কথা

লাইব্রেরি

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া
শেয়ার
বৃষ্টিভেজা ঢাকার ভোর-পূর্ব নীরব রাস্তা—বন্ধ শাটার, জটপাকানো তার, পার্ক করা রিকশা আর জলে ভরা রাস্তার প্রতিফলনে শহর ধরা; সামনের বড় জলে বৃত্তাকার ঢেউ শব্দতরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ছে—মানুষহীন এক দৃশ্যে নীরবতাই যেন সর্বোচ্চ চিৎকার।
নীরবতা সবচেয়ে জোরে চিৎকার করে।

মেয়েটা লাইব্রেরি খুঁজে পেল ভুল করে। মঙ্গলবার বিকেলে বৃষ্টি হচ্ছিল। রাস্তা পানিতে ডুবে গিয়েছিল।

দুটো কাচের টাওয়ারের মাঝে বিল্ডিংটা দাঁড়িয়ে ছিল। লাল ইট। কাঠের দরজা। পুরনো কাগজের গন্ধ।

ভেতরে নীরবতা ছিল। সেই ধরনের নীরবতা যা অনেক আগে থেকে আছে। যখন কেউ কারো সাথে কথা বলত মুখোমুখি। যখন কেউ চিঠি লিখত হাতে।

সে একটা টেবিল বেছে নিল জানালার কাছে। বাইরে শহর চলছে — গাড়ির হর্ন, রিকশার ঘণ্টা, মানুষের চিৎকার। কিন্তু এখানে, কাচের পেছনে, সব শব্দ ম্লান।

পাশের টেবিলে একজন বসেছিল। বয়স্ক। হয়তো ষাটের কাছাকাছি। স্যুট পরা কিন্তু টাই নেই। তার সামনে একটা বই খোলা ছিল কিন্তু সে পড়ছিল না। শুধু তাকিয়ে ছিল পাতার দিকে।

মেয়েটা তার খাতা খুলল। একটা চিঠি লিখতে হবে। অফিসে। বসকে। কিন্তু কী লিখবে জানে না।

কলম ধরল। কাগজে ঠেকাল। কিছু লিখল না।

সে খেয়াল করল পাশের লোকটা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সরাসরি না। কিন্তু তাকিয়ে আছে।

“ক্ষমা করবেন,” সে বলল। গলা অদ্ভুত লাগল নীরবতায়। “এখানে কি পানি পাওয়া যায়?”

লোকটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আঙুল দিয়ে দেখাল কোণের দিকে।

কোনো কথা বলল না।

“ধন্যবাদ,” মেয়েটা বলল।

লোকটা মাথা নাড়ল। তারপর আবার বইয়ের দিকে ফিরল।

মেয়েটা উঠে গেল কোণের দিকে। কিন্তু সেখানে কিছু নেই। শুধু খালি দেয়াল। লোকটা তাকে পাঠিয়েছে একটা জায়গায় যা নেই।

সে ফিরে তাকাল। লোকটা এখনও বসে আছে। স্থির। বই পড়ছে না কিন্তু ধরে আছে।

মেয়েটা ফিরে এল তার টেবিলে। খাতা খুলল। কলম ধরল।

লিখল: “আমি আর পারছি না—”

কাটল।

লিখল: “আমার সময় দরকার—”

আবার কাটল।

পাশের লোকটা কথা বলল। গলা অদ্ভুত তরুণ শোনাল।

“তুমি লিখতে পারছো না কারণ তুমি জানো না আসলে কী বলতে চাও।”

মেয়েটা তার দিকে তাকাল। “আমি বুঝতে পারছি না।”

“প্রতিটা লাইন মিথ্যা শুরু হয়। কিন্তু তুমি জানো মিথ্যাটা কোথায়। তাই কাটো। আবার লেখো। আবার কাটো।”

মেয়েটার হৃদপিণ্ড দ্রুত বিট করল। “আপনি আমার খাতা দেখতে পাচ্ছেন না।”

“দেখার দরকার নেই। তোমার মুখ বলছে।” লোকটা বই বন্ধ করল। প্রথমবার মেয়েটা দেখল — কভারে কোনো লেখা নেই। খালি।

“আমার মুখ কিছু বলছে না,” মেয়েটা বলল।

“ঠিক। তোমার মুখ নীরব। কিন্তু নীরবতা সবচেয়ে জোরে চিৎকার করে।”

মেয়েটা খাতা বন্ধ করল। “আপনি কে?”

“কেউ না। একজন যে এই লাইব্রেরিতে আসে প্রতিদিন। গত সতেরো বছর ধরে।”

“প্রতিদিন?”

“প্রতিদিন। একই টেবিল। একই বই।” সে বইটা তুলল। “এটা পড়তে আমার সতেরো বছর লেগেছে।”

মেয়েটা বইটার দিকে তাকাল। খালি কভার। “কিন্তু ওতে তো কিছু নেই।”

“ঠিক। এজন্যই এত সময় লাগছে।”

লাইব্রেরিয়ান তাদের দিকে তাকাল। একটা সতর্কতার দৃষ্টি। নীরবতা রক্ষা করো।

মেয়েটা ফিসফিস করল, “আপনি পাগল।”

“হয়তো। কিন্তু আমি তোমার চেয়ে বেশি সৎ।”

“আপনি আমার সম্পর্কে কিছু জানেন না।”

“আমি জানি তুমি এই লাইব্রেরিতে এসেছো বৃষ্টি থেকে পালাতে নয়। তুমি এসেছো নিজের থেকে পালাতে।”

মেয়েটা উঠে দাঁড়াল। “আমার যেতে হবে।”

“অবশ্যই। তোমার বসকে চিঠি দিতে হবে। তোমার কাজ শেষ করতে হবে।” লোকটা থামল। “কিন্তু তুমি যাবে না।”

“কেন না?”

“কারণ তুমি এখনও জানো না কী লিখতে হবে। এবং যদি তুমি এখন যাও, তুমি আবিষ্কার করবে না।”

মেয়েটা বসে পড়ল। হাত কাঁপছিল। “আবিষ্কার করব কী?”

লোকটা খালি বইটা খুলল। পাতা উল্টাল। প্রতিটা পাতা সাদা। “কেন তুমি কথা বলতে পারো না।”


সন্ধ্যা নামল জানালায়। বাইরে স্ট্রিট লাইট জ্বলল। শহর রূপান্তরিত হল — নিয়ন সাইন, গাড়ির আলো, বিল্ডিংয়ের জানালায় অগণিত জীবন।

মেয়েটা খাতার দিকে তাকিয়ে রইল। সাতটা চেষ্টা। একটাও শেষ হয়নি।

“আমি পাঁচ বছর আগে এই শহরে এসেছি,” সে নিজেকে বলতে শুনল। “একটা চাকরি পেয়েছিলাম। ভালো টাকা।”

লোকটা শুনল। কিছু বলল না।

“আমার স্বামী চায়নি আমি আসি। বলেছিল আমরা আমাদের শহরে সুখী। কিন্তু আমি এলাম।”

বাইরে রিকশা ঘণ্টা বাজল। কোথাও একটা সাইরেন।

“প্রথম দুই বছর ভালো ছিল। আমি উঠলাম। সবাই বলল আমি সফল।”

লোকটা একটা সাদা পাতা উল্টাল।

“তারপর আমার মা অসুস্থ হলেন। আমি যেতে পারলাম না। কাজ ছিল।” মেয়েটার গলা ভাঙল। “তিনি মারা গেলেন আমি পৌঁছানোর আগে।”

লাইব্রেরির নীরবতা গভীর হল। যেন বিল্ডিং নিজেই শ্বাস বন্ধ করে রেখেছে।

“আমার স্বামী আলাদা হতে চাইল। বলল আমি আর সেই মানুষ নই যাকে সে বিয়ে করেছিল।”

লোকটা মাথা নাড়ল। “কিন্তু তিনি ভুল।”

মেয়েটা তার দিকে তাকাল। “কী?”

“তুমি নিজের জন্য ত্যাগ করোনি। তুমি জানতে না কীভাবে না বলতে হয়।”

কথাগুলো ঢুকে গেল ভেতরে। ছুরির মতো।

“প্রতিদিন তুমি লেখো: আমি পারব না। তারপর কাটো। লেখো: আমার সময় দরকার। আবার কাটো। শেষে লেখো: আমি করব। এটা পাঠাও।”

মেয়েটার চোখে পানি এল। “আমি জানি না কীভাবে অন্য কিছু বলতে হয়।”

“হ্যাঁ, তুমি জানো। তুমি শুধু ভয় পাও।”

“কীসের ভয়?”

লোকটা খালি বইটা বন্ধ করল। “নীরবতার। যদি তুমি না বলো, মানুষ কী শুনবে? তোমার আসল চেহারা।”


রাত নয়টায় লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার ঘোষণা হল। লাইব্রেরিয়ান ঘুরে দেখল — সবাই চলে গেছে। শুধু মেয়েটা আর বয়স্ক লোকটা বসে আছে।

“আমাদের বন্ধ করতে হবে।”

লোকটা উঠে দাঁড়াল। খালি বই নিল। “আগামীকাল আসবে?” সে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল।

“জানি না।”

“তুমি আসবে। তুমি এখন এই লাইব্রেরির অংশ। এই নীরবতার অংশ।”

সে চলে গেল। পদধ্বনি কাঠের মেঝেতে প্রতিধ্বনিত।

মেয়েটা তার খাতা খুলল। আবার কলম ধরল।

লিখল: “আমি জানি না আমি কী করছি। আমি জানি না আমি কে। আমার কথা বলতে হবে। নিজের সাথে। আমার সময় দরকার।”

কলম থামল।

লাইব্রেরিয়ান আবার ডাকল। “দয়া করে।”

মেয়েটা বাইরে বেরিয়ে এল। রাস্তা জনশূন্য ছিল না। হাজারো মানুষ হাঁটছে। সবাই নিজের ভেতরে লুকানো।

সে খাতার দিকে তাকাল। চিঠিটা এখনও আছে। কাটা দাগে ভরা।

সে পাতাটা ছিঁড়ে ফেলল।

একটা নতুন পাতা খুলল। কলম ধরল।

আবার কিছু লিখল না।

মেয়েটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। খাতা হাতে। একটা চিঠি শেষ হয়নি। একটা কথা বলা হয়নি। জীবন ঝুলে আছে সেই নীরবতায় যা সে ভরাট করতে পারছে না।

কোথাও দূরে, একটা লাইব্রেরিতে, একটা খালি বই একটা টেবিলে খোলা আছে। অপেক্ষা করছে কেউ পড়ুক।

আর সারা শহর জুড়ে, হাজারো মানুষ লিখছে চিঠি তারা পাঠাবে না। বলছে কথা যার অর্থ নেই। কারণ আসল কথা চুপ থাকে।

নীরবতায়।

খালি বই না বলতে শেখা নিজের কথা বলা লাইব্রেরির নীরবতা

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

শার্ট

অক্টোবর ২০২৫ · 12 মিনিটে পড়া

কথা

বহুরূপ

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *