ব্যাংকের লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে থেকতে থেকতে হঠাৎ মনে পড়ল না আমি এখানে কেন এসেছি। কী কাজ ছিল? কী প্রয়োজন ছিল? শুধু মনে আছে ঘর থেকে বের হয়ে এই সারিতে এসে দাঁড়িয়েছি।
আমার সামনে আরও পঁচিশজন মানুষ। পেছনে আরও পনেরো-বিশজন। সবাই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। কেউ কথা বলছে না। কেউ প্রশ্ন করছে না। যেন সবাই জানে এখানে দাঁড়িয়ে থাকাটাই মূল উদ্দেশ্য।
এক ঘন্টা দাঁড়িয়ে আছি। আর পনের মিনিট পর আমার নম্বর আসবে। কিন্তু নম্বর এসে কী বলব? কী চাইব?
আমার পকেটে কাগজপত্র আছে। কিন্তু কী কাজে লাগবে মনে নেই। হয়তো কোনো ফরম পূরণ করতে এসেছিলাম। হয়তো কোনো টাকা তুলতে। হয়তো কোনো অ্যাকাউন্ট খুলতে।
পাশের মানুষটাকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হচ্ছে, “আপনি কী কাজে এসেছেন?” কিন্তু সাহস পাচ্ছি না। হয়তো সেও ভুলে গেছে।
আমার মনে হচ্ছে আমি সারা জীবনই বিভিন্ন সারিতে দাঁড়িয়ে আছি। কখনো দোকানের সারিতে, কখনো অফিসের সারিতে, কখনো চাকরির ইন্টারভিউয়ের সারিতে। আর প্রতিটা সারিতে দাঁড়িয়ে থেকে ভুলে যাচ্ছি কেন দাঁড়িয়ে আছি।
আরাশ বলেছিল, “আব্বু, আজ আপনি কোথায় যাবেন?” আমি বলেছিলাম, “ব্যাংকে।” কিন্তু বলিনি কেন যাব। কারণ আমি নিজেই জানতাম না।
হ্যাপি বলেছিল, “ভুলে যেও না।” কিন্তু কী যেন ভুলে যেতে নেই, সেটা বলেনি। আমিও জিজ্ঞেস করিনি।
এখন দাঁড়িয়ে ভাবছি, আমার জীবনের এই দীর্ঘ সারি কি এমনই? উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে শুধু দাঁড়িয়ে থাকা?
হয়তো আমি চাকরির জন্য দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু ভুলে গেছি কী কাজ করতে চাই। হয়তো বিয়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু ভুলে গেছি কেমন সংসার চাই।
হয়তো সন্তানের জন্য অপেক্ষা করেছিলাম, কিন্তু ভুলে গেছি তাকে কী শেখাব। এখন শুধু দাঁড়িয়ে আছি।
আল্লাহর কাছে দোয়ার জন্যও যেন সারিতে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু কী চাইব ভুলে গেছি। শুধু দাঁড়িয়ে থেকে মনে হয় এটাই আমার কাজ।
আমার সামনের মানুষটার নম্বর এল। সে কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি…” তারপর থেমে গেল। বুঝলাম সেও ভুলে গেছে।
কর্মচারী জিজ্ঞেস করল, “কী কাজ?” সে বলল, “একটু দাঁড়ান, মনে করি।” তারপর দু’মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “পরে আসি।” আর চলে গেল।
এখন আমার নম্বর। আমি কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালাম। কর্মচারী জিজ্ঞেস করল, “কী কাজ?”
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললাম, “আমি… আমার…” তারপর থেমে গেলাম। মনে পড়ল না।
কর্মচারী বিরক্ত হয়ে বলল, “ঠিক করে বলুন কী চান?”
আমি বললাম, “আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম।” সে বলল, “দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন?” আমি বললাম, “মনে নেই।”
সে বলল, “তাহলে ঘরে গিয়ে মনে করে আসুন।”
আমি ব্যাংক থেকে বের হয়ে এলাম। বাইরে এসে ভাবলাম, আমি কেন এসেছিলাম এখানে?
তারপর মনে হলো, হয়তো এটাই জীবন। উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা। আর যখন সুযোগ আসে, তখন বুঝতে পারা যে আমরা কী চেয়েছিলাম সেটা ভুলে গেছি।
রাতে বাড়ি ফিরে হ্যাপিকে বললাম, “ব্যাংকে গিয়েছিলাম।” সে জিজ্ঞেস করল, “কাজ হয়েছে?” আমি বললাম, “না।”
সে আর জিজ্ঞেস করল না কেন হয়নি। হয়তো সেও জানে আমরা সবাই সারিতে দাঁড়িয়ে উদ্দেশ্য ভুলে যাই।
একটু ভাবনা রেখে যান