আজ আরাশের স্কুলে অভিভাবক মিটিং ছিল। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বললেন, “আমরা মেয়েদের জন্য ফুটবল টিম করতে চাই। কিন্তু কিছু অভিভাবক আপত্তি করেছেন।”
পাশের সিটে বসা এক অভিভাবক দাঁড়িয়ে বলল, “ম্যাডাম, ইসলামে মেয়েদের খেলাধুলা নিষেধ। এটা বেহায়াপনা।”
আমার কান খাড়া হলো। ইসলামে মেয়েদের খেলাধুলা নিষেধ? কোথায় লেখা?
বাসায় ফিরে গুগলে সার্চ করলাম। দেখলাম অনেকেই বলেন মেয়েদের খেলাধুলা হারাম। যুক্তি – “পুরুষরা দেখতে পারে”, “শরীর দেখা যায়”, “ইসলামী আদবের বিরোধী।”
কিন্তু হাদিস খুঁজে দেখলাম অন্য চিত্র।
আইশা (রা) রসুল (সা) এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমে আইশা (রা) জিতেছিলেন, পরে রসুল (সা) জিতেছিলেন। রসুল (সা) হেসে বলেছিলেন, “এবার আমি তোমাকে হারিয়ে দিলাম।”
আইশা (রা) রসুল (সা) এর কাঁধে ভর দিয়ে হাবশী খেলোয়াড়দের খেলা দেখেছিলেন মসজিদে নববীতে।
রসুল (সা) নিজের মেয়ে ফাতিমা (রা) কে বলেছিলেন শরীরচর্চা করতে।
তাহলে এই নিষেধাজ্ঞা কোথা থেকে এলো?
হ্যাপিকে বললাম, “তুমি ছোটবেলায় খেলাধুলা করতে?”
“হ্যাঁ, অনেক করতাম। ব্যাডমিন্টন, দৌড়াদৌড়ি। কিন্তু ক্লাস এইটের পর বাবা বলেছিলেন – এখন বড় হয়েছিস, এসব বন্ধ কর।”
“মন খারাপ হয়েছিল?”
“অনেক। ব্যাডমিন্টনে আমি স্কুল চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। হয়তো জাতীয় পর্যায়েও খেলতে পারতাম।”
আরাশ বলল, “আব্বু, আমার ক্লাসে সালমা খুব ভালো ফুটবল খেলে। তার বাবা বলেছেন খেলা বন্ধ করতে। সে খুব কাঁদে।”
আমার মন খারাপ হয়ে গেল। একটা প্রতিভা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার জন্য।
কুরআনে খেলাধুলা সম্পর্কে কী আছে দেখলাম। উমর (রা) এর বিখ্যাত উক্তি, “তোমাদের সন্তানদের তিরন্দাজি, সাঁতার ও ঘোড়সওয়ারী শেখাও।” এখানে কি শুধু ছেলেদের কথা বলা হয়েছে?
ইসলামে শরীর সুস্থ রাখা ফরজ। কুরআনে বলা হয়েছে (বাকারা ২:১৯৫), “নিজেদের হাতে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।” শরীরচর্চা না করে অসুস্থ থাকা কি এর অন্তর্ভুক্ত নয়?
আমি ভাবি, যে মেয়েরা খেলাধুলা করে না, তারা স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগে ভোগে। এটা কি ইসলামসম্মত?
অলিম্পিকে মুসলিম নারী অ্যাথলেটরা পর্দা মেনে খেলেন। তারা কি ইসলামের বিরোধিতা করছেন?
বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদে কিছু মেয়ে ব্যাডমিন্টন খেলছে। লুকিয়ে লুকিয়ে। যেন কোনো অপরাধ করছে।
আমার মনে প্রশ্ন – খেলাধুলা কিভাবে পাপ? শরীর সুস্থ রাখা, মানসিক বিকাশ, দলীয় কাজ শেখা – এগুলো কি ক্ষতিকর?
আমি বিশ্বাস করি, যারা মেয়েদের খেলাধুলায় বাধা দেন, তাদের আসল ভয় হলো – মেয়েরা শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। তখন তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
কিন্তু আল্লাহ কি চান তার সৃষ্টি দুর্বল ও অসুস্থ থাকুক? নাকি চান সবাই সুস্থ, সবল ও আত্মবিশ্বাসী হোক?
হাদিসে আছে, “শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে বেশি প্রিয় ও উত্তম।” এখানে কি শুধু পুরুষদের কথা বলা হয়েছে?
আমি চাই আরাশ বড় হয়ে এমন একজন মানুষ হোক যে মেয়েদের খেলাধুলা, শরীরচর্চা, মানসিক বিকাশে সহায়তা করবে। ধর্মের নাম করে বাধা দেবে না।
রাতে দোয়া করি – হে আল্লাহ, যারা তোমার নামে মেয়েদের সুস্বাস্থ্য ও আনন্দের পথে বাধা দেয়, তাদের সঠিক বুঝ দাও। আর যে মেয়েরা খেলার স্বপ্ন দেখে, তাদের পথ সহজ করে দাও।
একটু ভাবনা রেখে যান