আজ সকালে আরাশ আমার ফোনে খবরের নোটিফিকেশন দেখে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, এই নীল টিক মানে কী?” আমি তাকাই সেই স্ক্রিনে। একটা লোক পোস্ট করেছে তার ভেরিফাইড ব্যাজের ছবি। ক্যাপশনে লেখা, “Finally! Verified বললেই Verified!” তার নিচে হাজারখানেক লাইক, শত শত কমেন্ট। “Congratulations bro!” “Deserve korten!” “Famous hoye gelen!”
আমি আরাশকে বলি, “এটা মানে সে একটা বিখ্যাত মানুষ।” কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভাবি – সত্যিই কি বিখ্যাত? নাকি শুধু একটা নীল রঙের টিক দিয়ে নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা প্রমাণ করার চেষ্টা?
গত সপ্তাহে জামিউর বলছিল, “হায়দার ভাই, আজকাল সবাই ভেরিফাইড হওয়ার জন্য পাগল। আমার এক বন্ধু তিন লাখ টাকা খরচ করে একটা ইউটিউব চ্যানেল বানিয়ে, কৃত্রিম ভিউ কিনে ভেরিফাইড হয়েছে। এখন সে নিজেকে ‘Content Creator’ বলে।” আমি হাসি। কিন্তু হাসির আড়ালে একটা তিক্ততা আছে।
আমি ভাবি, আমাদের সমাজে মানুষের মূল্য কি এখন একটা নীল টিক দিয়ে নির্ধারণ হয়? যে মানুষটা প্রতিদিন সকালে নামাজ পড়ে, সততার সাথে কাজ করে, পরিবারের জন্য লড়াই করে – তার মূল্য কি সেই মানুষের চেয়ে কম, যার পাশে একটা নীল চিহ্ন আছে?
হ্যাপি আমার এই চিন্তাগুলো শুনে বলে, “তুমি সবকিছু নিয়ে এত ভাবো কেন?” আমি জানি না কী বলব। আমি দেখি কীভাবে মানুষ সেই টিকের জন্য নিজেদের বিকিয়ে দেয়। কীভাবে তারা ভুয়া কাহিনী বানায়, মিথ্যা জনপ্রিয়তা কেনে, শুধুমাত্র একটা ডিজিটাল সত্যায়নের জন্য।
আজ রাতে বারান্দায় বসে আছি। আরাশ আমার পাশে এসে বসে। সে বলে, “বাবা, আমার বন্ধু বলেছে তার বাবার ইনস্টাগ্রামে নীল টিক আছে, তাই সে আমার চেয়ে ভালো।” আমার বুকটা কেমন যেন মোচড় দেয়।
আমি আরাশের দিকে তাকাই। তার চোখে সেই নিষ্পাপ কৌতূহল। আমি বলি, “বাবা, তুমি জানো বাবার কোনো নীল টিক নেই। কিন্তু বাবা তোমাকে এবং মামাকে ভালোবাসে। বাবা চেষ্টা করে সৎ থাকতে। এটাই কি যথেষ্ট নয়?”
সে মাথা নাড়ে, কিন্তু আমি জানি তার মনে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আমিও জানি না এই উত্তর কতটা সত্যি। এই যুগে সততা আর ভালোবাসা কি সত্যিই যথেষ্ট?
রাতে শুয়ে ভাবি, আমি কি ভুল পথে আছি? আমি কি সেকেলে? নাকি চারপাশের সবাই ভুল পথে, আর আমি একা সঠিক পথে? এই নীল টিকের দৌড়ে আমি কি পিছিয়ে পড়ছি?
আমার মনে পড়ে ছোটবেলায় বাবা বলতেন, “মানুষের আসল পরিচয় তার কাজে, তার চরিত্রে।” কিন্তু এখন মনে হয় মানুষের পরিচয় তার প্রোফাইলের পাশে একটা ছোট্ট নীল চিহ্নে।
আমি চোখ বন্ধ করি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যেন আমি আমার সন্তানকে সঠিক পথ দেখাতে পারি। যেন সে বুঝতে পারে, মানুষের মূল্য কোনো ডিজিটাল সার্টিফিকেটে নয়, হৃদয়ের গভীরতায়।
কিন্তু ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে প্রশ্নগুলো আবার ফিরে আসে। আমি কি সত্যিই ঠিক? নাকি আমি শুধু নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি?
একটু ভাবনা রেখে যান