ব্লগ

নীরব কথোপকথন

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

স্ত্রী আজ সকাল থেকে কথা বলেনি। একটা কথাও না। কিন্তু তার নীরবতায় হাজারটা কথা শুনতে পাচ্ছি। চা বানানোর সময় কাপে চিনি দেওয়ার জোর। থালা-বাসন রাখার আওয়াজ। দরজা বন্ধ করার শব্দ।

প্রতিটি নীরব ক্রিয়া একেকটা বাক্য।

গতকাল রাতে দেরিতে বাড়ি ফিরেছি। অফিসের কাজ। সে কিছু বলেনি। কিন্তু তার চোখ বলেছে, “আবার?” তার ঠোঁটের কোনা বলেছে, “আমি একা খেয়েছি।” তার মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বলেছে, “তুমি আর আমার দরকার নেই।”

কথা না বলে কত কিছু বলা যায়!

আরাশ যখন পরীক্ষার ফল খারাপ করে, আমি তাকে কিছু বলি না। শুধু তাকিয়ে থাকি। সেই তাকানোর ভিতর দিয়ে সে বুঝে যায়—”বাবা হতাশ।” তার মাথা নিচু হয়ে যায়। আমার নীরবতা তার চেয়ে জোরালো যে কোনো বকাঝকার চেয়ে।

অফিসের মিটিংয়ে বস যখন আমার প্রোজেক্ট রিজেক্ট করে, আমি হাসি। কিন্তু সেই হাসির ভিতর ক্রোধ, হতাশা, অসহায়ত্ব—সব মিশে আছে। বস বুঝে যায়। কিন্তু কেউ কিছু বলে না।

নীরবতা কখনো নীরব নয়।

বাসে উঠে পাশের সিটে একজন লোক। তার কপালে ভাঁজ। চোখে অস্থিরতা। হাতের কাঁপুনি। তার সাথে কথা বলিনি। কিন্তু বুঝেছি—সে চাকরি হারিয়েছে। আমার মতোই একজন। আমরা দুজনেই চুপ। কিন্তু দুজনেই জানি একে অপরের কষ্ট।

একটা নীরব সংহতি।

মৃত্যুশয্যায় বাবার পাশে বসেছিলাম। তিনি কিছু বলতে পারছিলেন না। কিন্তু তার চোখ বলছিল, “আমি যাচ্ছি।” আমার চোখ বলছিল, “আমি প্রস্তুত নই।” তার হাত আমার হাত চেপে ধরল। সেই চাপে ছিল—”তুমি পারবে।” আমার হাত কাঁপল। সেই কাঁপনে ছিল—”আমি ভয় পাচ্ছি।”

কোনো শব্দ হয়নি। কিন্তু সব কথা হয়ে গেছে।

রাস্তায় ভিখারি বুড়ি। আমি তার চোখের দিকে তাকাই। সে আমার চোখের দিকে তাকায়। দুজনেই নীরব। কিন্তু তার চোখ বলে, “একটু সাহায্য।” আমার চোখ বলে, “নিজেও কষ্টে।” আমি পকেটে হাত দিই। সে বুঝে যায়।

যে ভাষা মুখে আসে না, সেই ভাষা চোখে আসে।

আমার মনে হয় নীরবতা একটা আলাদা ভাষা। যেটা সবাই বোঝে, কিন্তু কেউ শেখায় না। যেটা কান দিয়ে শোনা যায় না, কিন্তু হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়।

কথা বলার জন্য শব্দের দরকার হয়। কিন্তু কথা বলার জন্য কি সবসময় শব্দের দরকার?

মাঝে মাঝে ভাবি—আমি কতটা কথা বলি নীরবে? আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস কি কিছু না কিছু বলে? আমার হাঁটার ধরন, বসার ভঙ্গি, দাঁড়ানোর ভাব—এগুলো কি আমার ভিতরের কথা বলে?

হয়তো সব মানুষই নীরব বক্তা। প্রতিদিন হাজারো কথা বলি না বলে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নীরবে যা বলি, সেটা কি সত্যি? নাকি নীরবতাও মিথ্যা বলতে পারে?

হয়তো পারে। চোখের জল যখন আসে না, কিন্তু চোখ ভেজা দেখাতে চাই। নীরব থেকেও অভিনয় করা যায়।

তবুও নীরবতার একটা শক্তি আছে। যেটা শব্দে নেই।

কথা না বলেও অনেক কিছু বলা যায়। হয়তো আরো সত্য করে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *