আজ সকালে বাসে করে অফিসে যাওয়ার পথে ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেলাম। আমি অস্থির হয়ে ঘড়ি দেখতে লাগলাম, জানালা দিয়ে ঘাড় বাড়িয়ে দেখতে লাগলাম কেন জ্যাম। পাশের আসনের এক বৃদ্ধ শান্তভাবে তসবিহ ফিরাচ্ছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “চাচা, রাগ হয় না?” তিনি হেসে বললেন, “বেটা, রাগ করলে কি রাস্তা খুলে যাবে? আল্লাহর ইচ্ছা।” আমি ভাবলাম – তিনি কি নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, নাকি জীবনের একটা গভীর সত্য বুঝেছেন?
বাজারে গিয়ে দেখি একজন সবজি বিক্রেতা বৃষ্টিতে ভিজে তার সবজি নষ্ট হতে দেখছেন। তিনি দুঃখিত, কিন্তু রাগান্বিত নন। “কী আর করব, ভাগ্যে নাই।” কিন্তু পরদিন দেখি তিনি প্লাস্টিক দিয়ে সবজি ঢেকে রেখেছেন। তার এই প্রস্তুতি কি নিয়তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, নাকি নিয়তির সাথে বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়?
হাসপাতালে দেখি একজন রোগী ডাক্তারের কাছে শুনেছেন তার রোগ জটিল। কিন্তু তিনি বলছেন, “যা হওয়ার তাই হবে। তবে চিকিৎসা নিতে হবে।” তিনি কি নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, নাকি নিয়তির সাথে সহযোগিতা করছেন?
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখি একজন ভিক্ষুক মানুষের কাছে হাত পেতে আছেন। কেউ দিচ্ছে, কেউ দিচ্ছে না। তিনি কারো উপর রাগ করছেন না। “আল্লাহ যাকে দিতে চান, তিনি দেন।” তার এই ধৈর্য কি পরাজয়ের স্বীকৃতি, নাকি একটা গভীর বিশ্বাস?
আমার মনে হয়, আমি সারাজীবন এই দ্বন্দ্বে আছি। কখন লড়ব, কখন মেনে নেব? কখন প্রতিরোধ করব, কখন আত্মসমর্পণ করব?
জামিউরের ব্যবসায় ক্ষতি হলে সে বলে, “ভাগ্য খারাপ।” কিন্তু পরদিনই নতুন পরিকল্পনা করে। তার এই আচরণ কি দ্বিচারিতা? নাকি নিয়তি ও প্রচেষ্টার সমন্বয়?
সাইফুল কবির ছেলের চাকরি হয়নি। সে বলল, “আল্লাহর যা ইচ্ছা।” কিন্তু পরদিন আবার চেষ্টা করতে বলল। এটা কি দ্বিচারিতা? নাকি নিয়তি ও চেষ্টার মধ্যে ভারসাম্য?
মৃদুল যখন প্রথমবার ভিসা পায়নি, সে বলেছিল, “হয়তো এখনি সময় হয়নি।” কিন্তু থেমে থাকেনি। আবার দরখাস্ত করেছে। তার এই দ্বিতীয় চেষ্টা কি নিয়তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ? নাকি নিয়তিরই অংশ?
পার্কে দেখি একজন বৃদ্ধ তার নাতিকে সাইকেল চালানো শেখাচ্ছেন। বাচ্চাটা বারবার পড়ছে। দাদা বলছেন, “আবার চেষ্টা কর।” তিনি কি নিয়তির বিরুদ্ধে লড়াই শেখাচ্ছেন? নাকি নিয়তির সাথে সহযোগিতার কৌশল?
ট্রেনে দেখি একজন যাত্রী তার টিকিট হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি বলছেন, “কপাল খারাপ।” কিন্তু টিসি এলে সত্যি বলে জরিমানা দিয়েছেন। তিনি কি নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, নাকি সততার সাথে নিয়তির মোকাবেলা করেছেন?
চায়ের দোকানে বসে শুনি একজন বলছেন, “আমার সব পরিকল্পনা উল্টে যায়।” অন্যজন বলছেন, “তাহলে পরিকল্পনা করিস কেন?” প্রথমজন বলেন, “না করলে তো আরো সমস্যা।” তাহলে পরিকল্পনা করা কি নিয়তির বিরুদ্ধে? নাকি নিয়তির অংশ?
আমার নিজের জীবনে দেখি – বাবার মৃত্যু আমি ঠেকাতে পারিনি। সেটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু তার পর যে দায়িত্ব এসেছে, সেটা পালন করার জন্য লড়েছি। আমি কি নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছি, নাকি নিয়তির সাথে কাজ করেছি?
আরাশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি পরিকল্পনা করি। কিন্তু জানি তার জীবন তার নিজের হাতে। আমার এই পরিকল্পনা কি নিয়তির বিরুদ্ধে যাওয়া? নাকি নিয়তির সাথে সহযোগিতা?
হ্যাপির সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে আমি চেষ্টা করি। কিন্তু জানি কিছু জিনিস আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। আমার এই চেষ্টা কি ভাগ্যের বিপরীতে? নাকি ভাগ্যেরই প্রকাশ?
আমার মনে হয়, নিয়তি ও প্রচেষ্টা দুটো আলাদা জিনিস নয়। এগুলো একটা জটিল নৃত্যের দুটো অংশ। আমি নাচি, কিন্তু সঙ্গীত আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। আমি পদক্ষেপ ফেলি, কিন্তু মঞ্চ আমার তৈরি নয়।
রিকশায় চড়ে দেখি রিকশাওয়ালা পেডেল মারছেন, কিন্তু হাওয়ার দিকও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চেষ্টা করছেন, কিন্তু প্রকৃতির সাথেও কাজ করছেন।
হয়তো জ্ঞানী হওয়া মানে বোঝা কখন লড়তে হবে আর কখন মেনে নিতে হবে। কোন জিনিস আমার নিয়ন্ত্রণে আর কোনটা নেই। যেটা নিয়ন্ত্রণে, সেটার জন্য পূর্ণ চেষ্টা। যেটা নিয়ন্ত্রণে নেই, সেটার সাথে শান্তিতে বাস করা।
মসজিদে নামাজ পড়ার সময় আমি দোয়া করি। কিন্তু জানি সবকিছু আল্লাহর হাতে। আমার দোয়া কি নিয়তি পরিবর্তনের চেষ্টা? নাকি নিয়তির সাথে কথোপকথন?
এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ আর নিয়তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ – এই দুটো হয়তো একই মুদ্রার দুই পিঠ। আমি আত্মসমর্পণ করি যেটা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। আমি প্রতিরোধ করি যেটা আমার নিয়ন্ত্রণে।
হয়তো এটাই প্রকৃত বিজ্ঞতা – জানা কোনটা কোনটা। আর সেই জানা নিয়েই শান্তিতে বাস করা।
হয়তো নিয়তি আর আমার প্রচেষ্টা মিলেই তৈরি হয় আমার জীবনের গল্প। যেখানে আমি একইসাথে নায়ক আর দর্শক।
একটু ভাবনা রেখে যান