ব্লগ

যে নিয়ম মানতে গেলে নিয়মই ভেঙে যায়

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

চা খেতে খেতে অফিসের নোটিশ বোর্ডে একটা নিয়ম দেখলাম। লেখা আছে: “সবার আগে নিয়ম মানতে হবে।” কিন্তু এই নিয়মটা মানতে গেলেই দেখি নিয়মটা ভেঙে যায়। কারণ এই নিয়ম মানতে হলে আমাকে অন্য নিয়ম ভাঙতে হয়।

অফিসে একটা নিয়ম আছে: “কাজে দেরি করা যাবে না।” আরেকটা নিয়ম আছে: “সব কাগজ ঠিকঠাক চেক করতে হবে।” এখন আমি যদি দ্রুত কাজ করি, তাহলে কাগজ ঠিকঠাক চেক করতে পারি না। আর যদি ভালো করে চেক করি, তাহলে দেরি হয়ে যায়।

দুটো নিয়মই ভাঙা হয়ে যায়।

বাড়িতেও এই সমস্যা। হ্যাপি বলে, “সংসারে সময় দাও।” আবার বলে, “বেশি করে টাকা আয় করো।” এখন আমি যদি বেশি সময় কাজ করি টাকার জন্য, তাহলে সংসারে সময় দিতে পারি না। আর যদি সংসারে সময় দেই, তাহলে কাজে সময় কম দিতে হয়।

দুটো নিয়মই ভাঙা।

আরাশের স্কুলেও এমন। শিক্ষক বলেন, “সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।” আবার বলেন, “সময় মতো পরীক্ষা শেষ করতে হবে।” এখন আরাশ যদি সব প্রশ্নের উত্তর দেয়, তাহলে সময় শেষ। আর যদি সময় মতো শেষ করে, তাহলে সব উত্তর দেওয়া হয় না।

আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময়ও এই সমস্যা। আমাদের বলা হয়, “বেশি বেশি দোয়া করো।” আবার বলা হয়, “কাজে মন দাও।” এখন আমি যদি সারাদিন দোয়া করি, তাহলে কাজ হয় না। আর যদি কাজে মন দেই, তাহলে দোয়া করার সময় কম।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সৎ থাকার নিয়ম। সবাই বলে, “সৎ থাকো।” কিন্তু এই সমাজে সৎ থাকলে চাকরি যায়। চাকরি গেলে সংসার চলে না। সংসার না চললে সৎ থাকা অর্থহীন।

তাহলে সৎ থাকার নিয়ম মানতে গেলে সৎ থাকাই অসম্ভব হয়ে যায়।

গরিবদের জন্য আরও কঠিন। আমাদের বলা হয়, “আইন মানো।” কিন্তু আইন মানতে গেলে এত খরচ যে আইন মানাই অসম্ভব। আইনি কাগজপত্র করতে যে টাকা লাগে, সেই টাকা থাকলে আইন ভাঙার দরকারই নেই।

অফিসে একটা নিয়ম আছে: “ঘুষ নেওয়া যাবে না।” আরেকটা নিয়ম আছে: “কাজ দ্রুত করতে হবে।” কিন্তু ঘুষ না নিলে কেউ দ্রুত কাজ করে না। আর দ্রুত কাজ না করলে বস্‌ রাগ করে।

আমি মাঝখানে আটকে যাই। কোন নিয়ম মানব?

হ্যাপি বলে, “তুমি এত চিন্তা কেন করো?” আমি বলি, “নিয়ম না মানলে তো সমস্যা।” সে বলে, “তাহলে সব নিয়ম মানো।” কিন্তু সে জানে না সব নিয়ম একসাথে মানা যায় না।

আরাশ জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, আপনি কোন নিয়ম মানেন?” আমি বলি, “যেটা মানা যায়।” কিন্তু আসলে জানি না কোনটা মানা যায়।

এই নিয়মের জালে আমরা সবাই আটকে আছি। যেটা মানি, সেটা ভেঙে যায়। যেটা ভাঙি, সেটা মানতে বলে।

রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, এই নিয়মগুলো কে বানিয়েছে? যারা বানিয়েছে, তারা কি জানে যে এগুলো পরস্পরবিরোধী?

নাকি এটাই উদ্দেশ্য? আমাদের দ্বিধায় ফেলে রাখা? যাতে আমরা কোনো নিয়মই ঠিকমতো মানতে না পারি?

আর এই দ্বিধার মধ্যেই আমাদের জীবন কাটিয়ে দেওয়া?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *