ট্রয়ের পতনের দিন আমি সেখানে ছিলাম। কিন্তু হোমারের মহাকাব্যে আমার নাম নেই।
আমি সেই সৈনিক ছিলাম যে ঘোড়ার পেটের ভেতর লুকিয়েছিল কিন্তু নামতে পারিনি। ভয়ে কাঁপছিলাম। যুদ্ধের আওয়াজ শুনছিলাম কিন্তু যোগ দিতে পারিনি।
হেক্টর মরার সময় আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। কাঁদছিলাম। কিন্তু সেই কান্না কোনো কবির কলমে লেখা হয়নি।
আলেকজান্ডার যখন পারস্য জয় করেছিল, আমি তার বাহিনীতে ছিলাম। কিন্তু আমি সেই সৈনিক যে যুদ্ধ করতে পারিনি। হাত কাঁপত। তরবারি ধরতে পারতাম না।
মহান আলেকজান্ডারের ইতিহাসে আমি অনুপস্থিত। অথচ আমি তার প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলাম – একজন অক্ষম সৈনিক হিসেবে।
সিজারের হত্যার দিন আমি সেনেটে ছিলাম। একজন নিরব দর্শক। আমি দেখেছি ব্রুটাসের ছুরি। শুনেছি সিজারের শেষ কথা। কিন্তু আমি কিছু করতে পারিনি। শুধু দেখেছি।
ইতিহাসে লেখা আছে “Et tu, Brute?” কিন্তু লেখা নেই যে একজন মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছিল।
খ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দিন আমি জেরুশালেমে ছিলাম। ভিড়ের মধ্যে। কিন্তু আমি সেই ব্যক্তি যে “ক্রুশবিদ্ধ করো” চিৎকার করতে পারিনি। “মুক্তি দাও”ও বলতে পারিনি।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর দেখছিলাম মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
বাইবেলে আমার উল্লেখ নেই। কিন্তু আমি সেদিন ছিলাম।
বুদ্ধের প্রথম উপদেশের সময় আমি বোধগয়ায় ছিলাম। কিন্তু আমি সেই শিষ্য যে বুঝতে পারিনি তিনি কী বলছেন।
অন্যরা আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিল। আমি অন্ধকারেই রয়ে গেলাম। কিন্তু ইতিহাসের সেই মুহূর্তে আমি উপস্থিত ছিলাম।
কুরআন নাযিলের সময় আমি মক্কায় ছিলাম। কিন্তু আরবি বুঝতাম না। যে বাণী পৃথিবী বদলে দিয়েছিল, সেই বাণী আমার কাছে অর্থহীন ধ্বনি ছিল।
কিন্তু আমি সেখানে ছিলাম। নিরব। বিভ্রান্ত। কিন্তু উপস্থিত।
তৈমুর লঙের আক্রমণের সময় আমি দিল্লিতে ছিলাম। কিন্তু আমি যোদ্ধা নই, শিকারও নই। আমি সেই মানুষ যে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু সব কিছু দেখে।
তৈমুরের ইতিহাসে বীরত্বের গল্প আছে। হত্যাকাণ্ডের বিবরণ আছে। কিন্তু আমার মতো ভীরু মানুষের কথা নেই।
কিন্তু আমরাও তো সেই ইতিহাসের অংশ।
কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের সময় আমি তার জাহাজে ছিলাম। নাবিক নই। যাত্রীও নই। আমি সেই মানুষ যে ভুলক্রমে উঠে পড়েছি।
সমুদ্রে ভয়ে মরছিলাম। বমি করছিলাম। কিন্তু দেখেছি নতুন ভূখণ্ড।
কলম্বাসের ডায়েরিতে আমার বমির কথা লেখা নেই। কিন্তু আমিও সেই আবিষ্কারের সাক্ষী।
গুটেনবার্গের ছাপাখানায় প্রথম বই ছাপার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু পড়তে পারতাম না।
