সন্ধ্যায় আমরা তিনজন একসাথে বসি। হ্যাপি, আরাশ, আমি। ডাইনিং টেবিলে, সোফায়, বারান্দায়। কিন্তু আসলে আমরা একসাথে নই। আমরা তিনটি আলাদা দ্বীপ, যার মধ্যে কোনো সেতু নেই।
আমাদের মাঝখানে একটি অদৃশ্য প্রাচীর। সেই ছোট্ট কালো বাক্সটি, যাকে আমরা বলি ফোন।
আমার শৈশবে সন্ধ্যা মানে ছিল পরিবারের সাথে গল্প। মা রান্নাঘর থেকে চা এনে দিতেন। বাবা দিনের কাজের কথা বলতেন। আমি স্কুলের বন্ধুদের গল্প করতাম।
সেই সন্ধ্যাগুলোতে আমাদের মধ্যে একটা উষ্ণতা ছিল। একটা ঘনিষ্ঠতা। আমরা একে অপরের দিকে তাকাতাম, কথা শুনতাম, জবাব দিতাম।
এখন আমাদের সন্ধ্যা ভিন্ন। আমরা বসি একসাথে, কিন্তু আমাদের মনোযোগ অন্যত্র। আমাদের চোখ সেই জ্যোতির্ময় পর্দায় আটকে থাকে। আমাদের মন ভাসে কাল্পনিক জগতে।
হ্যাপি ফোনের পর্দায় আঙুল ঘুরায়। দেখে তার বন্ধুদের জীবনের চকচকে মুহূর্তগুলো। অন্যদের সুখের ছবি দেখে নিজের জীবনের সাথে তুলনা করে।
আরাশ সেই ছোট্ট পর্দায় নানা রঙের ছবি দেখে। কোনো অচেনা মানুষ তাকে শেখাচ্ছে কীভাবে খেলতে হয়। তার সমস্ত মনোযোগ সেই কাল্পনিক দুনিয়ায়।
আর আমি? আমি বার বার দেখি কেউ আমাকে কোনো চিঠি পাঠিয়েছে কিনা। যেন কোনো জরুরি খবরের অপেক্ষায় আছি। কিন্তু কোনো জরুরি খবর আসে না। তবুও দেখতে থাকি।
আমরা তিনজনই ব্যস্ত। কিন্তু কী নিয়ে ব্যস্ত? গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ে? না, আমরা ব্যস্ত নিরর্থক পর্দা দেখা নিয়ে।
মাঝে মাঝে আমি মাথা তুলে তাকাই। দেখি হ্যাপি আর আরাশও তাদের ফোনে মগ্ন। আমার ইচ্ছে করে কথা বলার। কিন্তু কী বলব? তারা তো শুনছে না।
কখনো কখনো আরাশ কিছু বলে। “বাবা, দেখো এই ছবিটা।” আমি দেখি। কিন্তু সেটা আড্ডা নয়। সেটা শুধু দেখানো মাত্র।
আমি বুঝি, আমরা একে অপরের সাথে কথা বলতে ভুলে গেছি। আমরা শিখেছি কীভাবে যন্ত্রের সাথে কথা বলতে হয়, কিন্তু ভুলে গেছি কীভাবে মানুষের সাথে কথা বলতে হয়।
এই ছোট্ট যন্ত্রটি আমাদের পরিবারে এনেছে একটা নীরবতা। এমন নীরবতা যা আগে ছিল না। আগে আমরা চুপ থাকতাম যখন কিছু বলার থাকত না। এখন আমরা চুপ থাকি কারণ আমাদের মনোযোগ অন্যত্র।
আরাশ যখন ছোট ছিল, আমাদের সাথে খেলত। গল্প শুনত। প্রশ্ন করত। এখন ও নিজের ছোট্ট পর্দার জগতে বাস করে। আমার কাছে আসে না।
হ্যাপি আগে আমার সাথে দিনের ঘটনা নিয়ে কথা বলত। এখন ও বন্ধুদের জীবন দেখে নিজের জীবনে অসন্তুষ্ট হয়।
আমি নিজেও দোষী। আমিও আমার ফোন ছেড়ে দিতে পারি না। যেন এটা আমার শরীরের একটা অংশ।
কিন্তু এই যন্ত্রের কাছে আমরা কী হারিয়েছি? আমরা হারিয়েছি একে অপরকে। আমরা হারিয়েছি আমাদের পারিবারিক উষ্ণতা।
একদিন আমি ঠিক করলাম। রাতের খাবারের সময় কোনো ফোন থাকবে না। আমি বললাম, “আজ আমরা শুধু কথা বলব।”
আরাশ অস্বস্তি বোধ করল। হ্যাপি একটু অবাক হলো। কিন্তু আমরা চেষ্টা করলাম।
প্রথমে কেউ কিছু বলল না। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম কীভাবে কথা শুরু করতে হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা কথা বলতে শুরু করলাম।
আরাশ তার স্কুলের গল্প বলল। হ্যাপি তার দিনের অভিজ্ঞতা জানাল। আমি আমার কাজের কথা বললাম।
সেদিন রাতে আমাদের ঘরে একটা আলাদা আমেজ ছিল। আমরা হাসলাম। কথা বললাম। একে অপরের চোখের দিকে তাকালাম।
আমি বুঝলাম, এই ছোট্ট যন্ত্রটি আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু আমরা চাইলে সেগুলো ফিরে পেতে পারি।
প্রয়োজন শুধু ইচ্ছাশক্তি। আর একটু সময়। একে অপরের জন্য।
কারণ কোনো যন্ত্রই মানুষের স্পর্শের বিকল্প হতে পারে না। কোনো পর্দাই মানুষের চোখের বিকল্প হতে পারে না।
আমাদের পরিবার এখনও আছে। শুধু আমাদের খুঁজে নিতে হবে। এই নীরব শত্রুর আক্রমণ থেকে।
একটু ভাবনা রেখে যান