আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হলো কেউ আমাকে দেখছে। কেউ আমার প্রতিটা কাজ পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু কে? কোথায়? আমি চারদিকে তাকালাম। কাউকে দেখলাম না। তবুও অনুভূতিটা থেকেই গেল।
সকালে উঠে কী করব, কী পরব, কোথায় যাব – এসব যেন আমি ঠিক করি না। কোনো অদৃশ্য শক্তি আমার জন্য সব ঠিক করে দিয়েছে। আমি শুধু তার আদেশ মানি।
অফিসে যাওয়ার সময় ঠিক করা আছে। কোন রাস্তা দিয়ে যেতে হবে, কোন বাসে উঠতে হবে, কত টাকা ভাড়া দিতে হবে – সব নির্ধারিত। আমার কোনো ইচ্ছার দাম নেই।
অফিসে পৌঁছে যে কাজ করতে হবে, যেভাবে করতে হবে, কার সাথে কথা বলতে হবে, কী বলতে হবে – এসবও আমি ঠিক করি না। সব নিয়ম করা আছে।
দুপুরে খাবার খেতে বসি। কী খাব? যা সাধ্যে কুলায়। কতটুকু খাব? যতটুকু টাকা আছে। খেতে ভালো লাগবে কিনা? সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়।
বিকেলে বাড়ি ফিরি। হ্যাপি জিজ্ঞেস করে, “আজ কেমন গেল?” আমি বলি, “ভালো।” কিন্তু আসলে আমি জানি না ভালো না খারাপ। কারণ আমার মতামত দেওয়ার অনুমতি নেই।
আরাশ বলে, “আব্বু, আমার স্কুলের বন্ধুর বাবা তাকে নতুন সাইকেল কিনে দিয়েছে।” আমি জানি আরাশও চায়। কিন্তু আমি কিনে দিতে পারব কিনা, সেটা আমার উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সেই অদৃশ্য কর্তৃপক্ষের উপর যে আমার আয় নির্ধারণ করে।
রাতে খাবার খেয়ে টিভি দেখি। কী দেখব? যা চ্যানেলে দেয়। আমার পছন্দ-অপছন্দ মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ টিভির চ্যানেলগুলো ঠিক করে কোনো অদৃশ্য মালিক।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভাবি, আজকের এই পুরো দিনটায় আমি কতটুকু নিজের মতো কাজ করেছি? কতটুকু নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিয়েছি?
উত্তর পাই না।
আমার জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে একেকজন অদৃশ্য কর্তৃপক্ষ। চাকরিতে আছে বস। কিন্তু বসেরও উপরে আছে আরও বড় বস। তার উপরেও আছে কেউ। এভাবে চলতে থাকে।
বাজারে গিয়ে কিনি যা দোকানদার রাখে। দোকানদার রাখে যা কোম্পানি দেয়। কোম্পানি দেয় যা তাদের মালিক চায়। মালিক চায় যা বাজার চায়। কিন্তু বাজার মানে কী? কে নিয়ন্ত্রণ করে বাজার?
সেই অদৃশ্য কর্তৃপক্ষই।
আমার ছেলের পড়ালেখা হবে যে শিক্ষাব্যবস্থায়, সেই ব্যবস্থাও আমি করিনি। কোনো অদৃশ্য শিক্ষাবোর্ড করেছে। আরাশ কী শিখবে, কীভাবে শিখবে, কী পরীক্ষা দেবে – সব ঠিক করা।
আমি কোন ডাক্তারের কাছে যাব, কোন ওষুধ খাব, কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নেব – এসবও আমি ঠিক করি না। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী কোনো অদৃশ্য ব্যবস্থা আমার জন্য ঠিক করে দেয়।
এমনকি আমার ধর্ম পালনেও সেই নিয়ন্ত্রণ। কোন মসজিদে যাব, কোন ইমামের নেতৃত্বে নামাজ পড়ব, কী খুতবা শুনব – এসবও কোনো অদৃশ্য কমিটি ঠিক করে।
আমি কখনো জানতে পারি না এই অদৃশ্য কর্তৃপক্ষ কারা। তারা কোথায় থাকে। কেন আমার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের কাছে আমার জবাবদিহি করতে হয় কেন।
সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, এই নিয়ন্ত্রণে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিজে সিদ্ধান্ত নিতে আমার ভয় লাগে। মনে হয় ভুল হয়ে যাবে। কেউ না কেউ তো আমার চেয়ে ভালো জানে আমার জন্য কী ভালো।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, আমাকে একটু স্বাধীনতা দাও।” কিন্তু তারপরই ভাবি, এই প্রার্থনাও কি সেই অদৃশ্য কর্তৃপক্ষ শুনছে?
আরাশ মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে, “আব্বু, আপনি সব সময় অন্যদের কথা মেনে চলেন কেন?” আমি কী উত্তর দেব? বলব যে আমার পছন্দ করার অধিকার নেই?
হ্যাপি বলে, “তুমি একটু নিজের মতো কাজ করতে পারো না?” কিন্তু নিজের মতো মানে কী? আমি তো ভুলেই গেছি আমার নিজের মত কী।
এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভয়ানক দিক হলো, আমি জানি না এটা কোথায় শেষ। আমার মৃত্যুও কি সেই অদৃশ্য কর্তৃপক্ষ ঠিক করে দেবে? আমি কোথায় মরব, কীভাবে মরব, কে আমাকে কবর দেবে – এসবও?
আর সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার হলো, আমি কখনো এই কর্তৃপক্ষকে দেখিনি। কিন্তু তাদের আদেশ প্রতিদিন মেনে চলছি। তারা হয়তো আছেই না। হয়তো আমিই নিজে এই নিয়ন্ত্রণ তৈরি করেছি।
কিন্তু তাতে কী? নিয়ন্ত্রণটা তো আছেই। আর আমি তার বন্দী।
একটু ভাবনা রেখে যান