নির্দোষতার শেষকৃত্য
আরাশের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। রাত তিনটে। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার গালে — যেন কেউ রুপোলি রঙ দিয়ে এঁকে দিয়েছে শৈশবের শেষ প্রতিকৃতি। এগারো বছরের এই ছেলেটির শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দে একটা নিশ্চিন্ততা আছে, যা শুধু তারাই পায় যারা এখনো জানে না পৃথিবী কতটা ভারী হতে পারে। তার বালিশের পাশে সেই পুরনো টেডি বিয়ার — যাকে সে এখনো আঁকড়ে ঘুমায়, যদিও বন্ধুদের সামনে স্বীকার করতে লজ্জা পায়। এই ছোট্ট ভণ্ডামিটুকুই কি তার প্রথম পাপ? নাকি এটাই বড় হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ?
সে কি জানে মিথ্যার স্বাদ কেমন? বুঝেছে কি ভণ্ডামির জটিল ব্যাকরণ? নাকি তার চোখে এখনো সেই আদিম বিশ্বাস অক্ষত আছে — যে বিশ্বাসে মানুষ মানুষকে ভালোবাসে কোনো শর্ত ছাড়া, সূর্য প্রতিদিন ওঠে শুধু তাকে জাগাতে, আর বাবা-মা হলো অমর দেবতা যারা কখনো ভুল করে না, কখনো কাঁদে না, কখনো হেরে যায় না? আমি জানি এই বিশ্বাসের মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। সময় একটা নিষ্ঠুর শিক্ষক — সে কাউকে ছাড় দেয় না।
আমার নির্দোষতা মরেছিল একটি নির্দিষ্ট সন্ধ্যায়। আট বছর বয়স। হাসপাতালের সিঁড়িতে বাবার হাত ধরে নামছিলাম। করিডোরে ফিনাইলের তীব্র গন্ধ মিশে ছিল মৃত্যুর অদৃশ্য উপস্থিতির সাথে, দূরে কোথাও একটি নবজাতকের প্রথম কান্না ভেসে আসছিল — জীবন আর মৃত্যু পাশাপাশি হাঁটছিল সেই করিডোরে। আমার ছোট্ট হাতে বাবার তালু — ঘামে ভেজা, কাঁপছে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম সেই প্রশ্নটা যা প্রতিটি শিশু একদিন না একদিন করে, “দাদু কেন চোখ বন্ধ করে আছে? কেন কথা বলছে না?” বাবার গলা কেঁপে উঠেছিল। তিনি আমাকে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিলেন, “ঘুমিয়ে আছে, সোনা। অনেক ক্লান্ত ছিল।”
কিন্তু আমি দেখেছিলাম। দাদুর বুক ওঠানামা করছিল না। তার হাত ছিল শীতল — যেমন শীতল হয় জানুয়ারির ভোরে পাথরের বেঞ্চ, যেমন শীতল হয় যা কিছু জীবন্ত ছিল কিন্তু আর নেই। সেই মুহূর্তে আমার ভেতরে কিছু একটা চিরকালের জন্য ভেঙে গিয়েছিল। কোনো শব্দ হয়নি সেই ভাঙনের, রক্তও পড়েনি কোথাও, কিন্তু ক্ষতটা ছিল এত গভীর যে আজও মাঝে মাঝে টনটন করে। সেদিন আমি প্রথমবার জেনেছিলাম একটা ভয়ংকর সত্য — বড়রা মিথ্যা বলে। এমনকি যখন তাদের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে, যখন তাদের কণ্ঠ কাঁপে, তখনও তারা মিথ্যার আশ্রয় নেয়। ভালোবাসা থেকেই নেয় হয়তো, কিন্তু মিথ্যা তো মিথ্যাই।
হ্যাপি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে। ভোরের প্রথম আলো এসে পড়েছে তার কাঁধে, চুলে — যেন কেউ সোনালি ধুলো ছড়িয়ে দিয়েছে। সে পেঁয়াজ কাটছে। নাকি চোখের জল লুকাচ্ছে সেই অজুহাতে? এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য করা আজকাল কঠিন হয়ে গেছে আমার জন্য। তার ঠোঁটে একটা হাসি আছে, কিন্তু সেই হাসির পেছনে কী আছে? আমি জানি না আর। একসময় জানতাম — তার প্রতিটি হাসি ছিল স্বচ্ছ নদীর মতো, আমি দেখতে পেতাম একদম তলা পর্যন্ত। এখন সেই নদী হয়ে গেছে গভীর হ্রদ — স্থির, শান্ত, কিন্তু অতল। কোথায় হারিয়ে গেল সেই স্বতঃস্ফূর্ততা? কোন রাতে, কোন ক্লান্ত সন্ধ্যায় আমরা দুজন অভিনেতা হয়ে গেলাম নিজেদের অজান্তে?
