হাসপাতালের বেঞ্চে বসে আছি, হ্যাপির হাত আমার কাঁধে। মায়ের শ্বাসের শব্দ কানে বাজছে – একটা ভাঙা যন্ত্রের মতো, যেন প্রতিটি নিঃশ্বাস একটা প্রশ্ন: “কতদিন আর?” আরাশ আমার কোলে ঘুমিয়ে আছে, তার নিঃশ্বাস এতই মসৃণ, এতই নিশ্চিত। দুটি নিঃশ্বাসের মাঝখানে আমি দাঁড়িয়ে – একটি ক্রমশ থেমে যাওয়া, আরেকটি সবেমাত্র শুরু। কিন্তু আমারটা? আমার নিঃশ্বাস কোথায় আটকে আছে?
অফিসে বসে থাকি আর ভাবি – আমার সহকর্মীরা প্রমোশনের কথা বলে, নতুন প্রজেক্টের কথা বলে। আমি চুপ করে থাকি। রাতে বাড়ি ফিরে দেখি হ্যাপি মায়ের ওষুধ গুছিয়ে রাখছে, ডায়ালিসিসের জন্য ব্যাগ প্রস্তুত করছে। আমি কী করছি? আমি দেখছি। শুধু দেখছি। আর ভাবছি – এটা কি আমার জীবন? নাকি আমি কোনো একটা নাটকে অভিনয় করছি, যার চিত্রনাট্য আমি কখনো পড়িনি?
মা যখন ব্যথায় কাতর হয়, আমি তার পাশে বসি। কিন্তু আমার মনে তখন অন্য চিত্র ভাসে। আমি ভাবি – যদি আমার একটা ভালো চাকরি থাকত, যদি আমি আরও পড়াশোনা করতে পারতাম, যদি… যদি… যদি। প্রতিটি “যদি” একটা অপরাধবোধের ছুরিকাঘাত। আমি মায়ের হাত ধরি, কিন্তু মন দিয়ে ধরি কি? নাকি শুধু হাতটাই ধরি, আর মনটা থেকে যায় সেই অধরা স্বপ্নগুলোর সাথে?
ভাইভাবি আলাদা থাকে। মাঝে মাঝে আসে, কিছুক্ষণ বসে, চলে যায়। আমি তাদের দোষ দিতে পারি না। কিন্তু রাগও হয়। এই রাগটা কার প্রতি? তাদের প্রতি, নাকি নিজের প্রতি? কারণ আমিও তো পালিয়ে যেতে চাই। আমিও চাই অন্য কোথাও থাকতে, অন্য কোনো জীবন যাপন করতে। কিন্তু পারি না। এই “না পারা”টা কী? ভালোবাসা নাকি দুর্বলতা? দায়িত্ববোধ নাকি কাপুরুষতা?
রাতের বেলা, মা যখন অস্থির হয়ে ওঠে, হ্যাপি জেগে থাকে। আমি দেখি সে কীভাবে ধৈর্য ধরে, কীভাবে সেবা করে। আমার স্ত্রী আমার চেয়ে বেশি সন্তান আমার মায়ের কাছে। এই উপলব্ধিটা আমাকে ভেঙে দেয়। আমি কী তাহলে? আমি কোথায়? আমার ভূমিকাটা কী এই সংসারে? আমি কি শুধুই একটা চরিত্র, যার কোনো সংলাপ নেই, যে শুধু মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে?
মাঝরাতে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। বাইরে জীবন চলমান। গাড়ি যাচ্ছে, লোকজন হাঁটছে। তাদের গন্তব্য আছে। আমার গন্তব্য কোথায়? আমি কি শুধুই একটা স্টেশন, যেখানে অন্যদের ট্রেন থেমে যায়? নাকি আমারও একটা গন্তব্য আছে, যেটা আমি খুঁজে পাচ্ছি না?
মা একদিন আমাকে বলেছিল, “তোর বাবা তো আর নেই। তুই-ই এখন সবকিছু।” এই কথাটা আমাকে গর্বিত করেছিল, আবার ভয়ও পাইয়েছিল। আমি সবকিছু হতে চাই, কিন্তু আমি কি সেই যোগ্যতা রাখি? আমি যখন অফিসে বসে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে স্বপ্ন দেখি, তখন কি আমি মায়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছি? আমি যখন বই পড়ি, কোর্স করার কথা ভাবি, তখন কি আমি পরিবারের সাথে অন্যায় করছি?
২০১৭ সালের সেই শীতের সকাল। মা আর নেই। হ্যাপি কাঁদছে, আরাশ বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি, শুকনো চোখে। কাঁদতে পারছি না। কারণ আমার মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে – এখন কী? এখন কি আমি আমার স্বপ্নের পেছনে দৌড়াবো? নাকি এই প্রশ্নটাই আমার সবচেয়ে বড় পরাজয়?
আয়নায় নিজেকে দেখি। ৩৭ বছর বয়সী একজন মানুষ। চোখে অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু পূর্ণতা নেই। মুখে দায়িত্বের ছাপ আছে, কিন্তু তৃপ্তি নেই। আমি কে? আমি কি সেই ছেলে যে মায়ের সেবা করেছে? নাকি সেই মানুষ যে নিজের স্বপ্ন হত্যা করেছে? নাকি আমি এমন কেউ যার এখনও সময় আছে নিজেকে খুঁজে নেওয়ার?
এই প্রশ্নগুলো আমার সাথে থাকে। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে। আমি উত্তর খুঁজি না। কারণ হয়তো উত্তরটাই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে আছে। আমি বাঁচি এই দ্বন্দ্ব নিয়ে। এই অস্থিরতা নিয়ে। কারণ এই অস্থিরতাই হয়তো আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি প্রশ্নের মানুষ, উত্তরের নয়।
একটু ভাবনা রেখে যান