আজ সকালে বাসে উঠে দেখলাম একটা মা তার পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে বসেছে। ছেলেটা জানালা দিয়ে রাস্তার ফকির দেখে জিজ্ঞেস করল, “মা, এই মানুষটার কোনো ঘর নেই কেন?”
মা অস্বস্তিতে বলল, “চুপ করো। এসব নিয়ে প্রশ্ন করো না।”
“কিন্তু মা, আমাদের ঘর আছে, ওর নেই কেন?”
মা আরও বিব্রত হয়ে বলল, “বড় হলে বুঝবে।”
কিন্তু পাশের যাত্রীরা সবাই চুপ। কেউ এই সরল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না।
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ খুলে গেল যার নাম “সরলতার সামনে জটিলতার পরাজয় ভার্সন নীরবতা”।
হাসপাতালের অপেক্ষার ঘরে দেখি একটা দাদি তার নাতনীকে নিয়ে বসে আছে। মেয়েটা একটা রোগীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “নানি, এই চাচা কেন এত কাঁদছে?”
দাদি তাড়াতাড়ি বলল, “ওদিকে তাকিও না।”
“কিন্তু নানি, কাঁদলে কি ব্যথা কমে? আমিও যখন কাঁদি তুমি জড়িয়ে ধরো। ওনাকে কেউ জড়িয়ে ধরছে না কেন?”
দাদি কিছুই বলতে পারল না। চারপাশের মানুষ নিজেদের মুখ লুকাল।
দোকানে গিয়ে দেখি একটা বাবা তার মেয়ের সাথে কেনাকাটা করছে। মেয়েটা দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, এই চালের দাম এত বেশি কেন? গরিব মানুষরা কিনবে কী দিয়ে?”
দোকানদার হেসে বলল, “বাবা, তুমি এসব বুঝবে না।”
“কিন্তু আমি বুঝতে চাই। আমার স্কুলের রিকশাওয়ালা কাকু বলেছে উনি চাল কিনতে পারেন না।”
বাবা লজ্জিত হয়ে মেয়েকে চুপ করাল। কিন্তু দোকানদারের মুখে কোনো উত্তর নেই।
পার্কে দেখি একটা পরিবার বেড়াতে এসেছে। তাদের ছোট ছেলে একটা পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দেখে বলল, “বাবা, এই চাচা কেন এত নোংরা জায়গা পরিষ্কার করে? উনার কি ভালো লাগে না?”
বাবা বিরক্ত হয়ে বলল, “এসব প্রশ্ন করো না। খেলো।”
“কিন্তু বাবা, আমি যখন আমার রুম পরিষ্কার করি, তুমি বলো এটা ভালো কাজ। ওনার কাজ কেন খারাপ?”
বাবা আর কিছু বলতে পারল না।
মসজিদে গিয়ে দেখি একটা শিশু তার দাদাকে জিজ্ঞেস করছে, “দাদা, আল্লাহ সবাইকে ভালোবাসেন না?”
দাদা বলল, “হ্যাঁ।”
“তাহলে কেন কিছু মানুষ খুব ধনী আর কিছু মানুষ খুব গরিব? আল্লাহ কি সবাইকে সমান করেন না?”
দাদা দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে বলল, “এটা আল্লাহর ইচ্ছা।”
“কিন্তু দাদা, আল্লাহর ইচ্ছা কি কখনো অন্যায় হতে পারে?”
দাদা থতমত খেয়ে গেল।
ট্রেনে দেখি একটা মা তার ছেলের সাথে যাচ্ছে। ছেলে জানালা দিয়ে গ্রামের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা, এখানকার বাচ্চারা স্কুলে যায় না কেন?”
মা বলল, “তাদের স্কুল নেই।”
“তাহলে নতুন স্কুল বানায় না কেন? সরকার কি পারে না?”
“পারে। কিন্তু…”
“কিন্তু কী মা? আমরা যেখানে থাকি সেখানে তো অনেক স্কুল?”
মা আর কোনো উত্তর দিতে পারল না।
রাস্তায় দেখি একটা শিশু তার বাবাকে জিজ্ঞেস করছে, “বাবা, পুলিশ চাচারা সবার বন্ধু, তাই না?”
বাবা বলল, “হ্যাঁ।”
“তাহলে সবাই তাদের দেখে ভয় পায় কেন? আমাদের প্রতিবেশী কাকু বলেছিল পুলিশ দেখলে পালাতে হয়।”
বাবা অস্বস্তিতে বলল, “উনি ঠাট্টা করেছিল।”
“কিন্তু বাবা, ঠাট্টায় মানুষ এত ভয় পায় না।”
বাবা নীরব থাকল।
ব্যাংকে দেখি একটা মেয়ে তার মায়ের সাথে এসেছে। মেয়ে জিজ্ঞেস করল, “মা, এই যে এত টাকা, এগুলো কার?”
মা বলল, “যারা জমা রেখেছে।”
“তাহলে রাস্তার ভিক্ষুকরা এখানে টাকা রাখে না কেন?”
“তাদের টাকা নেই।”
“তাহলে তাদের টাকা দেওয়া উচিত না? ভাগাভাগি করলে তো সবার কিছু না কিছু থাকে।”
মা নিরুত্তর।
নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। শিশুরা এমন সব প্রশ্ন করে যার উত্তর আমাদের কাছে নেই। না, উত্তর আছে কিন্তু সেগুলো এত জটিল, এত কুৎসিত যে বলতে পারি না।
শিশুরা জানতে চায় কেন অবিচার আছে। আমরা বলতে পারি না কারণ আমরা সেই অবিচারের অংশ।
শিশুরা জানতে চায় কেন সবাই সমান নয়। আমরা বলতে পারি না কারণ আমরা এই অসমতা থেকে লাভবান।
শিশুরা জানতে চায় কেন মিথ্যা বলতে হয়। আমরা বলতে পারি না কারণ আমাদের পুরো জীবনটাই মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে।
শিশুদের প্রশ্ন আমাদের আয়নার মতো। তারা আমাদের দেখিয়ে দেয় আমরা কত ভণ্ড হয়ে গেছি।
আমরা “বড় হলে বুঝবে” বলে পালিয়ে যাই। কিন্তু আসলে আমরাই বুঝি না। আমরা শুধু মেনে নিয়েছি।
শিশুরা সত্য জানতে চায়। আমরা তাদের দিই মিথ্যার পাঠ।
হয়তো আমাদের উচিত শিশুদের কাছে উত্তরের বদলে প্রশ্ন শেখা।
একটু ভাবনা রেখে যান