গতকাল একটা পুরনো গান শুনছিলাম। নাম মনে নেই। কিন্তু সুর চেনা।
হঠাৎ চোখ ভিজে গেল।
কেন?
জানি না। শুধু চোখ ভিজে গেল।
গান বন্ধ করলাম। বসে রইলাম।
কলেজের দিনগুলো মনে পড়ছিল। সাইফুল, বাবু, আমি। ক্যান্টিনে বসে থাকতাম। গল্প করতাম। হাসতাম। কিসে হাসতাম মনে নেই। কিন্তু মনে আছে হেসেছিলাম।
অনেক হেসেছিলাম।
এখন আর ওভাবে হাসি না।
কেন?
জানি না।
হ্যাপি এসে জিজ্ঞেস করল, “কাঁদছো কেন?”
“কাঁদছি না।”
“চোখে পানি।”
“ধুলো পড়েছে।”
হ্যাপি কিছু বলল না। চলে গেল।
আমি আবার গান চালু করলাম। শুনলাম।
আবার চোখ ভিজে গেল।
এই গান আগে শুনতাম। কলেজে। হোস্টেলের রুমে। রাতে। একা।
তখন কেমন লাগত?
মনে নেই।
কিন্তু এখন কেমন লাগছে?
কেমন যেন। দুঃখ না। ঠিক দুঃখ না। অন্যরকম।
মিষ্টি। কিন্তু ব্যথা আছে।
কীসের ব্যথা?
হয়তো সেই দিনগুলো আর নেই। হয়তো সেই আমি আর নেই।
আরাশ এসে বলল, “তুমি কী শুনছো?”
“গান।”
“কিসের গান?”
“পুরনো।”
আরাশ শুনল একটু। বলল, “ভালো না।”
চলে গেল।
আমার ভালো লাগছে। কিন্তু কেন ভালো লাগছে?
গান নতুন কিছু না। আগেও শুনেছি। কিন্তু এখন অন্যরকম লাগছে।
হয়তো গান বদলায়নি। আমি বদলেছি।
স্কুলের দিনগুলো মনে পড়ছে। পরীক্ষা। ভয়। ঘুম আসত না রাতে। সকালে উঠতাম। পেট ব্যথা করত। যেতে চাইতাম না।
কিন্তু এখন মনে হয় কত ভালো ছিল।
কেন?
তখন তো ভালো লাগত না। এখন কেন ভালো লাগছে?
হয়তো সময় সব ভুলিয়ে দেয়। খারাপগুলো। শুধু ভালোগুলো থাকে।
কিন্তু এটা কি ঠিক? খারাপগুলো ছিল। ভয় ছিল। দুশ্চিন্তা ছিল।
এখন মনে হয় কিছুই ছিল না। শুধু ভালো ছিল।
মিথ্যা। কিন্তু মিষ্টি মিথ্যা।
সাইফুলের সাথে দেখা হয়েছিল গত মাসে। বলল, “মনে আছে কলেজের দিনগুলো?”
“হ্যাঁ।”
“কত মজা ছিল।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ।”
কিন্তু মজা ছিল কি?
সাইফুল বলল, “সারাদিন ঘুরতাম। কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না।”
দুশ্চিন্তা ছিল না?
আমার মনে আছে। ছিল। অনেক ছিল। চাকরি হবে কিনা। ভবিষ্যৎ কী হবে। বাবা-মা কী ভাবছেন।
সব ছিল।
কিন্তু সাইফুল বলছে ছিল না।
হয়তো ও ভুলে গেছে। হয়তো আমি ভুল মনে করছি।
কোনটা সত্যি?
জানি না।
সাইফুল বলল, “আবার ফিরে যেতে পারলে কত ভালো হতো।”
আমি কিছু বললাম না।
ফিরে যেতে চাই কি?
জানি না।
সেই দিনগুলো ভালো ছিল। কিন্তু সেই আমি ভালো ছিলাম?
জানি না।
হ্যাপি একদিন বলল, “তুমি সবসময় আগের কথা বলো। এখনকার কথা বলো না কেন?”
“আগের কথা বলি?”
“হ্যাঁ। কলেজের কথা। বন্ধুদের কথা। সেই সময়ের কথা।”
“মনে পড়ে তো বলি।”
হ্যাপি বলল, “এখনকার কথা মনে পড়ে না?”
থেমে গেলাম। এখনকার কথা?
এখন তো বেঁচে আছি। মনে পড়ার কী আছে?
হ্যাপি বলল, “একদিন এখনকার কথাও মনে পড়বে। তখন ভাববে কত ভালো ছিল।”
“এখন কি ভালো আছি?”
হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “জানি না। তুমি বলো।”
আমি কিছু বললাম না।
ভালো আছি কি?
জানি না।
কিন্তু দশ বছর পর হয়তো ভাববো, ২০২৫ সালে কত ভালো ছিলাম।
তখন এখনকার দুশ্চিন্তা ভুলে যাবো। শুধু মনে থাকবে হ্যাপি ছিল। আরাশ ছিল। ঘর ছিল।
এবং মনে হবে, কত সুখী ছিলাম।
কিন্তু এখন কি সুখী?
জানি না।
আরাশ একবার জিজ্ঞেস করল, “তুমি ছোটবেলায় কেমন ছিলে?”
“কেমন মানে?”
“খুশি ছিলে?”
ভাবলাম। খুশি ছিলাম কি?
বললাম, “হ্যাঁ। খুশি ছিলাম।”
“সবসময়?”
“না। কখনো কখনো দুঃখ ছিল।”
আরাশ বলল, “কিন্তু এখন বলো তখন ভালো ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে দুঃখ কোথায় গেল?”
থেমে গেলাম। দুঃখ কোথায় গেল?
ছিল তো। পরীক্ষা। মা অসুস্থ। বাবার রাগ। সব ছিল।
কিন্তু এখন মনে হয় ছিল না।
আরাশ বলল, “আমিও কি এখনকার কথা ভুলে যাবো?”
“হ্যাঁ। হয়তো।”
“তাহলে এখন যেটা মনে হচ্ছে খারাপ, পরে মনে হবে ভালো?”
“হ্যাঁ। হতে পারে।”
আরাশ মাথা চুলকালো। “অদ্ভুত।”
হ্যাঁ। অদ্ভুত।
রাতে আবার সেই গান শুনলাম।
চোখ ভিজল না এবার।
কেন?
হয়তো অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
হয়তো সেই অনুভূতি চলে গেছে।
কিন্তু মনে আছে কলেজের দিনগুলো। সাইফুল। বাবু। ক্যান্টিন। গল্প। হাসি।
সব মনে আছে। কিন্তু এখন দূরে মনে হয়।
যেন অন্য জীবন। অন্য মানুষ।
সেই ছেলেটা কে ছিল? যে হাসত? যে স্বপ্ন দেখত?
আমি? নাকি অন্য কেউ?
জানি না।
হ্যাপি ঘুমাচ্ছে। আরাশ ঘুমাচ্ছে।
আমি জেগে আছি। গান শুনছি।
কেন শুনছি?
হয়তো ফিরে যেতে চাই। হয়তো শুধু মনে করতে চাই।
কোনটা?
জানি না।
বাবুর ফোন এসেছিল কিছুদিন আগে। বলল, “কেমন আছিস?”
“ভালো।”
“মিথ্যা বলিস না। ভালো নেই।”
“তুই কীভাবে জানিস?”
বাবু বলল, “গলা শুনেই বুঝলাম।”
চুপ করে রইলাম।
বাবু বলল, “মনে পড়ে আমরা তিনজন রাতভর জেগে গল্প করতাম?”
“হ্যাঁ।”
“এখন কখন শেষ গল্প করেছিলাম?”
মনে করার চেষ্টা করলাম। মনে নেই।
বললাম, “জানি না।”
বাবু বলল, “আমারও মনে নেই। কিন্তু মনে আছে কেমন লাগত। ভালো লাগত।”
“হ্যাঁ।”
“এখন কেমন লাগে?”
“এখন?”
“হ্যাঁ। এখন ভালো লাগে?”
আমি কিছু বললাম না।
বাবু বলল, “আমার লাগে না। তোর?”
“জানি না।”
বাবু হাসল। “আমরা সব ভুলে গেছি কীভাবে ভালো থাকতে হয়।”
ফোন রেখে দিল।
আমি বসে রইলাম।
সত্যি কি ভুলে গেছি?
নাকি কখনো জানতামই না?
হয়তো তখনও ভালো ছিলাম না। শুধু এখন মনে হচ্ছে ভালো ছিলাম।
হয়তো এখনও ভালো আছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না।
হয়তো দশ বছর পর বুঝব।
তখন আজকের এই রাতটা মনে পড়বে। গান শোনা। জানালা দিয়ে অন্ধকার দেখা। হ্যাপি ঘুমানো। আরাশ ঘুমানো।
এবং মনে হবে, কত শান্তি ছিল।
কিন্তু এখন কি শান্তি আছে?
নেই। এখন শুধু আছে আগের দিনের কথা মনে করা। এবং সেই দিনগুলো আর নেই বলে ব্যথা।
একটা অদ্ভুত ব্যথা। যেটা ভালোও লাগে। খারাপও লাগে।
সাইফুল বলেছিল, “আমরা কখনো বর্তমানে থাকি না। হয় অতীতে, না হয় ভবিষ্যতে।”
“কেন?”
“কারণ বর্তমান কঠিন। অতীত সহজ। সেখানে সব ঠিক হয়ে গেছে। আর ভবিষ্যত সুন্দর। সেখানে সব ভালো হবে।”
“কিন্তু বর্তমান?”
সাইফুল বলল, “বর্তমান শুধু আছে। ভালো না খারাপ, সেটা আমরা জানি না।”
সত্যি।
এখন ভালো না খারাপ, জানি না।
শুধু জানি এখন আছে। এবং এই এখন একদিন তখন হবে।
এবং তখন মনে হবে, সেই এখন কত ভালো ছিল।
মা মারা যাওয়ার পর কয়েক মাস খুব খারাপ ছিলাম। কিছু ভালো লাগত না। কারো সাথে কথা বলতে চাইতাম না।
হ্যাপি বলত, “বাইরে যাও।”
যেতাম না।
একদিন জোর করে নিয়ে গেল। পার্কে। বসে রইলাম।
হ্যাপি বলল, “দেখো চারপাশে। কত মানুষ। সবাই বেঁচে আছে।”
আমি বললাম, “আমিও বেঁচে আছি। কিন্তু বেঁচে থাকা আর বাঁচা তো এক না।”
হ্যাপি চুপ করে রইল।
এখন মনে হয় সেই দিনগুলো কেমন ছিল।
খারাপ ছিল। কিন্তু এখন মনে হয় তখন অন্তত মা ছিল। কাছে না থাকলেও পৃথিবীতে ছিল।
এখন নেই।
এবং সেই না থাকার ব্যথা প্রতিদিন আছে।
কিন্তু হয়তো এই ব্যথাও একদিন মিষ্টি হয়ে যাবে।
হয়তো দশ বছর পর মনে হবে, মা মারা যাওয়ার পর যখন কাঁদতাম, সেই কান্নাও কত সুন্দর ছিল।
কারণ তখন অন্তত কাঁদতে পারতাম।
এখন আর কাঁদতে পারি না।
গান বন্ধ করলাম।
নীরবতা।
কিন্তু নীরবতার মধ্যেও শব্দ আছে। হ্যাপির নিঃশ্বাস। আরাশের নিঃশ্বাস। দূরে গাড়ির শব্দ। ঘড়ির টিক টিক।
এই শব্দগুলো একদিন মনে পড়বে।
এবং মনে হবে, কত শান্তি ছিল সেই রাতে।
কিন্তু এখন কি শান্তি আছে?
জানি না।
শুধু জানি এই মুহূর্ত যাচ্ছে।
এবং যাওয়ার সাথে সাথে মিষ্টি হয়ে যাচ্ছে।
হ্যাপি উঠল। জিজ্ঞেস করল, “ঘুমাওনি?”
“না।”
“কী করছিলে?”
“গান শুনছিলাম।”
“কোন গান?”
“পুরনো।”
হ্যাপি বলল, “আবার কাঁদছিলে?”
“না।”
“মিথ্যা বলো না। চোখ লাল।”
আমি কিছু বললাম না।
হ্যাপি বলল, “কলেজের কথা মনে পড়ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“সেই দিনগুলো ফিরে পেতে চাও?”
ভাবলাম। ফিরে পেতে চাই কি?
বললাম, “জানি না। হয়তো চাই। হয়তো চাই না।”
হ্যাপি বলল, “তুমি জানো, সেই দিনগুলো তুমি যেমন মনে করো, তেমন ছিল না।”
“জানি।”
“তাহলে কেন মনে করো?”
“জানি না। মনে পড়ে।”
হ্যাপি একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আজকের এই রাতটাও একদিন মনে পড়বে। তখন মনে হবে কত ভালো ছিল।”
“এখন কি ভালো আছে?”
হ্যাপি বলল, “জানি না। কিন্তু আছো তো।”
আছি।
হ্যাঁ। আছি।
হ্যাপি আছে। আরাশ আছে। ঘর আছে। রাত আছে। নীরবতা আছে।
সব আছে।
কিন্তু মন পড়ে আছে সেই কলেজের ক্যান্টিনে। সাইফুল, বাবু, আমি।
হাসছি। কিসে হাসছি জানি না। কিন্তু হাসছি।
এবং সেই হাসি এখন এখানে নেই।
কোথায় গেল?
জানি না।
হয়তো হারিয়ে গেছে।
হয়তো কখনো ছিলই না।
হয়তো শুধু মনে হচ্ছে ছিল।
হ্যাপি আবার শুতে গেল।
আমি বসে রইলাম।
ভাবলাম, এই মুহূর্তটা মনে রাখব কি?
দশ বছর পর মনে পড়বে?
হয়তো পড়বে। হয়তো পড়বে না।
কিন্তু পড়লে কী মনে হবে?
মনে হবে, সেই রাতে কত শান্তি ছিল। হ্যাপি ছিল। আরাশ ছিল। সবকিছু ছিল।
কিন্তু এখন?
এখন শুধু আছে একটা ব্যথা। অতীত চলে গেছে বলে।
এবং এই ব্যথা মিষ্টি।
কেন মিষ্টি?
জানি না।
হয়তো কারণ এই ব্যথা প্রমাণ করে কিছু ভালো ছিল।
হয়তো কারণ এই ব্যথা ছাড়া আর কিছু অনুভব হচ্ছে না।
হয়তো এই ব্যথাই এখন একমাত্র সত্যি অনুভূতি।
বাকি সব অসাড়।
চোখ বন্ধ করলাম।
অন্ধকারে দেখলাম কলেজের সেই দিনগুলো।
উজ্জ্বল। রঙিন। জীবন্ত।
চোখ খুললাম।
এখন।
ম্লান। সাদাকালো। নিস্তেজ।
কিন্তু এটাই তো সত্যি।
এখন।
তাহলে কেন মনে হচ্ছে তখন বেশি সত্যি ছিল?
জানি না।
হয়তো সময় যা চলে যায়, তাই বেশি সত্যি মনে হয়।
এবং যা আছে, তা অসত্যি।
উল্টো হওয়া উচিত না?
উচিত।
কিন্তু হয় না।
ঘুমাতে গেলাম।
ঘুমের আগে ভাবলাম, কাল কেমন হবে।
জানি না।
কিন্তু জানি একদিন এই কালকেও মনে হবে সোনালি।
এবং তখন কাঁদব।
কেন কাঁদব?
কারণ তখন আর থাকবে না।
এবং না থাকাই সবকিছু সুন্দর করে দেয়।
ঘুম এল।
শেষ যা মনে আছে, সেই গান।
সুর।
মিষ্টি বিষ।
একটু ভাবনা রেখে যান