আরাশ আজ প্রশ্ন করেছে, “বাবা, আল্লাহ কোথায় থাকেন?”
আমি বলেছি, “আকাশে।”
আরাশ বলেছে, “কিন্তু আকাশ তো দেখা যায়। আল্লাহ দেখা যায় না কেন?”
আমি থমকে গেছি। কী উত্তর দেব? আল্লাহ সর্বত্র আছেন, নাকি শুধু আকাশে? তিনি কোনো স্থানে সীমাবদ্ধ নন, নাকি আছেন? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমি জানি না।
বলেছি, “আল্লাহ সব জায়গায় আছেন।”
আরাশ বলেছে, “তাহলে এই ঘরেও আছেন? আমার পাশেও আছেন?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?”
আমি চুপ থেকেছি। উত্তর জানি না।
এটাই আমার সমস্যা। আরাশকে ইসলাম শেখাতে চাই, কিন্তু নিজেই জানি না অনেক কিছু। আমার ইসলামিক জ্ঞান খুবই কম।
গত সপ্তাহে আরাশ জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, নামাজ কেন পড়তে হয়?”
আমি বলেছিলাম, “আল্লাহ বলেছেন বলে।”
“কিন্তু কেন বলেছেন?”
আমি ভেবে পাইনি। নামাজের উপকারিতা কী? কেন এটা ফরজ? এর দর্শন কী? কিছুই জানি না।
বলেছিলাম, “বড় হলে বুঝবে।”
কিন্তু আমি নিজেই তো বুঝি না।
আরেকদিন প্রশ্ন করেছিল, “বাবা, শুয়োর খাওয়া হারাম কেন?”
আমি বলেছিলাম, “কারণ আল্লাহ হারাম করেছেন।”
“কিন্তু কেন হারাম করেছেন?”
আমি জানি না। হয়তো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। হয়তো অন্য কোনো কারণ। কিন্তু সঠিক উত্তর জানি না।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন করেছিল গতকাল। “বাবা, আল্লাহ যদি ভালো, তাহলে দুনিয়ায় এত কষ্ট কেন?”
আমি হতবাক হয়ে গেছি। ১১ বছরের বাচ্চা এত গভীর প্রশ্ন করছে। আর আমি, ৩৯ বছর বয়সে, উত্তর জানি না।
বলেছিলাম, “এটা আল্লাহর পরীক্ষা।”
“কিন্তু পরীক্ষা কেন? তিনি তো সব জানেন। আমরা ভালো না খারাপ, তিনি তো আগে থেকেই জানেন।”
আমি নীরব হয়ে গেছি। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো জ্ঞান আমার নেই।
হ্যাপিকে বলেছিলাম, “আরাশ এত কঠিন প্রশ্ন করে। আমি উত্তর দিতে পারি না।”
হ্যাপি বলেছিল, “তুমি ইসলামিক বই পড়ো। শিখো।”
কিন্তু কোন বই পড়ব? কোথা থেকে শুরু করব? আমার তো ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞানই নেই।
আমি নামাজ পড়ি, কিন্তু নামাজের অর্থ জানি না। রোজা রাখি, কিন্তু রোজার দর্শন জানি না। জাকাত দেই, কিন্তু জাকাতের হিসাব ঠিকমতো জানি না।
এই অবস্থায় আরাশকে কিভাবে ধর্ম শেখাব?
মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি একটা অন্ধ গাইড। নিজেই পথ জানি না, অন্যকে পথ দেখাতে চাইছি।
আরাশ স্কুলে বন্ধুদের সাথে ধর্ম নিয়ে আলোচনা করে। তাদের মধ্যে হিন্দু, খ্রিস্টান বন্ধুও আছে। তারা নিজেদের ধর্ম নিয়ে গর্ব করে কথা বলে। আরাশও ইসলাম নিয়ে কথা বলতে চায়। কিন্তু সে কী বলবে?
যদি তার বন্ধুরা প্রশ্ন করে, “তোমার ধর্মে এটা কেন?” তাহলে আরাশ কী উত্তর দেবে? আমি তো তাকে শেখাতেই পারিনি।
এই অক্ষমতার জন্য নিজের ওপর রাগ হয়। আমি একজন মুসলিম বাবা। আমার দায়িত্ব ছিল আমার ছেলেকে ইসলাম শেখানো। কিন্তু আমি নিজেই জানি না।
মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে যাওয়ার কথা ভেবেছি। কিন্তু লজ্জা লাগে। ৩৯ বছর বয়সে গিয়ে বলব, “আমি ইসলামের প্রাথমিক বিষয়গুলো জানি না”?
কিন্তু হয়তো এটাই করতে হবে। লজ্জা ছেড়ে দিয়ে শিখতে হবে। নিজের জন্য নয়, আরাশের জন্য।
আরাশ যখন প্রশ্ন করে, আমি দেখি তার চোখে কৌতূহল। সে সত্যিই জানতে চায়। কিন্তু আমি তাকে সন্তুষ্ট করতে পারি না।
এভাবে চলতে থাকলে একদিন সে ভাববে, “বাবা কিছুই জানে না।” তখন সে হয়তো ধর্ম থেকেই দূরে সরে যাবে।
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আমি যেন আমার অজ্ঞতা দূর করতে পারি। যেন আরাশকে সঠিক ইসলামিক শিক্ষা দিতে পারি।
কিন্তু জানি, শুধু দোয়া করলেই হবে না। পড়াশোনা করতে হবে। শিখতে হবে।
কাল থেকেই শুরু করব। ইসলামিক বই কিনব। অনলাইনে লেকচার শুনব। ইমাম সাহেবের কাছে যাব।
কারণ আমার ছেলে যেন আমার অজ্ঞতার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
একটু ভাবনা রেখে যান