বিয়ের প্রথম বছরে আমরা ঝগড়া করতাম — উচ্চস্বরে, প্রকাশ্যে, কিছু না লুকিয়ে। সেই ঝগড়ায় একটা সততা ছিল। এখন আমরা ঝগড়া করি না। আমরা চুপ থাকি। নীরবতার পুরু দেয়াল তুলে দিয়েছি দুজনের মাঝখানে। এই নীরবতা কি শান্তি, নাকি ধীর মৃত্যু? আমি জানি না। শুধু জানি, এই নীরবতার মধ্যেও আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে নির্দোষতা হারাচ্ছি। প্রেমের নির্দোষতা, বিশ্বাসের নির্দোষতা, কাছে থাকার নির্দোষতা।
স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে আরাশের বন্ধুদের দেখি প্রতিদিন। ওদের চোখে এখনো একটা প্রশ্ন আছে, একটা বিস্ময় আছে, পৃথিবীকে জানার একটা ক্ষুধা আছে। কিন্তু কয়েকজনের মধ্যে আমি দেখতে পাই অন্য কিছু — একটা দূরত্ব, একটা সতর্কতা, যা এই বয়সে থাকার কথা নয়। ওরা হয়তো বাড়িতে দেখেছে বাবা মায়ের গায়ে হাত তুলতে, শুনেছে মাকে রাতের অন্ধকারে চাপা গলায় ফুঁপিয়ে কাঁদতে। ওদের শৈশবে চিড় ধরেছে সময়ের অনেক আগেই। নির্দোষতা এভাবেই মরে — কখনো একটা আঘাতে, কখনো হাজার ছোট ক্ষতে।
জামিউর সাথে গতকাল দেখা হয়েছিল ক্যাফেতে। সে বলল, “আমার মেয়ে রাতে ঘুমাতে গিয়ে জিজ্ঞেস করল — বাবা, মানুষ কেন খারাপ কাজ করে? তুমিও কি কখনো খারাপ কাজ করেছ?” আমি চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলাম, “কী বললি তুই?” জামিউ অনেকক্ষণ চুপ ছিল। তারপর বলল, “বলতে পারিনি কিছু। কী বলব? বলব যে হ্যাঁ, বাবাও মিথ্যা বলেছে, প্রতারণা করেছে, নিজের স্বার্থের জন্য অন্যকে কষ্ট দিয়েছে? বলব যে পৃথিবীটা একটা জটিল জায়গা যেখানে ভালো-মন্দের কোনো স্পষ্ট সীমানা নেই?”
নির্দোষতা হারানো কি একটি মুহূর্তের ঘটনা? নাকি এটা বৃষ্টিতে ভেজা দেয়ালের মতো — ধীরে ধীরে স্যাঁতসেঁতে হয়, একদিন খসে পড়ে পলেস্তারা? আমার মনে হয় দুটোই সত্য। কিছু নির্দোষতা মরে হঠাৎ আঘাতে — মৃত্যু দেখলে, বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হলে, নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি দাঁড়ালে। আর কিছু নির্দোষতা ঝরে পড়ে পাতার মতো — প্রতিদিন একটু একটু করে, এত ধীরে যে টেরও পাওয়া যায় না।
প্রথমে আমরা শিখি বড়রা সবসময় সত্য বলে না। তারপর বুঝি ভালো মানুষরাও কখনো কখনো খারাপ কাজ করে, আর খারাপ মানুষদের মধ্যেও থাকে ভালোত্বের বীজ। তারপর আবিষ্কার করি ন্যায়বিচার একটা বিলাসিতা যা সবাই পায় না — কেউ জন্ম থেকেই পায় সুযোগ, কেউ সারাজীবন সংগ্রাম করেও পায় না। এভাবে একে একে ভেঙে যায় সব বিশ্বাসের স্তম্ভ, আর আমরা দাঁড়িয়ে থাকি ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে — বড় হয়ে যাওয়া, কিন্তু একটু ভাঙা।
কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাতটা আসে সেদিন, যেদিন আমরা নিজেদের আয়নায় দেখি। যেদিন বুঝতে পারি আমরা নিজেরাও সেই একই মানুষ যাদের আমরা একদিন বিচার করতাম। আমরাও মিথ্যা বলি — ছোট মিথ্যা, বড় মিথ্যা, সাদা মিথ্যা। আমরাও স্বার্থপর হই, আমরাও কষ্ট দিই যাদের ভালোবাসি তাদের। নিজের ভেতরের অন্ধকারটুকু প্রথমবার দেখার দিনটিই হয়তো নির্দোষতার আসল মৃত্যুদিন। সেদিনের পর আর কাউকে বিচার করার অধিকার থাকে না, কারণ আমরা জানি আমরাও তাদেরই একজন।
আরাশ এখনো বিশ্বাস করে তার বাবা একজন নায়ক। বিশ্বাস করে আমি সবসময় সত্য বলি, সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিই। সে জানে না আমি অফিসে কত রাজনীতি করি, কতবার নিজের সুবিধার জন্য সত্যকে একটু বাঁকিয়ে বলি। সে জানে না তার মা কতবার আমার ওপর রাগ চেপে রেখে হাসে, কতবার একা বাথরুমে গিয়ে চোখ মোছে। আমরা তার সামনে অভিনয় করি সুখী দম্পতির — এই অভিনয়টাই কি আমাদের সবচেয়ে বড় মিথ্যা? নাকি এই মিথ্যাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা?
