বাংলাদেশের বর্ষায় জানালার পাশে চায়ের কাপ এবং নীরবতার ভাষা নিয়ে বৃষ্টির দৃশ্য।

জীবন

নীরবতার শক্তি: কণ্ঠ ও নীরবতার ভাষা নিয়ে গল্প

সেপ্টেম্বর ২০২৫ · 13 মিনিটে পড়া
শেয়ার
বাংলাদেশের বর্ষায় জানালার পাশে চায়ের কাপ এবং নীরবতার ভাষা নিয়ে বৃষ্টির দৃশ্য।
নীরবতার ভাষা এরকমই। শব্দ নেই, কিন্তু সব বলে।

বৃহস্পতিবার সকালে গলা গেল।

তারপর বুঝলাম — এত বছর যা বলেছি, তার একটা শব্দও দরকার ছিল না।


মুখ খুললাম। কিছু বেরোল না।

আবার খুললাম।

গলা থেকে একটা শব্দ এল — যেমন হয় খালি বোতলে ফুঁ দিলে।

শুধু বাতাস।

আয়নার সামনে গেলাম। মুখ খুললাম। চোখ দুটো অচেনা লাগল। এই লোক কে?

মানুষ জ্বর হারায়। চাকরি হারায়। মানিব্যাগ হারায়।

কিন্তু গলা?

গলা তো শরীরের ভেতরে থাকে।

তবু চলে গেছে।


ডাক্তারখানায় গেলাম। কাগজে লিখে দিলাম — গলা নেই।

ডাক্তার টর্চ জ্বাললেন। ভেতরে দেখলেন।

“টনসিল ঠিক আছে। সব ঠিক আছে।”

আমি কাগজে লিখলাম — তাহলে?

তিনি মাথা নাড়লেন। “মনের সমস্যা।”

মন।

মন কি গলা নিয়ে রাখতে পারে?

বাড়ি ফিরলাম। দরজা খুললাম। ঘরে ঢুকলাম।

কেউ জিজ্ঞেস করল — “কী বলল?”

কাগজে লিখলাম — মনের সমস্যা।

সে বলল, “তাহলে আপাতত চুপ?”

হাসল।

রসিকতা।

কিন্তু সত্য শোনাল।


পরদিন সকালে বারান্দায় বসলাম।

চায়ের কাপ হাতে।

রোদ পড়েছে রেলিঙে।

সেই রোদের ভেতর ধূলিকণা উড়ছে।

আমি তাকিয়ে থাকলাম।

কতক্ষণ জানি না।

আগে কখনো ধূলিকণা দেখিনি এভাবে।

আগে মানে — চোখ ছিল, কিন্তু দেখা ছিল না।


রাস্তায় বেরোলাম।

চায়ের দোকানের কাছে একজন মানুষ ফোনে চিৎকার করছে।

“আমি কী করব? আমি কী করতে পারি?”

মুখ লাল। শার্টের কলার ভিজে।

কিন্তু আমি তার কথা শুনছিলাম না।

দেখছিলাম হাত।

হাত কাঁপছে।

হাত বলছে — ভয়।

মুখ বলছে — রাগ।

কোনটা সত্য?

হাত।

সবসময় হাত।


রাতে স্বপ্ন।

একটা বাড়ি। পুরনো। চেনা-চেনা, কিন্তু চেনা না।

একটা ঘরে ঢুকলাম। দেয়ালে আয়না।

অনেক আয়না।

প্রতিটায় আমার ছবি। কিন্তু প্রতিটা আলাদা।

একজন হাসছে। একজন কাঁদছে। একজন চিৎকার করছে।

একজন চুপ।

চুপ করে থাকা ছবিটার দিকে তাকালাম।

সেও আমার দিকে তাকিয়ে।

তার চোখে একটা প্রশ্ন।

তুমি কি আমাকে চেনো?

ঘুম ভাঙল।

সেই চোখ মনে থাকল।


তিন দিন পর একটা জিনিস ধরা পড়ল।

আমি কী বলতাম?

সকালে — চা হয়নি?

দুপুরে — মিটিং কখন?

বিকেলে — আবহাওয়া। ট্রাফিক। রাজনীতি।

সন্ধ্যায় — এই খবরগুলো সব ফেক।

রাতে — বাতি নেভাও।

এত কথা।

কিন্তু একটাও কি দরকার ছিল?

