আজ সকালে আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো আমি একজন বিচারক। কিন্তু কোন আদালতের বিচারক? কার বিচার করছি? কোন অপরাধের জন্য? আমি নিজেই জানি না।
প্রতিদিন আমি কারো না কারো বিচার করি। অফিসে যাওয়ার পথে যে লোকটা ভুল জায়গায় থুতু ফেলল, তাকে মনে মনে সাজা দিলাম। যে রিকশাওয়ালা ভুল পথে নিয়ে গেল, তার বিরুদ্ধে রায় দিলাম। যে দোকানদার বেশি দাম চাইল, তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করলাম।
কিন্তু আমার এই বিচার করার ক্ষমতা কে দিয়েছে? কোন আইন দিয়ে আমি এই রায় দিচ্ছি? আমি কোন যোগ্যতায় মানুষের চরিত্র বিচার করছি?
গতকাল অফিসে একজন নতুন কেরানি এসেছে। আমি দেখলাম সে একটা ভালো জামা পরেছে, দামি জুতো। মনে মনে ভাবলাম, “এই ছেলে নিশ্চয়ই ঘুষ নেয়। নইলে এত ভালো পোশাক পরে কীভাবে?” কিন্তু পরে জানতে পারলাম সে তার বোনের বিয়ে থেকে সোজা অফিসে এসেছে।
আমি কি তার প্রতি অন্যায় করিনি? আমি কি একজন নির্দোষ মানুষকে মনে মনে অপরাধী বানিয়েছি?
হ্যাপি প্রায়ই বলে, “তুমি সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখো।” আমি বলি, “না তো।” কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমি সবাইকে সন্দেহের চোখেই দেখি। কারণ এই সমাজে যারা ভালো, তারা কষ্ট পায়। যারা খারাপ, তারা সুখে থাকে।
তাহলে আমি কি একজন ভুল বিচারক? যে ভালো মানুষকে খারাপ ভাবে, আর খারাপ মানুষকে ভালো ভাবে?
আরাশ গতকাল জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, আপনি কেন বলেন ওই চাচা মিথ্যুক? উনি তো আমার সাথে ভালো কথা বলেছেন।” আমি বললাম, “তুই বুঝবি না।” কিন্তু আসলে আমিই কি বুঝি না? আমি কি শুধু নিজের ভাঙ্গা অভিজ্ঞতা দিয়ে সবাইকে বিচার করছি?
আমার বাবা যখন মারা গেছিলেন, আমি আত্মীয়দের কাছ থেকে অনেক সাহায্য আশা করেছিলাম। কিন্তু সবাই মুখ ফিরিয়ে নিল। তখন থেকে আমি মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু এই কারণে কি আমার সবাইকে খারাপ ভাবার অধিকার আছে?
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আর ভাবি আল্লাহ তো আমার সব গোপন বিচার দেখছেন। আমি যে মনে মনে হাজারো মানুষকে অপরাধী বানাই, সেই বিচার কি ঠিক? আমি যে কারো মুখ দেখেই ভাবি সে নিশ্চয়ই কোনো অন্যায় করেছে, এটা কি সঠিক?
সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, আমি হয়তো আমার নিজের বিচারও ঠিকমতো করতে পারি না। আমি যে প্রতিদিন ছোট ছোট মিথ্যা বলি, যে কাজে ফাঁকি দেই, যে মাঝে মাঝে অন্যায়ের সাথে আপস করি – এগুলো কি অপরাধ নয়?
আমি হয়তো এমন একজন বিচারক যে নিজের অপরাধ দেখতে পায় না, কিন্তু অন্যের ছোট্ট ভুলও ক্ষমা করতে পারে না।
গতকাল রাস্তায় একজন ভিক্ষুক এসেছিল। আমি ভাবলাম, “এ নিশ্চয়ই ভুয়া ভিক্ষুক। রাতে গিয়ে মদ খাবে।” কিন্তু আমার এই ভাবার প্রমাণ কী? আমি কি তার পেটের ক্ষুধা দেখেছি? তার বাড়ির অবস্থা জানি?
আমি কি একজন নিষ্ঠুর বিচারক হয়ে গেছি যে সবাইকে দোষী মনে করে আগেই?
এই যে আমি প্রতিদিন এত বিচার করি, এত রায় দেই, এর ফল কী? আমি কি আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছি? আরও নিষ্ঠুর? আরও নির্দয়?
আরাশ যখন কোনো ভুল করে, আমি সাথে সাথে তাকে বকি। কিন্তু আমি কি ভেবে দেখি সে কেন ভুল করেছে? তার কী মনের অবস্থা ছিল? আমি কি তার বিচারকের আসনে বসে তার উকিলের কাজটাও করার চেষ্টা করি?
হ্যাপি যখন কোনো কাজে দেরি করে, আমি মনে মনে তাকে দোষ দেই। কিন্তু আমি কি বুঝার চেষ্টা করি সে কেন দেরি করেছে? তার উপর কত চাপ?
আমি যেন একটা ভাঙ্গা আদালত। যেখানে শুধু সাজা আছে, ক্ষমা নেই। শুধু রায় আছে, মমতা নেই।
কিন্তু সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার হলো, আমি নিজের বিচারের সময় হয়ে যাই সবচেয়ে নরম বিচারক। আমার প্রতিটা ভুলের জন্য হাজারটা অজুহাত। আমার প্রতিটা অন্যায়ের পেছনে হাজারটা কারণ।
আমি কি এমন একজন বিচারক যে অন্যদের জন্য কঠোর আইন, নিজের জন্য নরম আইন?
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, আমাকে ন্যায়বিচারক বানাও। এমন বিচারক বানাও যে আগে নিজের বিচার করে, তারপর অন্যের বিচার করে। যে ক্ষমার আগে বোঝার চেষ্টা করে। যে সাজার আগে ভালোবাসার চেষ্টা করে।”
কিন্তু আমি জানি না, আমার এই প্রার্থনা কি পৌঁছায় আল্লাহর কাছে? নাকি পথেই হারিয়ে যায় আমার নিজের কঠোর বিচারের ভিড়ে?
একটু ভাবনা রেখে যান