আজ সকালে ফোনটা বন্ধ করে ড্রয়ারে রেখে দিলাম। “ডিজিটাল ডিটক্স” – এই নামে নিজেকে একটা মহৎ কাজ করার ভান দিলাম। কিন্তু আসল কথা হলো, গতকাল রাতে মৃদুলের মেসেজ এসেছিল – “ভাই, কানাডায় একটা জব অপরচুনিটি আছে তোর জন্য।” আমি উত্তর দিইনি। কেন? কারণ আমি ভয় পেয়েছি। আবার স্বপ্ন দেখতে ভয়। আবার ব্যর্থ হতে ভয়।
তাই ফোনটা বন্ধ করে নিজেকে বললাম – “আমি ডিজিটাল জগৎ থেকে মুক্তি নিচ্ছি।” কিন্তু আসলে আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
সারাদিন ঘরে বসে বসে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাইরে জীবন চলছে, আর আমি বন্দী। এই যে নীরবতা, এটা কি শান্তি নাকি শাস্তি? আমার মনে হচ্ছে আমি নিজেকে জেলে পুরেছি। আর জেলখানার নাম দিয়েছি “আধ্যাত্মিক অনুশীলন।”
দুপুরে আরাশ এসে বলল, “বাবা, তোমার ফোন বাজছে।”
“আমি ডিজিটাল ডিটক্স করছি।”
“মানে?”
“মানে হলো… প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা। মন পরিষ্কার করা।”
আরাশ আমার দিকে এক অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে বলল, “বাবা, তুমি কি নিজেকে শাস্তি দিচ্ছ?”
এই একটা কথায় আমার ভিতরে কোনো অ্যাপ ক্র্যাশ করে গেল। নাম ছিল “আত্মপ্রতারণা ভার্সন ১২.০”।
“কেন এমন বললি?”
“কারণ তুমি যখন খুশি থাকো, তখন সবার সাথে কথা বলো। আর যখন দুঃখে থাকো, তখন সবার সাথে কথা বন্ধ করে দাও। এটাকে তুমি কখনো ‘একা থাকতে চাওয়া’, কখনো ‘চিন্তা করা’, আর আজ বলছো ‘ডিজিটাল ডিটক্স’।”
আরাশের কথাগুলো আমার বুকে বিঁধল। সে আমাকে আয়নার মতো সত্য দেখাল।
সন্ধ্যায় হ্যাপি এসে বলল, “মৃদুলের ফোন এসেছিল। বলছিল তোমার সাথে জরুরি কথা আছে।”
“আমি ডিজিটাল ডিটক্স করছি।”
“কতদিন?”
“জানি না। যতদিন মন পরিষ্কার না হয়।”
হ্যাপি আমার পাশে বসে বলল, “হায়দার, তুমি এই কাজটা করো কেন? যখনই কোনো সুযোগ আসে, তুমি পালিয়ে বেড়াও। বলো চিন্তা করতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর শেষে সুযোগটা চলে যায়।”
“আমি পালাই না। আমি সাবধান।”
“না। তুমি নিজেকে শাস্তি দাও। যেন তুমি নিজের শত্রু।”
রাতে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম। আমার বাবা মারা গেছেন যখন আমার তেইশ বছর বয়স। তখন আমি একা ছিলাম। কিন্তু সেই একাকীত্বটা ছিল বাধ্যতামূলক। এখন আমি স্বেচ্ছায় একা থাকি। কিন্তু কেন?
হয়তো আমি ভয় পাই যে আরেকবার আশা করলে, আবার হতাশ হব। আরেকবার স্বপ্ন দেখলে, আবার ভেঙে যাবে। তাই ভালো খবর আসার আগেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিই।
কিন্তু এটা তো ডিজিটাল ডিটক্স নয়। এটা “লাইফ ডিটক্স”। আমি জীবন থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি।
মৃদুলের কথা ভাবছিলাম। সে কানাডা থেকে আমার কথা ভাবছে। আর আমি এখানে বসে “আধ্যাত্মিকতার” নামে লুকিয়ে আছি।
আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম। মনে হলো তিনি প্রশ্ন করছেন – “তুমি কি আমার কাছ থেকেও ডিটক্স নেবে? আমি যখন তোমার জন্য সুযোগ পাঠাই, তুমি কি সেটাকেও প্রযুক্তি মনে করে এড়িয়ে যাবে?”
সকালে ঘুম থেকে উঠে ড্রয়ার খুলে ফোনটা বের করলাম। মৃদুলের তিনটা মিসড কল। একটা দীর্ঘ মেসেজ।
আরাশ দেখে বলল, “বাবা, ডিজিটাল ডিটক্স শেষ?”
“হ্যাঁ। বুঝলাম যে আমি আসলে জীবন থেকে ডিটক্স নিচ্ছিলাম।”
“তার মানে?”
“মানে হলো, নিজেকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ভালো শব্দ খুঁজে নেওয়া।”
মৃদুলকে ফোন করলাম। সে খুশি হয়ে বলল, “ভাবছিলাম তুই রাগ করেছিস।”
“না। আমি আমার সাথেই রাগ ছিলাম।”
জানি না কানাডার চাকরি পাব কি না। কিন্তু অন্তত চেষ্টা করব। আর নিজেকে “ডিজিটাল ডিটক্স”, “আধ্যাত্মিক সাধনা” এসব নামে শাস্তি দেওয়া বন্ধ করব।
কারণ জীবন একটাই। সেটা থেকে পালিয়ে বেড়ালে, আল্লাহ আর সুযোগ পাঠাবেন না।
একটু ভাবনা রেখে যান