আমি দেখেছি মুদ্রণযন্ত্রের জন্ম। কিন্তু ইতিহাসে লেখা নেই যে একজন নিরক্ষর মানুষ সেদিন কেঁদেছিল।
শেকসপিয়ারের নাটক মঞ্চস্থের সময় আমি গ্লোব থিয়েটারে ছিলাম। কিন্তু ইংরেজি বুঝতাম না।
হ্যামলেট যখন “To be or not to be” বলছিল, আমি ভাবছিলাম এটা কী ভাষা।
কিন্তু আমি সেই মহান মুহূর্তের সাক্ষী।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি মোনালিসার ছবি আঁকার সময় আমি তার স্টুডিওতে ছিলাম। রঙ গোলার কাজ করতাম।
আমি দেখেছি কীভাবে সেই রহস্যময় হাসি জন্ম নেয়। কিন্তু শিল্পের ইতিহাসে আমি অনুপস্থিত।
মাইকেলঅ্যাঞ্জেলো যখন সিস্তিন চ্যাপেল আঁকছিলেন, আমি মাচান ধরে রাখতাম। ঘাড় ব্যথা করত। কিন্তু দেখেছি ঈশ্বর ও আদমের স্পর্শ।
শিল্পের ইতিহাসে আমার ঘাড়ব্যথার কথা নেই।
গ্যালিলিওর টেলিস্কোপে যখন প্রথম চাঁদের পাহাড় দেখা গেল, আমি তার পাশে ছিলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি এর মানে কী।
বিজ্ঞানের ইতিহাসে লেখা আছে গ্যালিলিও চাঁদের পাহাড় দেখেছিলেন। কিন্তু লেখা নেই যে একজন বোকা মানুষও সেদিন সেই দৃশ্য দেখেছিল।
নিউটনের আপেল পড়ার সময় আমি সেই বাগানে ছিলাম। আমিও দেখেছি আপেল পড়তে। কিন্তু আমার মাথায় কোনো আইডিয়া আসেনি।
আমি শুধু ভেবেছি আপেলটা খাওয়া যায় কি না।
বিজ্ঞানের ইতিহাসে নিউটনের নাম আছে। আমার ক্ষুধার কথা নেই।
মুঘলদের আক্রমণের সময় আমি দিল্লিতে ছিলাম। কিন্তু আমি সেই প্রজা যে না পারে লড়তে, না পারে পালাতে।
শুধু লুকিয়ে থাকি। আর দেখি ইতিহাস পাল্টে যেতে।
বাবরের বিজয়ের ইতিহাসে আমার লুকানোর কথা নেই।
পলাশীর যুদ্ধের দিন আমি সেই মাঠে ছিলাম। কিন্তু আমি যোদ্ধা নই। আমি সেই মানুষ যে ভুলক্রমে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে গেছে।
সিরাজউদ্দৌলার পতনের সময় আমি কাঁদছিলাম। কিন্তু আমার চোখের জল কোনো ইতিহাসে লেখা নেই।
তিতুমীরের বাঁশের কেল্লায় আমি ছিলাম। কিন্তু বাঁশ ধরতে জানি না। শুধু দেখেছি বীরত্ব।
আমার অক্ষমতার কাহিনী ইতিহাসের বইয়ে নেই।
ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময় আমি সেই জঙ্গলে ছিলাম। কিন্তু আমি বিদ্রোহী নই। আমি সেই মানুষ যে পথ হারিয়ে সেখানে পৌঁছেছি।
বিদ্রোহের ইতিহাসে আমার পথভ্রষ্টতার গল্প নেই।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ছিলাম মায়ের পেটে। কিন্তু আমি অনুভব করেছি গুলির আওয়াজ। ভয় পেয়েছি মায়ের ভয়ে।
স্বাধীনতার ইতিহাসে আমার ভ্রূণাবস্থার ভয়ের কথা নেই।
আমি বুঝেছি, আমি সব যুগের সেই মানুষ যে ইতিহাসের ঘটনার মধ্যে থাকে কিন্তু ইতিহাসের বাইরে।
আমি অদৃশ্য ইতিহাসের অংশ। যে ইতিহাসে নায়ক নেই। খলনায়কও নেই। শুধু আছে সাধারণ মানুষের ভয়, দুঃখ, বিভ্রান্তি।
আল্লাহ, তুমি কি আমাকে এই জন্যই বানিয়েছ? সব যুগের নিরব সাক্ষী হিসেবে?
হয়তো এটাই আমার ভূমিকা। ইতিহাসে না থেকেও ইতিহাস সংরক্ষণ করা।
কিন্তু এই ভূমিকা এত একা কেন?
একটু ভাবনা রেখে যান