সাইফুল কবির একবার বলেছিল, “নির্দোষতা হারানো মানে পৃথিবীকে যেমন সে আছে ঠিক তেমনভাবে দেখতে শেখা।” কথাটা সত্য, কিন্তু অসম্পূর্ণ। নির্দোষতা হারানো শুধু দেখা নয় — এটা মেনে নেওয়াও। মেনে নেওয়া যে কিছুই পুরোপুরি সাদা নয়, কিছুই পুরোপুরি কালো নয়। সবকিছুই ধূসর — বিভিন্ন শেডের ধূসর। এবং সেই ধূসরত্বের মধ্যেই বেঁচে থাকতে হয়, ভালোবাসতে হয়, অর্থ খুঁজে নিতে হয়।
মৃদুল কানাডা থেকে লিখেছিল গত সপ্তাহে, “এখানের বাচ্চারা অনেক তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যায়। আট-নয় বছরেই জেনে যায় সব।” আমি ভাবি, এটা কি শুধু কানাডার সমস্যা? নাকি এই ইন্টারনেটের যুগে, এই তথ্যের বন্যায়, সব শিশুই তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছে? আরাশ ইউটিউবে কী দেখে আমি জানি না। তার ফোনে কী মেসেজ আসে তাও জানি না। হয়তো সে ইতিমধ্যেই জেনে গেছে অনেক কিছু যা আমি জেনেছিলাম অনেক পরে। হয়তো তার নির্দোষতা আমার ধারণার চেয়ে অনেক আগেই মরে গেছে, শুধু আমি টের পাইনি।
রাতের নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করি আরাশের জন্য। কী চাই তার জন্য? তার নির্দোষতা যেন আরো কিছুদিন থাকে? নাকি সে যেন শক্ত হয়ে উঠে পৃথিবীর কঠিন সত্যগুলো মোকাবেলা করতে পারে? আমি জানি না। শুধু জানি, নির্দোষতা হারানোও একটা জরুরি প্রক্রিয়া। কারণ যে কখনো নির্দোষতা হারায়নি, সে কখনো সত্যিকারের সহানুভূতি শেখেনি। যে নিজে কষ্ট পায়নি, সে অন্যের কষ্ট বোঝে না। নির্দোষতা হারানোর মধ্য দিয়েই আমরা শিশু থেকে মানুষ হয়ে উঠি — ভাঙা, কিন্তু পূর্ণ। ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু জীবন্ত।
হয়তো নির্দোষতা হারানোটা শোকের বিষয় নয়। হয়তো এটা একটা অনিবার্য যাত্রা — শৈশবের সোনালি খাঁচা থেকে বাস্তবতার খোলা আকাশে বেরিয়ে আসা। সেই আকাশে ঝড় আছে, বৃষ্টি আছে, কখনো কখনো বজ্রপাত আছে। কিন্তু সেই আকাশেই আছে উড়ে বেড়ানোর স্বাধীনতা, দিগন্ত ছোঁয়ার সম্ভাবনা।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরাশের কপালে ঠোঁট ছোঁয়াই। তার নিঃশ্বাসে দুধের গন্ধ এখনো। সে ঘুমের মধ্যে মৃদু হাসে — হয়তো স্বপ্নে দেখছে ড্রাগন আর জাদুকর, রাজকন্যা আর দূর রাজ্যের কথা। কিন্তু আমি জানি, এই স্বপ্নের মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। একদিন তার স্বপ্নেও এসে পড়বে এই পৃথিবীর জটিলতা — দ্বিধা, অনিশ্চয়তা, হতাশা, বিশ্বাসঘাতকতা।
আর সেই রাতটিই হবে তার নির্দোষতার শেষ রাত। সেই সকালে সে উঠবে একটু অন্যরকম হয়ে — বাইরে থেকে একই রকম, কিন্তু ভেতরে চিরকালের জন্য বদলে যাওয়া। সেদিন সে আমাদের দলে এসে যাবে — আমরা যারা জানি, আমরা যারা দেখেছি, আমরা যারা হারিয়েছি। আর আমি তাকে জড়িয়ে ধরব, কিছু না বলে। কারণ কিছু বলার থাকে না। শুধু পাশে থাকা যায়।
একটু ভাবনা রেখে যান