বসে বসে গুনলাম।

শূন্য।

একটা কথাও না।


বৃষ্টি নামল।

জানালার ধারে বসলাম।

বৃষ্টি পড়ছে টিনের চালে। গাছের পাতায়। রাস্তার জমা জলে।

প্রতিটার শব্দ আলাদা।

আমি শুনলাম।

শুধু শুনলাম।

বাজানোর চেষ্টা করলাম না।

পাশে কেউ এসে বসল।

কিছু বলল না।

আমিও বললাম না।

দুজনে বৃষ্টি দেখলাম।

অনেকক্ষণ।

এই প্রথম মাথায় এল — একসাথে থাকতে কথা লাগে না।

শুধু থাকতে হয়।


একটা খাতা কিনলাম।

ভাবলাম, কথা না বলতে পারলে লিখব।

খাতা খুললাম।

কিছু লেখার নেই।

কলম রাখলাম।

প্রথম পাতায় একটা বৃত্ত আঁকলাম।

ভেতরে কিছু লিখলাম না।

খালি।

তাকিয়ে রইলাম।

এই খালি বৃত্তই যা বলার বলে দিল।


পাঁচ দিন পরে একটা সত্য এল।

চাপিয়ে আসেনি। ধীরে ধীরে এসেছে।

মানুষ কথা বলে ভয়ে।

নীরবতায় নিজের সাথে থাকতে হয়।

নিজের সাথে থাকা — সেটাই সবচেয়ে কঠিন।

তাই শব্দ। অনবরত শব্দ।

শব্দ দিয়ে পর্দা টাঙানো।

পর্দার ওপাশে কী?

নিজে।


আট দিনের মাথায় সকালে উঠে কাশি দিতে গেলাম।

শব্দ বেরোল।

গলা ফিরেছে।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার।

কথা বলতে চাইলাম না।

দরকার নেই মনে হলো।

সারাদিন চুপ রইলাম।


কয়েক মাস হয়ে গেছে।

আমি কথা বলি।

কিন্তু আগের মতো না।

এখন প্রতিটা শব্দের আগে একটু থামি।

ভাবি — এটা কি আসলেই বলা দরকার?

বেশিরভাগ সময় উত্তর আসে — না।

তখন চুপ থাকি।


একদিন কেউ জিজ্ঞেস করল — “চুপচাপ কেন?”

বললাম — “চুপচাপ না। শুনছি।”

“কী শুনছ?”

“তোমার পায়ের শব্দ। ডান পায়ে একটু বেশি জোর দাও।”

সে অবাক হলো।

“সত্যি?”

“সত্যি। বাঁ পায়ে সমান জোর দাও।”

সে চলে গেল।

আমি শুনলাম — এবার সমান।


গলা গিয়েছিল।

গলা ফিরে এসেছে।

কিন্তু একটা জিনিস আর ফেরেনি।

সেই আগের আমি।

যে সারাদিন কথা বলত।

আবহাওয়া। ট্রাফিক। রাজনীতি।

রাতে বাতি নেভাও।

সে গেছে।

ভালোই গেছে।


ঘরের ভেতর একটা ঘর আছে।

সেই ঘরে সবসময় চুপ।

সেই ঘরে একা।

কিন্তু একা না।

মাঝেমাঝে বাইরেটা বেশি গোলমেলে হয়ে ওঠে।

তখন চোখ বন্ধ করি।

সেই ঘরে ঢুকি।

কিছুক্ষণ বসি।

তারপর চোখ খুলি।

বাইরেটা বদলায় না।

আমি বদলাই।


মাঝরাতে একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম।

মুখ খুললাম।

এবার শব্দ বেরোয়।

কিন্তু চুপ করে রইলাম।

আয়নার ভেতরের লোকটা তাকিয়ে।

আমিও তাকিয়ে।

সে জিজ্ঞেস করল না — তুমি কি আমাকে চেনো?

এবার আর জিজ্ঞেস করেনি।

হয়তো উত্তর পেয়ে গেছে।

হয়তো না।

অনুভূতি অস্তিত্ববাদ আত্মআবিষ্কার একাকীত্ব কণ্ঠস্বর গল্প দর্শন নীরবতা ভাষা

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

গান

অক্টোবর ২০২৫ · 11 মিনিটে পড়া

জীবন

আয়না

অক্টোবর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া

জীবন

পায়রা

অক্টোবর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *