ব্লগ

নির্দোষ আয়না

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ বিকেলে আরাশকে নিয়ে আত্মীয়বাড়িতে গিয়েছিলাম। চাচাতো ভাই নতুন চাকরি পেয়েছে। সবাই অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমিও বললাম, “অনেক ভালো খবর।” কিন্তু মনে মনে জানি সে ঘুষ দিয়ে চাকরি পেয়েছে।

হঠাৎ আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কেন খুশি হওয়ার ভান করলে? তোমার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছিল না তুমি খুশি।”

ঘরে সবাই থেমে গেল। আমার ভিতরে একটা অ্যাপ ফ্রিজ হয়ে গেল যার নাম “সামাজিক শিষ্টাচার ভার্সন ব্যর্থ”।

“আরাশ, এখানে এইসব কথা বলতে নেই।”

“কেন বাবা? মিথ্যা বলতে নেই, তুমিই তো শিখিয়েছো।”

ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম – আরাশ সত্য বলেছে, আমি মিথ্যা। কিন্তু আমার মিথ্যা ছিল সম্পর্ক রক্ষার জন্য। আর তার সত্য ছিল বিব্রতকর।

হ্যাপিকে বললাম, “আমি কি ভুল করেছি?”

“কোনটা? মিথ্যা বলা নাকি আরাশকে বকা দেওয়া?”

“দুটোই।”

হ্যাপি বলল, “হায়দার, আমরা বড়রা জটিল জগতে বাঁচি। কখনো কখনো মিথ্যা বলতে হয় শান্তির জন্য। কিন্তু আরাশ সহজ জগতে বাঁচে। তার কাছে সত্য-মিথ্যা পরিষ্কার।”

রাতে আরাশের কাছে গিয়ে বললাম, “তুই কি মনে করিস আমি মিথ্যাবাদী?”

“না বাবা। কিন্তু তুমি কেন বললে না যে তোমার ভালো লাগেনি?”

“কারণ সেটা বললে মামা কষ্ট পেতেন।”

“কিন্তু মিথ্যা বলা তো পাপ?”

“হ্যাঁ। কিন্তু কারো মন ভাঙানোও পাপ।”

আরাশ ভেবে বলল, “তাহলে কী করব? দুটোই তো পাপ।”

আমি উত্তর দিতে পারলাম না।

পরদিন রহিম চাচার কাছে গেলাম। তিনি বলললেন, “বাবা, সত্য বলা ভালো। কিন্তু সত্য কখন বলতে হবে, কীভাবে বলতে হবে, সেটাও জানতে হবে।”

“মানে?”

“মানে, আরাশ যা বলেছে সেটা সত্য। কিন্তু সবার সামনে বলার দরকার ছিল না। তোমাকে একাই বলতে পারত।”

“তাহলে বড়দের মিথ্যা আর বাচ্চাদের সত্য – কোনটা ভালো?”

চাচা হেসে বলললেন, “দুটোরই প্রয়োজন আছে। বাচ্চাদের সত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কতদূর সরে গেছি। আর বড়দের মিথ্যা… সেটাও কখনো কখনো দয়া।”

নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আল্লাহর কাছে কোনো মিথ্যা বলা যায় না। তিনি সব জানেন। কিন্তু মানুষের সাথে?

আরাশকে বললাম, “তুই সত্য বলেছিলি। কিন্তু সেটা কি সবার সামনে বলা ঠিক ছিল?”

“তাহলে কী করতাম?”

“তুমি আমাকে আলাদা করে বলতে। তাহলে আমি বুঝতাম আমি ভুল করেছি।”

“আর যদি তুমি না বুঝতে?”

“তাহলে তুমি আবার বলতে।”

আরাশ বলল, “বাবা, আমি কি সবসময় সত্য বলব?”

“সত্য বলবে। কিন্তু ভেবেচিন্তে। যাতে কারো অযথা ক্ষতি না হয়।”

আমি বুঝলাম। বড়দের মিথ্যা অনেক সময় আত্মরক্ষার জন্য। সমাজে টিকে থাকার জন্য। কিন্তু শিশুদের সত্য আমাদের বিবেক জাগিয়ে দেয়।

দুটোরই প্রয়োজন আছে। শিশুদের সত্য আমাদের পথ দেখায়। বড়দের “কৌশলী মিথ্যা” আমাদের রক্ষা করে।

কিন্তু বিপদ হলো যখন আমরা মিথ্যায় অভ্যস্ত হয়ে যাই। যখন সত্যকে ভুলে যাই।

আরাশ আমার জন্য একটা নির্দোষ আয়না। তার চোখে আমি দেখি আমি কেমন হয়ে যাচ্ছি। তার সত্য আমাকে সতর্ক করে।

হয়তো এটাই শিশুদের সবচেয়ে বড় উপহার। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কে ছিলাম, কে হতে চেয়েছিলাম।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *