সেই রাতে অনেকক্ষণ জেগে রইলেন। ভাবলেন — সৃষ্টিকর্তা কি তাঁকে শামীম আহমেদ নামে চেনেন? নাকি অন্য কোনো নামে? নাকি কোনো নামই লাগে না?

হয়তো নাম শুধু এই পৃথিবীর জন্য। ওপারে গেলে অন্য কিছু হয়ে যাই।

সেই “অন্য কিছু” কী — সেটা জানার কোনো উপায় নেই।


আজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শামীম আহমেদ নিজের চোখে চোখ রাখলেন।

“আমি শামীম আহমেদ।”

বললেন। যেমন প্রতিদিন বলেন।

কিন্তু আজ একটু অন্যরকম লাগলো।

আজ মনে হলো — এই নামটা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো এই মানুষটা। যে আয়নায় দাঁড়িয়ে আছে। যে ভালোবাসে, ভয় পায়, স্বপ্ন দেখে।

নাম ভুলে গেলেও এই মানুষটা থাকবে।

নাকি থাকবে না?

শামীম আহমেদ জানেন না।

তাই তিনি আবার বলেন, “আমি শামীম আহমেদ।”

যতদিন পারেন, বলবেন।

কারণ এই নামটাই একমাত্র সুতো যেটা তাঁকে নিজের সাথে বেঁধে রাখছে।

সুতো ছিঁড়ে গেলে কী হবে — সেই ভয়েই তিনি প্রতিদিন সুতোটা শক্ত করেন।

একটু একটু করে।


[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *