ব্লগ

নিরাপত্তার ভিত কেঁপে ওঠা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে বাড়িওয়ালা একটা চিঠি দিয়ে গেছেন। লেখা আছে, আগামী মাস থেকে বাড়িভাড়া তিন হাজার টাকা বেড়ে যাবে।

তিন হাজার টাকা। আমার মাসিক আয়ের প্রায় অর্ধেক।

আমি চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম। মনে হলো পুরো পৃথিবী নড়ে গেছে।


এই বাড়িতে আমরা সাত বছর থাকছি। এই ঘরেই আরাশের প্রথম পা ফেলা। প্রথম কথা বলা। এই বারান্দায় আমরা কত স্বপ্ন দেখেছি।

এখন মনে হচ্ছে সেই স্বপ্নগুলো ধসে পড়ছে।

আমি হিসাব কষলাম। নতুন ভাড়া দিতে গেলে আমাদের অন্য সব খরচ কমাতে হবে। আরাশের স্কুলের খরচ কমাতে হবে। খাবারের খরচ কমাতে হবে।

কিন্তু এগুলো কমানো মানে আরাশের ভবিষ্যতের সাথে আপস করা।

আমি অন্য বাড়ির খোঁজ নিলাম। কিন্তু এই এলাকায় সব বাড়িরই ভাড়া বেড়েছে। অন্য এলাকায় গেলে আরাশের স্কুল ছাড়তে হবে।

আমি আরাশকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার কষ্ট দিতে চাই না।

হ্যাপি ব্যাপারটা জানার পর চুপ হয়ে গেল। কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখে দেখলাম একটা গভীর উদ্বেগ।

আমি বুঝলাম, হ্যাপিও আমার মতোই আতঙ্কিত।

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট হলো আমাদের কোনো নিজস্ব ঘর নেই। আমরা অন্যের ঘরে ভাড়াটে। আর ভাড়াটে মানে সব সময় অনিশ্চয়তা।

বাড়িওয়ালার যখন ইচ্ছা, আমাদের ছাড়তে বলতে পারেন। যে দাম বলবেন, সেই দাম দিতে হবে। নইলে বের হতে হবে।

আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এটাই যে আমি পরিবারের জন্য একটা নিরাপদ ঘর তৈরি করতে পারিনি।

আরাশ স্কুল থেকে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কেন চিন্তিত?”

আমি বললাম, “কিছু না।”

কিন্তু আরাশ বুঝতে পারে। ও বলল, “আমাদের কি এই বাড়ি ছাড়তে হবে?”

আমি চমকে গেলাম। আরাশ কীভাবে জানল?

আমি বললাম, “কেন এমন মনে হচ্ছে?”

আরাশ বলল, “তুমি আর মা খুব চুপচাপ। আর তুমি সব সময় ফোনে কারো সাথে বাড়ির কথা বলছো।”

আমি বুঝলাম, আরাশের সামনে আমার উদ্বেগ লুকানো যাচ্ছে না।

আমি আরাশকে বললাম, “আমরা হয়তো অন্য বাড়িতে যেতে পারি।”

আরাশ বলল, “আমি এই বাড়ি ছাড়তে চাই না। আমার সব স্মৃতি এখানে।”

আরাশের কথা শুনে আমার বুক ভেঙে গেল। একটা এগারো বছরের ছেলে তার ঘর হারানোর ভয় পাচ্ছে।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম। যেভাবে হোক, এই বাড়িতেই থাকব। অন্য খরচ কমাব। কিন্তু আরাশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করব না।

আমি বাড়িওয়ালার সাথে কথা বললাম। অনুরোধ করলাম ভাড়া একটু কম বাড়ানোর জন্য।

তিনি বললেন, “তোমরা ভালো ভাড়াটে। কিন্তু আমারও খরচ বেড়েছে।”

আমি বুঝলাম, তিনিও চাপে আছেন।

আমি নতুন আয়ের চেষ্টা শুরু করলাম। অতিরিক্ত কাজ খুঁজলাম। রাতে লেখালেখির কাজ করলাম।

হ্যাপি বলল, “আমি কোনো কাজ করতে পারি।”

আমি বললাম, “না। আমি ব্যবস্থা করব।”

কিন্তু আমি জানি, একা আমার পক্ষে এই চাপ সামলানো কঠিন।

আমি ভাবলাম, আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বাড়িভাড়া বৃদ্ধি কতটা বিপর্যয়কর। এটা শুধু টাকার সমস্যা নয়। এটা নিরাপত্তার সমস্যা।

আমাদের ঘর আমাদের না। আমাদের ভবিষ্যৎ অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, একদিন আমি আমার পরিবারের জন্য একটা নিজস্ব ঘর কিনব। যেখানে আমাদের কেউ বের করে দিতে পারবে না।

কিন্তু সেই একদিন আসতে কত সময় লাগবে? আর ততদিন আমরা এই অনিশ্চয়তা নিয়ে থাকব?

আমি হ্যাপিকে বললাম, “আমরা টিকে যাব।”

হ্যাপি বলল, “আমি জানি।”

কিন্তু আমাদের দুজনের চোখেই দেখলাম একটা প্রশ্ন: সত্যিই কি টিকে যাব?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনো জানি না। কিন্তু চেষ্টা করে যাব। কারণ আরাশের জন্য একটা স্থিতিশীল ঘর দেওয়া আমার দায়িত্ব।

এমনকি যদি সেই ঘর আমাদের নিজেদের না হয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *