কথা

ভণ্ড

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গত রাতে ঘুম আসছিল না।

বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হ্যাপি পাশে ঘুমাচ্ছে। তার শ্বাসের শব্দ। ধীর, সমান।

মাথায় একটা শব্দ এলো। ভণ্ড।

উঠে বসলাম। বালিশে পিঠ দিলাম। অন্ধকারে বসে রইলাম।


সকালে অফিসে যাওয়ার সময় রিকশায় বসে ছিলাম। রাস্তায় জ্যাম। পাশের রিকশায় একটা মেয়ে ফোনে কথা বলছে। হাসছে।

রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল, “ভাই, তাড়া আছে?”

“না।”

“আজকে জ্যাম বেশি।”

“হুম।”

চুপ হয়ে গেল।

আমি ভাবলাম, এইমাত্র আমি মিথ্যা বললাম। তাড়া আছে। মিটিং আছে। কিন্তু বললাম না।


অফিসে ঢুকে সবাইকে হাসি দিলাম। সাইফুল বলল, “কী খবর?”

“ভালো।”

“তুই ভালো দেখাচ্ছিস না।”

“রাতে ঘুম কম হয়েছে।”

“ওহ।”

ডেস্কে বসলাম। কম্পিউটার অন করলাম। স্ক্রিনে তাকিয়ে রইলাম।

মিটিং শুরু হলো। কথা বললাম। মাথা নাড়লাম। নোট নিলাম।

বস বলল, “তোমার আইডিয়াটা ভালো।”

“ধন্যবাদ।”

কিন্তু আইডিয়াটা আমার ছিল না। একটা ব্লগ থেকে পড়েছিলাম।


বাড়ি ফিরে দেখি আরাশ টিভি দেখছে।

“বাবা!”

কোলে উঠে এলো। আমি বসলাম।

“আজকে স্কুলে কী হলো?”

“কিছু না।”

“কিছু না মানে?”

“এমনি।”

সে আবার টিভির দিকে তাকাল।

আমি তার চুলে হাত বুলালাম। নরম। একটু তেলতেলে।

“বাবা।”

“হুম।”

“তুমি কি খুশি?”

থমকে গেলাম।

“কেন জিজ্ঞেস করছ?”

“এমনি।”

টিভিতে একটা কার্টুন চলছে। একটা বিড়াল ইঁদুর তাড়া করছে।

“হ্যাঁ। খুশি।”

সে কিছু বলল না। টিভি দেখতে থাকল।

আমি উঠে গেলাম। বাথরুমে ঢুকলাম। দরজা বন্ধ করলাম।

আয়নায় তাকালাম।

“তুমি কি খুশি?”

আয়নার লোকটা চুপ করে রইল।


রাতে খাওয়ার সময় হ্যাপি বলল, “তুমি কিছু খাচ্ছ না।”

“খিদে নেই।”

“অসুখ করেছে?”

“না।”

সে আমার দিকে তাকাল। আমি প্লেটের দিকে তাকালাম। ভাত, ডাল, মাছ। সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

“কিছু হয়েছে?”

“কিছু হয়নি।”

আরাশ বলল, “মা, আমার আর ভাত লাগবে।”

হ্যাপি উঠে গেল।

আমি একা বসে রইলাম। মাছটা তুললাম। মুখে দিলাম। চিবোলাম। গিললাম।

স্বাদ পেলাম না।


সুলতানকে ফোন করলাম।

“কী খবর?”

“একটা কথা বলব।”

“বল।”

চুপ করে রইলাম।

“হ্যালো?”

“আমি একটা ভণ্ড।”

সে একটু চুপ থাকল। তারপর হাসল।

“কেন?”

“জানি না। এমনই মনে হচ্ছে।”

“তুই পাগল হয়ে যাচ্ছিস।”

“হয়তো।”

“ঘুমা। কাল কথা হবে।”

ফোন রেখে দিলাম।


হ্যাপি শুতে এলো।

“তুমি ঘুমাবে না?”

“একটু পরে।”

সে শুয়ে পড়ল। আমি বারান্দায় গেলাম।

রাত গভীর। রাস্তায় কেউ নেই। দূরে একটা কুকুর ডাকছে।

সিগারেট ধরালাম। আমি সাধারণত খাই না। আজ ইচ্ছা হলো।

ধোঁয়া ছাড়লাম। উপরে উঠে গেল।

ভাবলাম, আমি কি সত্যিই হ্যাপিকে ভালোবাসি? নাকি এটাও একটা অভ্যাস?

সিগারেট শেষ হলো। গোড়াটা ছুড়ে ফেললাম। নিচে পড়ল। আগুনের ফুলকি নিভে গেল।


পরদিন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরলাম।

হ্যাপি রান্নাঘরে।

“এত তাড়াতাড়ি?”

“মাথা ব্যথা।”

আরেকটা মিথ্যা।

সোফায় বসলাম। চোখ বন্ধ করলাম।

আরাশ এসে পাশে বসল।

“বাবা।”

“হুম।”

“তুমি কি কখনো মিথ্যা বলো?”

চোখ খুললাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

“কেন?”

“টিচার বলেছে মিথ্যা বলা খারাপ।”

“হ্যাঁ। খারাপ।”

“তুমি বলো?”

চুপ করে রইলাম।

“বাবা?”

“সবাই বলে। কখনো কখনো।”

সে একটু ভাবল।

“কেন?”

“জানি না।”

সে উঠে চলে গেল।


সেই রাতে বিছানায় শুয়ে হ্যাপিকে বললাম।

“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

সে ঘুমের মধ্যে বলল, “হুম।”

“তুমি শুনলে?”

“হ্যাঁ।”

“বিশ্বাস করো?”

সে একটু নড়ল। চোখ খুলল।

“কী হয়েছে তোমার?”

“কিছু না।”

“তুমি অদ্ভুত হয়ে গেছ।”

“কীরকম?”

“জানি না। অন্যরকম।”

সে আবার চোখ বন্ধ করল।

আমি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম।


পরদিন সকালে বাবুকে ফোন করলাম।

“একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”

“বল।”

“তুই কি নিজেকে চিনিস?”

সে হাসল। “কী বলছিস?”

“মানে… তুই কি জানিস তুই কে?”

“পাগল হয়ে গেছিস?”

“হয়তো।”

“চল দেখা করি। চা খাই।”


পুরান ঢাকায় গেলাম। সেই চায়ের দোকান। প্লাস্টিকের চেয়ার।

বাবু বলল, “তোর কী হয়েছে?”

“কিছু না।”

“তুই তো কিছু না বলে অনেক কিছু বলছিস।”

চা এলো। চুমুক দিলাম। তেতো লাগল।

“আমি একটা কথা বলি?”

“বল।”

“আমি মিথ্যা বলি।”

“সবাই বলে।”

“না, মানে… সারাক্ষণ। প্রতিটা কথা।”

সে চুপ করে রইল।

“অফিসে হাসি, কিন্তু ভেতরে কিছু থাকে না। বাড়িতে ভালোবাসি বলি, কিন্তু জানি না সত্যি কি না।”

“তুই অনেক বেশি ভাবছিস।”

“হ্যাপিও তাই বলে।”

“তাহলে?”

“তাহলে কী?”

“ভাবা বন্ধ কর।”

চায়ে আরেকটা চুমুক দিলাম। এবার কম তেতো লাগল।


সেই রাতে আবার ঘুম আসছিল না।

উঠে বসলাম। বারান্দায় গেলাম।

আকাশে চাঁদ নেই। তারা আছে। কিছু দেখা যায়, কিছু যায় না।

ভাবলাম, আমি কে?

উত্তর এলো না।

কিন্তু এবার ভয় লাগল না।


সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।

আরাশ এলো।

“বাবা।”

“হুম।”

“তুমি কি আজকে খুশি?”

আয়নার দিকে তাকালাম। তারপর তার দিকে।

“জানি না।”

সে একটু ভাবল।

“জানো না মানে?”

“মানে… জানি না।”

“আচ্ছা।”

সে চলে গেল।

আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

লোকটা তাকিয়ে রইল।

বাইরে রিকশার ঘণ্টা বাজল। কেউ ডাকছে। ভাড়া চাইছে।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

কথা

বদল

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া

কথা

আয়না

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া

কথা

স্বপ্ন

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *