আমাদের এলাকার মসজিদে নতুন কমিটি নির্বাচন। আমি ভেবেছিলাম এটা খুব সহজ ব্যাপার। ভালো মানুষেরা দাঁড়াবে, মানুষ ভোট দেবে। কিন্তু দেখি অন্য চিত্র।
কমিটির সভাপতি পদের জন্য দুইজন প্রার্থী। একজন আমাদের এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী, অন্যজন একজন শিক্ষিত চাকরিজীবী। নির্বাচনের আগে ব্যবসায়ী প্রার্থী দামী ইফতারের ব্যবস্থা করেন। শিক্ষিত প্রার্থী শুধু তার যোগ্যতার কথা বলেন।
ফল: ব্যবসায়ী জিতে যান।
নির্বাচনের পর শুনি তিনি ৫ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন। আমি ভাবি – মসজিদের সভাপতি হওয়ার জন্য এত টাকা খরচ করলে সেই টাকা উঠানোর তো কোনো পথ থাকতে হবে?
দেড় বছর পর দেখি নতুন সভাপতির নিজের ব্যবসার বিজ্ঞাপন মসজিদের দেয়ালে। তার ছেলের ব্যবসায়িক কার্ড বিতরণ হয় জুম্মার নামাজের পরে।
আমি প্রশ্ন করি – এটা কি ব্যবসা, নাকি ধর্মসেবা?
একদিন মসজিদের হিসাবের খাতা দেখার সুযোগ পাই। দেখি গত রমজানে জাকাত-ফিতরার টাকা ১২ লক্ষ। কিন্তু গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ৪ লক্ষ টাকা।
বাকি ৮ লক্ষ টাকা কোথায় গেছে?
“প্রশাসনিক খরচ” এর নামে ৩ লক্ষ। “অফিস সংস্কার” এর নামে ২ লক্ষ। “বিভিন্ন” খাতে ৩ লক্ষ।
আমি “বিভিন্ন” খাতের বিস্তারিত জানতে চাই। কমিটির সেক্রেটারি বলেন, “এটা গোপনীয়।” আমি বলি, “দানের টাকার হিসাব কিভাবে গোপনীয় হয়?” তিনি বলেন, “আপনি কমিটির সদস্য না। তাই বলতে পারি না।”
আমি ভাবি – মসজিদের টাকা কি কমিটির ব্যক্তিগত সম্পত্তি?
মসজিদের ইমাম সাহেব একদিন আমাকে ডাকেন। বলেন, “হায়দার ভাই, কমিটির সাথে বিরোধ করবেন না। তারা আমার বেতন দেয়।” আমি বলি, “হুজুর, আপনার বেতন তো মুসল্লিদের দানের টাকা থেকে।” তিনি বলেন, “সেটা কমিটি দেয়।”
আমি বুঝি ইমাম সাহেবও কমিটির হাতের পুতুল।
একদিন মসজিদে ইফতারের আয়োজন। খরচের হিসাব দেখি ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু ইফতার অত্যন্ত সাধারণ মানের। আমি রান্নাঘর দেখতে যাই। দেখি দামী চাল, দামী তেল। কিন্তু পরিমাণ অনেক কম।
আমি বুঝি চোর এমনভাবে হিসাব করেছে যে কাগজে দেখায় বেশি খরচ, আসলে কম।
মসজিদের নির্মাণ কাজে একই চিত্র। ১০ লক্ষ টাকার প্রজেক্টে আসল খরচ ৬ লক্ষ। বাকি লক্ষ “ম্যানেজমেন্ট ফি” বা “সুপারভিশন চার্জ” এর নামে কমিটির পকেটে।
আরাশ একদিন বলে, “আব্বু, কেন আপনি মসজিদের কমিটিতে নাম দেন না?” আমি বলি, “কমিটিতে থাকতে হলে রাজনীতি করতে হয়। আমি সেটা পারি না।”
আরাশ বলে, “তাহলে খারাপ মানুষেরাই কমিটিতে থাকবে?”
আমি উত্তর দিতে পারি না।
হ্যাপি বলে, “তুমি অন্য মসজিদে নামাজ পড়তে যাও।” আমি বলি, “পালিয়ে গেলে তো সমস্যার সমাধান হবে না।”
আমি কিছু সচেতন মুসল্লি নিয়ে একটা গ্রুপ করি। আমরা কমিটির কাছে স্বচ্ছতা দাবি করি। তাদের জবাব: “আপনাদের এত সন্দেহ কেন? আমরা তো আল্লাহর কাজ করি।”
আমি বলি, “আল্লাহর কাজ বলেই তো স্বচ্ছ হতে হবে।”
কমিটির সভাপতি রেগে যান। বলেন, “আপনারা মসজিদে ফিতনা করতে চান।”
আমি ভাবি – হিসাবের প্রশ্ন করা কি ফিতনা?
এরপর যা হলো তা আরো বেদনাদায়ক। কমিটি আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালায়। বলে আমরা “মসজিদ বিরোধী”। কিছু সাদা মনের মুসল্লি আমাদের সাথে কথা বন্ধ করে দেয়।
আমার প্রশ্ন – আল্লাহর ঘরে সততা চাওয়া কি পাপ?
রাতে স্বপ্ন দেখি। আমি মসজিদে নামাজ পড়ছি। হঠাৎ দেখি মসজিদের মিহরাবে একটা দোকান। সেখানে বিকায় হচ্ছে ধর্মীয় সেবা। দাম তালিকা ঝুলানো।
আমি চিৎকার করে জেগে উঠি।
সকালে আয়নায় মুখ দেখি। প্রশ্ন করি – আমি কি আমার এলাকার মসজিদে নামাজ পড়তে যাবো? যেখানে আল্লাহর নামে অসততা হয়?
নাকি নিজের মতো করে একা একা নামাজ পড়বো?
একটু ভাবনা রেখে যান