জীবন

দূরত্ব

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

রাত তিনটা। আমি জেগে আছি।

হ্যাপি ঘুমাচ্ছে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়মিত। ঠিক যেন একটা ঘড়ির টিকটিক।

আমি ভাবছি — সে কি স্বপ্ন দেখছে? কীসের স্বপ্ন? আমি কি তার স্বপ্নে আছি?

জানি না। জানার উপায়ও নেই।

পনেরো বছর আগে বিয়ে হয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল এই মানুষটাকে আমি চিনি।

এখন মনে হয় আমি কাউকেই চিনি না। নিজেকেও না।

ঘরের দেয়াল দেখছি। সাদা। কতদিন এই দেয়াল দেখছি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে এই দেয়াল একটা সীমানা। আমার আর তার মধ্যে।

সকালে উঠব। বলব “শুভ সকাল।” সে বলবে “চা বানাচ্ছি।” আমি বলব “ধন্যবাদ।” তারপর নীরবতা।

এই নীরবতা এখন আমাদের ভাষা।

মনে পড়ে বাবার কথা। মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, “বিয়ে মানে দুটো মানুষের একসাথে বাঁচা।”

আমি তখন মাথা নেড়েছিলাম।

এখন জানি — বাবা যা বলতে চেয়েছিলেন, তা বলতে পারেননি।

একসাথে বাঁচা মানে শুধু একই ছাদের নিচে থাকা নয়।


সকাল সাতটায় আরাশ স্কুলে যায়। যাওয়ার আগে আজ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি আম্মুকে ভালোবাস?”

আমি থমকে গেলাম। “হ্যাঁ, অবশ্যই।”

“তাহলে কথা বলো না কেন?”

এগারো বছরের ছেলে।

আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। সে স্কুলের ব্যাগ নিয়ে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

কথা বলি না কেন?


দপ্তরে গেলাম। সারাদিন কাজ করলাম। সহকর্মীদের সাথে কথা বললাম। হাসলাম।

দুপুরে খাওয়ার সময় একজন বলল, “ভাই, তুমি ইদানীং চুপচাপ থাকো।”

“না তো, ঠিক আছি।”

“বাসায় সব ঠিক?”

“হ্যাঁ, সব ঠিক।”

মিথ্যা বলতে শিখে গেছি। এমন সাবলীলভাবে মিথ্যা বলি যে নিজেও বিশ্বাস করি।


সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলাম। হ্যাপি রান্নাঘরে। আমি সোফায়। আরাশ তার রুমে।

তিনজন মানুষ। এক ঘরে। কিন্তু তিনটা আলাদা দ্বীপ।

মনে পড়ল গত মাসের কথা। হ্যাপির জন্মদিন ছিল। একটা শাড়ি কিনেছিলাম। দামি। সে খুশি হয়েছিল।

কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করিনি — তুমি কী চাও? তোমার কী স্বপ্ন? তুমি কী নিয়ে ভাবো?

শাড়ি কিনেছি। কিন্তু তার মনের কথা জানার চেষ্টা করিনি।


রাতে খাবার টেবিলে বসলাম। হ্যাপি খাবার পরিবেশন করল। আরাশ খেতে লাগল।

আমি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার দিন কেমন গেল?”

হ্যাপি একটু অবাক হল। “ভালো।”

“কী করলে?”

“স্বাভাবিক কাজ। রান্না, ঘর পরিষ্কার।”

তারপর নীরবতা। আবার সেই চেনা নীরবতা।

আমি চেষ্টা করলাম। “আজ একটা বৈঠক ছিল।”

“হুম।”

আমি বলতে চাইলাম — আমি ক্লান্ত। আমি হারিয়ে যাচ্ছি। আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই। সত্যিকারের কথা।

কিন্তু বললাম, “বৈঠক ভালো হয়েছে।”

“ভালো তো।”

কথোপকথন শেষ।


রাতে শুয়ে ভাবলাম — আমরা কেন এমন হয়ে গেলাম?

মনে পড়ে প্রেমের দিনের কথা। তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম। কথা শেষ হত না।

এখন কথা খুঁজে পাই না।

নাকি কথা আছে, কিন্তু বলার সাহস নেই?

গত সপ্তাহে বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলাম। তাদের দেখলাম। স্বামী-স্ত্রী একসাথে বসে আছে। মাঝে মাঝে কথা বলছে। ছোট ছোট কথা। বাজারের দাম। পাড়ার খবর।

আমার ঈর্ষা হল।

বাড়ি ফিরে হ্যাপিকে বললাম, “দেখলাম, ওরা অনেক কথা বলে।”

“হুম।”

“আমরা কম কথা বলি।”

সে তাকাল। তার চোখে একটা প্রশ্ন দেখলাম। কিন্তু সে কিছু বলল না।

আমিও চুপ।

আবার সেই নীরবতা। এই নীরবতা এখন একটা তৃতীয় মানুষের মতো। আমাদের মাঝে বসে থাকে।


আজ রাতে আবার জেগে আছি। হ্যাপি ঘুমাচ্ছে। আরাশ তার রুমে ঘুমাচ্ছে।

আমি একা। এই ভিড়ের মধ্যে একা।

মনে হয় — আমরা দুজনেই হয়তো একই জিনিস অনুভব করছি। একই একাকিত্ব। কিন্তু কেউ কাউকে বলছি না।

দুটো মানুষ। একই যন্ত্রণা। কিন্তু আলাদা আলাদা।

হ্যাপি হয়তো ভাবে আমি খুশি। আমি ভাবি সে খুশি। দুজনেই মিথ্যার মধ্যে বাঁচছি।

গতকাল হ্যাপি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। আমি জিজ্ঞেস করিনি কেন।

এখন ভাবছি — যদি মন খারাপ হয়? যদি সে একা বোধ করে?

আমি কেন জানতে চাইলাম না?


মনে পড়ে মায়ের কথা। মা বলতেন, “সম্পর্ক মানে কথা। কথা না থাকলে সম্পর্কও থাকে না।”

তখন বুঝিনি।


আজ ঠিক করেছি — কাল সকালে কথা বলব। জিজ্ঞেস করব — তুমি কি খুশি? তুমি কি একা বোধ করো?

কিন্তু প্রশ্ন হল — আমি কি পারব?

পারব কি বলতে যে আমিও একা বোধ করি? যে আমিও হারিয়ে যাচ্ছি?

নাকি আবার ভয় পাব? আবার চুপ থাকব?


ঘড়িতে সাড়ে তিনটা বাজে। আরও তিন ঘণ্টা পর সকাল হবে।

আবার সেই “শুভ সকাল।” আবার সেই “চা বানাচ্ছি।”

কিন্তু হয়তো আজ আলাদা হবে।

হয়তো আজ আমি সাহস করব।

হয়তো।


হ্যাপি নড়ে উঠল। হয়তো জেগে উঠবে। হয়তো এখনই বলা যায়।

কিন্তু সে আবার ঘুমিয়ে গেল।

আর আমি জেগে রইলাম।


পরদিন সকাল।

হ্যাপি চা বানাচ্ছে। আমি টেবিলে বসে আছি।

আমি মুখ খুলতে চাইলাম। বলব — আমরা কথা বলি। সত্যিকারের কথা।

কিন্তু হ্যাপি চা দিয়ে বলল, “আজ তাড়াতাড়ি বের হতে হবে না? দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

আমি বললাম, “হ্যাঁ। দেরি হচ্ছে।”

চা শেষ করলাম। পোশাক পরলাম। বেরিয়ে গেলাম।

দরজা বন্ধ করার আগে পেছন ফিরে তাকালাম। হ্যাপি রান্নাঘরে।

আমি বলতে পারলাম না।

আবার।

রাস্তায় হাঁটছি। অনেক মানুষ হাঁটছে। সবাই কোথাও যাচ্ছে।

আমিও যাচ্ছি। কিন্তু জানি না কোথায়।

রাতে হয়তো আবার ঠিক করব — কাল বলব। কাল সাহস করব।

কিন্তু কাল এসে আবার একই হবে।

এভাবেই চলছে। এভাবেই চলবে।

আমরা একসাথে আছি। কিন্তু সাথে নেই।

এবং এই দূরত্ব বাড়ছে। প্রতিদিন। একটু একটু করে।

কখনো একদিন হয়তো এই দূরত্ব এতটাই বড় হবে যে পার হওয়া যাবে না।

কিন্তু আজ নয়।

আজ শুধু আরেকটা দিন। নীরবতায় কাটানো আরেকটা দিন।

আর কিছু না।

একাকিত্ব নীরবতা ভালোবাসা

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

শার্ট

অক্টোবর ২০২৫ · 12 মিনিটে পড়া

একজন বাবার কষ্টের গল্প যেখানে ফুটে উঠেছে মধ্যবিত্তের হাহাকার। এই ছবিতে দারিদ্র্যের কষাঘাত আর বাবার নীরব ত্যাগ দৃশ্যমান, যা জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে।

জীবন

উপোস

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ · 5 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *